হাঙরের কামড় খেয়ে হাঙর বাঁচানোর আন্দোলন!‍

সবাই তাঁকে ডাকে ‘শার্ক বয়’ বা ‘শার্কি’ বলে। বিশ্বজুড়ে হাঙর নিধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ দক্ষিণ আফ্রিকার আচমাত হাশেইম। গত বছর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পেয়েছেন ‘গ্লোবাল শার্ক গার্ডিয়ান’-এর খেতাব। অথচ এটা জানলে চমকে যেতে হবে যে, বছর দশেক আগে এই হাঙরের কামড় খেয়েই প্রাণ হারাতে বসেছিলেন হাশেইম। অনেক কষ্টে জীবন বাঁচাতে পারলেও ডান পা-টা হারিয়েছেন হাঙরের কামড়ে। তবে কোনো কিছুতেই দমে যাননি দক্ষিণ আফ্রিকার এই সাঁতারু। এখন তিনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্যারা-অলিম্পিকের সুইমিং পুল।

shark-boy

২০০৬ সালের ১৩ আগস্ট ঘটেছিল হাশেইমের জীবন বদলে দেওয়া সেই ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার মুইজেনবার্গ সমুদ্রসৈকতে সাঁতার কাটছিলেন তিনি। হঠাৎ করেই দেখতে পান কিছু একটা ধেয়ে আসছে তাঁর ভাই তারিকের দিকে। শুরুতে ভেবেছিলেন সেটা ছিল ডলফিন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারেন যে সেটা আসলে একটা হাঙর। ছোট ভাইকে বাঁচানোর জন্য পানিতে শব্দ করে হাঙরটির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন হাশেইম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি ধেয়ে আসে তাঁর দিকে। অনেক চেষ্টা করেও হাঙরের কামড় থেকে বাঁচতে পারেননি তিনি। ডান পায়ের প্রায় পুরোটাই চলে গেছে ১৫ ফুট দীর্ঘ সেই হাঙরের পেটে।

হাশেইমের স্বপ্ন ছিল পেশাদার ফুটবলার হওয়ার। কিন্তু ডান পা হারানোর ফলে শেষ হয়ে যায় তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার। পরবর্তী সময়ে হাশেইমকে সুইমিং পুলে নামার পরামর্শ দেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্যারা-অলিম্পিক সাঁতারু নাতালি দু টোইট। অনুপ্রেরণা দেন প্যারা-অলিম্পিকে অংশ নিতে।

টোইটের এই পরামর্শই বদলে দেয় হাশেইমের জীবন। এক পা নিয়েই শুরু করেন সাঁতার। অলিম্পিক পর্যন্ত আসতেও খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি হাশেইমকে। ২০০৮ সালে বেইজিং প্যারা-অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ২০১২ সালে লন্ডন প্যারা-অলিম্পিকে জিতেছিলেন ব্রোঞ্জপদক। এখনো প্রতিবার সুইমিং পুলে নামার সময় সেই হাঙরের কথাই স্মরণ করেন হাশেইম, ‘সাঁতারের সময় আমি সেই ভয়টাকেই কাজে লাগাই। কল্পনা করি যে ১৫ ফুট লম্বা হাঙরটি আমার দিকে ধেয়ে আসছে। আমার ওপরে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করছে।’

এবারের রিও প্যারা-অলিম্পিক শেষেই সুইমিং পুলকে বিদায় বলবেন হাশেইম। এর পর নেমে পড়বেন হাঙর রক্ষা আন্দোলনে। যে হাঙরের কামড় খেয়ে প্রাণ হারাতে বসেছিলেন, তার প্রতি বিন্দুমাত্র ঘৃণা বা রাগ নেই হাশেইমের। বরং বিশ্বজুড়ে যেভাবে হাঙর নিধন করা হচ্ছে তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন তিনি, ‘পরিসংখ্যান খুবই ভয়াবহ। প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি হাঙর মারা হচ্ছে।’ এভাবে চলতে থাকলে সমুদ্রের খাদ্য শৃঙ্খলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন হাশেইম।

হেলমেট এলো কেমন করে?

হেলমেট ছাড়া ব্যাটিং করতে নামার কথা হয়তো কল্পনাও করেন না এখনকার ব্যাটসম্যানরা। ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ফিলিপ হিউজের মৃত্যুর পর আরও সতর্ক হয়ে গেছে ক্রিকেট অঙ্গন। ব্যাটসম্যানদের মাথায় উঠছে আরও শক্তিশালী-সুরক্ষিত হেলমেট। অথচ একটা সময় ক্রিকেটে এই হেলমেটের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মাথায় কোনো কিছু না পরেই জোয়েল গার্নার, জেফ থমসন, ম্যালকম মার্শালদের মতো দুর্ধর্ষ পেসারদের মুখোমুখি হতেন ব্যাটসম্যানরা। কিন্তু কবে থেকে শুরু হয়েছিল হেলমেট পরার চল? কে পরেছিলেন প্রথম হেলমেট? কেমন ছিল তার ধরনধারন?

helmets

১৯৩২-৩৩ মৌসুমের কুখ্যাত বডিলাইন সিরিজের কথা ক্রিকেটপ্রেমীরা কমবেশি সবাই জানেন। ডন ব্রাডম্যানের দুর্দান্ত অস্ট্রেলিয়ান দলকে বেঁধে রাখার জন্য সরাসরি ব্যাটসম্যানের শরীর লক্ষ্য করে বোলিং করার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন ইংলিশ বোলাররা। সেই সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বেশ কয়েকজন ব্যাটসম্যান আহত হয়েছিলেন বলের আঘাতে।  তখনও ক্রিকেট অঙ্গনে আসেনি হেলমেটের ভাবনা। ১৯৩০-এর দশকে অবশ্য ইংল্যান্ডের এক ব্যাটসম্যান প্যাটসি হেনড্রেন বানিয়েছিলেন বিশেষ এক ধরণের টুপি। কাউকে কাউকে মাথায় তোয়ালে জড়িয়েও দেখা গেছে ব্যাট হাতে মাঠে আসতে। ভারতের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান সুনিল গাভাস্কারও মাথা বাঁচানোর জন্য বানিয়েছিলেন বিশেষ এক ধরণের টুপি। কিন্তু কোনো কিছুকেই হেলমেটের উত্তরসূরি বলা যায় না।

ব্যাটসম্যানের মাথায় প্রথমবারের মতো হেলমেট সদৃশ বস্তু দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত। সে সময় ক্রিকেট অঙ্গন কাঁপিয়ে তুলেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসাররা। জোয়েল গার্নার, মাইকেল হোল্ডিং, অ্যান্ডি রবার্টস, ম্যালকম মার্শাল, কলিন ক্রফটরা কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন ব্যাটসম্যানদের মনে। অস্ট্রেলিয়ার পেস জুটি ডেনিস লিলি ও জেফ থম্পসনও ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। বল না, ব্যাটসম্যানদের দিকে যেন একেকটা আগুনের গোলাই ছুঁড়ে দিতেন দুর্ধর্ষ এই পেসাররা। তাঁদের ভয়ঙ্কর সব ইয়র্কার থেকে বাঁচার জন্যই মাথায় হেলমেট পরার কথা ভাবতে হয়েছিল সেসময়ের ব্যাটসম্যানদের।

dennisক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম হেলমেট অবশ্য কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে না, দেখা গিয়েছিল কেরি পেকারের বাণিজ্যিক টুর্নামেন্ট ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটের সৌজন্য। ১৯৭৭ সালে ওয়ার্ল্ড সিরিজের প্রথম মৌসুমে অ্যান্ডি রবার্টের বাউন্সারে চোয়াল ভেঙে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যান ডেভিড হুকসের। এই ঘটনার পরেই নিজের মাথা বাঁচাতে হেলমেট পরে ব্যাট করতে আসেন ইংলিশ ব্যাটসম্যান ডেনিস অ্যামিস। সেটা ছিল একটা মোটরসাইকেলের হেলমেট। সেসময় অনেকেই কাপুরুষ বলে গালি দিয়েছিলেন অ্যামিসকে। কিন্তু অ্যামিসের সেই সিদ্ধান্তটিই অনেকটা বদলে দেয় ক্রিকেট বিশ্বকে। তার দেখাদেখি টনি গ্রেগসহ আরও অনেকে পরা শুরু করেন হেলমেট।

grahamআন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রথমবারের মতো হেলমেট পরেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার গ্রাহাম ইলোপ। ১৯৭৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের সময়। সেটিও ছিল মোটরসাইকেলের হেলমেটের মতো। বলাই বাহুল্য যে, শুরুর দিকের সেই হেলমেট পরে খেলতে বেশ কষ্টই হতো ব্যাটসম্যানদের। অনেক ভারী সেই হেলমেটগুলোয় বাতাস চলাচলের সুবিধা ছিল না বললেই চলে। সামনে মোটা প্লাস্টিকের গ্লাস থাকায় বল দেখার ক্ষেত্রেও পড়তে হতো অসুবিধায়। তারপরও মহামূল্যবান মাথা বাঁচানোর তাগিদে সেগুলোই মাথায় দিয়ে মাঠে নামতে শুরু করেছিলেন সে যুগের ব্যাটসম্যানরা। এরপর ধীরে ধীরে গ্লাভস-প্যাডের মতো হেলমেটটাও হয়ে ওঠে ব্যাটসম্যানদের একটি আবশ্যিক সুরক্ষা উপাদান।

ভিভ রিচার্ডসের মতো কিছু ব্যাটসম্যান অবশ্য আছেন যাঁরা কখনোই মাথায় চাপাতে চাননি হেলমেট নামের এই ‘বোঝা’টিকে। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ১২১টি টেস্ট ও ১৮৭টি ওয়ানডে খেলা রিচার্ডস সব সময়ই মাঠে নেমেছেন টুপি পড়ে।

যে বিষয়গুলোতে ঐক্যমত্য চাই প্যারিস সম্মেলনে

Protect Mother Earth

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে থাকা বিশ্ব পরিবেশ নিয়ে আলাপ-আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন বিশ্বনেতারা। ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের এই শীর্ষ জলবায়ু সম্মেলনকে বিবেচনা করা হচ্ছে পৃথিবীর প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার অন্তিম সময় হিসেবে। এবার যদি পরিবেশ বিষয়ে একটা বৈশ্বিক আইনি চুক্তি না করা যায়, তাহলে অনেক দেরি হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিগত তিন দশক ধরে নানামুখী আলাপ-আলোচনায় অনেক কিছু জমা হয়েছে এজেন্ডা হিসেবে। তবে এবার প্যারিসে মূল কিছু বিষয়ে অবশ্যই ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে হবে বিশ্বনেতাদের।

paris_cop21_501868

গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস

পুরো বিশ্ব একমত হয়েছে যে, গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমাতে হবে। যেগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করে পৃথিবীকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই নির্গমন কি হারে কমানো হবে?

জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রাক শিল্পায়ন যুগের সাপেক্ষে বৈশ্বিক উষ্ণতা কোনোভাবেই দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের ওপরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তবে বিশ্বের গরীব ও নিচু স্থানে থাকা ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো (যারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম ও প্রবল শিকার হবে) বলেছে, দুই ডিগ্রীও যথেষ্ট না।…

View original post 504 more words

পরিবেশ দূষণ রোধে শিশুদের পিটিশন!

সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়া অঙ্গীকার কবিরা কতই না করেছেন। কিন্তু আধুনিক বিশ্ব কবির সংকল্প অনুযায়ী চলছে না। দুনিয়াকে শিশুর বাসযোগ্য করে তোলা তো দূরের কথা; ক্রমাগত ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ছে পৃথিবীর পরিবেশ। বায়ু দূষণের ফলে বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। ফলে বড়দের ওপর আস্থা হারিয়ে শিশুরাই দিচ্ছে পরিবেশ রক্ষার ডাক। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত রাজধানী, দিল্লির বায়ুদূষণ বণ্ধের আহ্বান জানিয়ে ভারতের শীর্ষ কোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করেছে তিন শিশু।

ছয় মাসের এই তিন শিশুর পক্ষে রিট পিটিশনটি দায়ের করেছেন তাদের অভিভাবকরা। বায়ু দুষণকারী পটকা ও আতশবাজি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে এই পিটিশনে। তাদের দাবি, পরিস্কার বাতাসে শ্বাস নেওয়াটা শিশুদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু বায়ু দূষনের ফলে তাদের পড়তে হচ্ছে অনেক জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধির কবলে। অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছে ফুসফুস ও নানাবিধ স্নায়ুজনিত রোগে। আর এই দুষণের জন্য অত্যাধিক পরিমান পটকা ও আতশবাজি পোড়ানোকে দায়ী করে সেটা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে পিটিশনকারী তিন শিশু ও তাদের অভিভাবকরা। ভারতের সুপ্রিম কোটও বিষয়টিকে শিশুদের মৌলিক অধিকারের জন্য হুমকি বিবেচনা করে পিটিশন গ্রহণ করেছে।

ব্যাপক হারে পটকা ও আতশবাজী পোড়ানোয় দূষিত হচ্ছে দিল্লির বায়ু

ব্যাপক হারে পটকা ও আতশবাজী পোড়ানোয় দূষিত হচ্ছে দিল্লির বায়ু

গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে এই পিটিশন দায়ের করা হয়েছে দিওয়ালির ছয় সপ্তাহ আগে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান এই উৎসবে প্রচুর পটকা ও আতশবাজি পোড়ানো হয় ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। যা তৈরি করে একটা ঝাঁঝালো ধোঁয়া। পিটিশনে বলা হয়েছে, ‘উৎসবগুলোতে যে বিপুল পরিমাণে আতশবাজি পোড়ানো হয় তা পরিস্কারভাবে এই আবেদনকারী ও দিল্লির অন্যান্য শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। আতশবাজি পোড়ানোর মাধ্যমে হয় ক্ষণস্থায়ী ও অগভীর একটা আনন্দ পাওয়া যায়। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো দীর্ঘমেয়াদে পড়ে ফুসফুস ও স্নায়ুর ওপর, যা স্থায়ীভাবে ক্ষতির কারণ হয়।’

গত বছর পৃথিবীর ১৬০০টি শহরের ওপর গবেষণা চালিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা। সেখানে দেখা গেছে বায়ুবাহিত একধরণের ছোট্ট কণার পরিমাণ দিল্লিতেই সবচেয়ে বেশি। পিএম২.৫ নামে পরিচিত এই কণাগুলো খুব সহজেই ফুসফুসে প্রবেশ করে। এমনকি রক্তের মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হতে পারে। তৈরি করে ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুস ক্যান্সার ও বিভিন্ন হৃদরোগ।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন: গাছেরাও কি যাচ্ছে ধর্মঘটে?

জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণের তাগিদে পরিবেশের প্রতি অবিচারই করে ফেলেছে মানব সভ্যতা। কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেনের মতো গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ উত্তপ্ত করে ফেলেছে পৃথিবীর পরিবেশ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে গাছ। শুষে নিচ্ছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রকৃতির চরম বন্ধু গাছও যেন নিয়েছে বিরুপ অবস্থান। ফলে বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন তুলছেন যে: গাছেরাও কী যাচ্ছে ধর্মঘটে?

trees

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বিগত কয়েক দশক ধরেই মধ্য ইউরোপে বসন্ত শুরু হচ্ছে আগেভাগেই। সেখানকার গাছগুলোও এতদিন সাড়া দিয়ে এসেছে প্রকৃতির এই পরিবর্তনে। আগে-ভাগেই ফোটাতে শুরু করেছে বসন্তের নতুন পাতা। ফলে কার্বন ডান অক্সাইড শুষে নেওয়ার কাজটাও তারা করেছে অনেক লম্বা সময় ধরে। এতদিন ব্যাপারটি বেশ ইতিবাচকভাবেই উপস্থাপিত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন শীর্ষক আলোচনাগুলোতে। কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ন্যাচারে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা লিখেছেন যে, গাছগুলো আগেভাগেই বসন্তের পাতা ফোটানোর হার কমিয়ে দিয়েছে। এ থেকে তাঁরা আশঙ্কা করছেন যে, এক সময় হয়তো তা পুরোপুরি বন্ধই হয়ে যেতে পারে। বেইজিংয়ের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওনগোশুয়ো ফু বলেছেন, ‘আগাম বসন্তের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গাছগুলোর ধীর হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি ইঙ্গিত করে যে ভবিষ্যতে তারা আর বেশি কার্বন শুষে নিতে পারবে না। কারণ গাছগুলোর তাপমাত্রা সংবেদশীলতা কমে যাচ্ছে।’

গবেষণাটি পরিচালনার জন্য বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল বেছে নিয়েছিলেন ১২৪৫টি স্থানের খুব পরিচিত গাছগুলোকে। তাঁরা গবেষণা চালিয়েছেন ডেনমার্ক থেকে বসনিয়া পর্যন্ত মধ্য ইউরোপের অনেকগুলো স্থানে। গবেষণাটিতে তাঁরা ভাগ করেছেন দুইটি পর্যায়ে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৪ সাল ও ১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়কে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে গত তিন দশক ধরে গাছগুলো অগ্রিম বসন্তকে স্বাগত জানিয়ে আগেভাগেই নতুন পাতার জন্ম দিয়েছে। গড়ে প্রায় ১৩ দিন আগেভাগে শুরু হয়েছে নতুন পাতা আগমনের প্রক্রিয়া।

কিন্তু দুইটা সময়ের পর্যায়কে আলাদাভাবে বিবেচনায় নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের। ১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সাল সময় পর্যন্ত নতুন পাতা জন্মানোর হার কমে গেছে ৪০ শতাংশ হারে। ওনগোশুয়ো বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি যে গত তিন দশকে আগাম বসন্তের প্রতি গাছদের সংবেদনশীলতা কমে গেছে। আর শীতের সময় আবহাওয়া আরও উষ্ণ থাকলে এটা আরও কমে যেতে পারে।’

শিল্পবিপ্লবের পর থেকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। সেটা কোনোভাবেই যেন দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসে না পৌঁছায়, সেজন্য তৎপরতা চালাচ্ছে জাতিসংঘ। বিজ্ঞানীদের ধারণা মধ্য ইউরোপের গাছগুলো চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকেই নিজেদের রক্ষা করতে চাচ্ছে।

বার্সেলোনার রাজনীতি, রাজনীতির বার্সেলোনা

 

ইউরোপের অন্যতম সেরা ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনার খেলাগুলোতে দর্শকসারিতে প্রায়ই দেখা যায় একটা ব্যানার: “কাতালোনিয়া স্পেন না”। হ্যাঁ, স্পেন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন একটা রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে কাতালোনিয়ার মানুষ। সত্যিই তেমনটা হয়ে গেলে ছোট আকারের একটা সশস্ত্র সামরিক বাহিনী গড়ার পরিকল্পনাও করছেন কাতালান রাজনীতিবিদরা। তবে কাতালোনিয়ার একটা নিরস্ত্র সেনাদল দীর্ঘদিন ধরে ছিল এবং এখনও আছে। আর তা হলো বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবের সমর্থক। যারা প্রতি সপ্তাহান্তে ৯৯ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ন্যু ক্যাম্প স্টেডিয়ামকে সাজিয়ে দেন লাল-নীলের প্রতীকি সাজে। যেটা কাতালোনিয়ার জাতীয় পতাকাকে ইঙ্গিত করে। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে কাতালোনিয়ার নাম সত্যিই যদি আসে, তাহলে বার্সেলোনা শহর হবে এই নতুন দেশের রাজধানী।

&MaxW=640&imageVersion=default&AR-150929622

আগামী রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হবে কাতালোনিয়া প্রদেশের পার্লামেন্ট নির্বাচন। ভোটাভুটিতে স্বাধীন কাতালোনিয়ার পক্ষের শক্তি জিতে গেলে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের কর্মকাণ্ড শুরু করা হবে বলে জানানো হয়েছে স্বাধীনতাকে ‘হ্যাঁ’ বলা জোটের নেতারা। কাতালোনিয়া যদি স্বাধীন হয়ে যায় তাহলে বার্সেলোনা আর স্প্যানিশ লিগে খেলতে পারবে না বলে জানিয়েছেন লা লিগার প্রেসিডেন্ট।

আন্তর্জাতিকভাবে যেভাবেই দেখানো হোক না কেন, বার্সা দীর্ঘদিন ধরেই বহন করছে কাতালান জাতীয়তাবাদের পতাকা। ন্যু ক্যাম্পে বার্সেলোনার খেলাগুলোতে দর্শকসারিতে দেখা যায় কাতালোনিয়ার পতাকার মতো লাল-নীলের আধিক্য। বার্সার প্রধান তারকা লিওনেল মেসির চেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় স্বাধীনতার ধ্বনি। সর্বশেষ স্প্যানিশ কাপ ফাইনালে ন্যু ক্যাম্পে স্পেনের জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় দুয়োধ্বনি দিয়েছিলেন বার্সার সমর্থকেরা। এজন্য ৭৪ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছিল বার্সাকে। ন্যু ক্যাম্প স্টেডিয়ামের এক পার্শ্বে পাকাপাকিভাবে একটা ব্যানার লাগানো থাকে। যেখানে লেখা আছে: “কাতালোনিয়া স্পেন না”।

catalonia

স্প্যানিশ লেখক মানুয়েল ভাজকেজ মোনতালবান বার্সাকে বর্ণনা করেছেন একটা ‘প্রতিকী ও নিরস্ত্র কাতালান সেনাবাহিনী হিসেবে।’। বিশেষত ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত, জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সামরিক শাসনের সময়। ফ্রাঙ্কো চরমভাবে অবদমিত করে রেখেছিলেন কাতালান জাতীয়তা, ভাষা-সংস্কৃতির চর্চাকে। ইতিহাসবিদ চার্লেস সান্তানা বলেছেন, ‘বার্সেলোনা ক্লাব ছিল কাতালানদের স্বাধীনতার ঘাঁটি। এখানে এসে মানুষ নির্ভয়ে কাতালান ভাষায় কথা বলতে পারত। এমনকি গানও গেতে পারত।’ ১৯১৮ সালে কাতালোনিয়াকে স্ব-শাসনের ব্যবস্থা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছিল বার্সেলোনার পক্ষ থেকে। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জোন লোপার্তা, বার্সেলোনার সভাপতি থাকার সময়ও স্বাধীন কাতালোনিয়ার পক্ষে সক্রিয় অবস্থায় দেখা গেছে ইউরোপের অন্যতম সফল ক্লাবটিকে। লোপার্তা খোলাখুলিভাবে স্বাধীন কাতালোনিয়ার সমর্থনে কথাবার্তা বলতেন। ২০১২ সালেও স্পেনের কেন্দ্রিয় সরকার দেশের প্রতিটি স্কুলে স্প্যানিশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব তোলার পর কড়াভাবে এর সমালোচনা করেছিল বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাব

তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ভিন্ন অবস্থানে দেখা যাচ্ছে বার্সেলোনাকে। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের জন্য বার্সেলোনা কোনো পক্ষ নেবে না বলে জানিয়েছেন ক্লাব সভাপতি হোসেপ মারিয়া বার্তেমোউ। তিনি বলেছেন, ‘বার্সেলোনা এটা দেখিয়েছে যে তারা এই নির্বাচনী প্রচারণার বাইরে আছে। যা করার সেটা রাজনীতিবিদেরই করতে হবে। বার্সা নিরপেক্ষ থাকবে।’ বার্সার কিংবদন্তি ফুটবলার জাভিও মত দিয়েছেন ক্লাবকে রাজনীতির বাইরে রাখার পক্ষে। তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয় বার্সাকে রাজনীতির সঙ্গে জড়ানো ঠিক হবে না। এই ক্লাবকেও না, ফুটবলকেও না। কিন্তু পরিস্থিতি ব্যাপারটাকে অনিবার্য করে তুলেছে।’

তবে বার্সার আরেক তারকা জেরার্ড পিকে বেশ জোরেসোরেই কথা বলছেন কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে। ১১ সেপ্টেম্বর কাতালোনিয়ার জাতীয় দিবসের র‍্যালিতে দেখা গেছে পিকেকে। সেসময় বার্সার এই ডিফেন্ডার বলেছিলেন, ‘এখানে খুবই বড় একটা আন্দোলন হচ্ছে। আর এটা সবার শোনা উচিৎ।’ সম্প্রতি স্পেনের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলার সময় পিকেকে দুয়োধ্বনিও শুনতে হয়েছে স্পেনেরই সমর্থকদের কাছ থেকে।

11setembre-14-pique

কাতালোনিয়া সত্যিই আলাদা হয়ে গেলে ইউরোপের ফুটবল অঙ্গনে বেশ বড় ধরণের তোলপাড় শুরু হবে। স্পেনের জাতীয় দলে খেলেন বেশ কয়েকজন বার্সেলোনার খেলোয়াড়। তারা তখন আর খেলতে পারবেন না স্পেনের হয়ে। বার্সেলোনাও যে তাহলে লা লিগায় অংশ নিতে পারবে না সেটাও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন স্প্যানিশ পেশাদার ফুটবল লিগের প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের তেবাস, ‘খেলার আইন খুব পরিস্কার: লা লিগায় স্পেনের ক্লাবগুলো ছাড়া অংশ নিতে পারবে শুধু আনডোরান ক্লাবগুলো। লা লিগা অনুষ্ঠিত হবে কাতালান ক্লাবগুলোকে বাদ দিয়েই।’ বার্সেলোনার সঙ্গে লা লিগার আরেক ক্লাব এসপানিওলেরও হবে একই দশা।

তাহলে কি সত্যিই আর দেখা যাবে না দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী দ্বৈরথ? ফুটবল বিশ্ব কী বঞ্চিত হবে ‘এল ক্লাসিকো’র রোমাঞ্চ থেকে? উত্তরের জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে বার্সেলোনার রাজনীতির দিকে।

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা, ইউরোপের মাথাব্যাথা

ইউরোপের ফুটবল অঙ্গনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াই, স্পেনের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার দ্বৈরথ। বিশ্ব ফুটবলে যা পরিচিত ‘এল ক্লাসিকো’ নামে। ইউরোপের সবচেয়ে সফল দুইটি ক্লাবও রিয়াল-বার্সা। ফলে ফুটবলের কারণে পুরো বছরজুড়েই বিশ্বের অনেক মানুষের নজর থাকে স্পেনের দিকে। এবার বিশ্বের দৃষ্টি স্পেনের দিকে পড়তে পারে রাজনৈতিক কারণেও। এখানেও একে-অপরের প্রবল প্রতিপক্ষ মাদ্রিদ (স্পেন) ও বার্সেলোনা (কাতালোনিয়া)।

Screen-Shot-2015-03-31-at-16.40.53

সম্প্রতি দীর্ঘদিন ধরে জারি থাকা স্বাধীনতার দাবিতে আবার মুখরিত হয়েছে কাতালোনিয়ার রাজপথ। ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কাতালোনিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচন। আর এই ভোটাভুটিকে দেখা হচ্ছে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণী নির্বাচন হিসেবে। পার্লামেন্ট নির্বাচনে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষ জয়ী হলে জোরতালে শুরু হবে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কর্মকাণ্ড। বার্সেলোনা হবে সেই নতুন দেশের রাজধানী।

অন্যদিকে সমূহ বিপদের আশঙ্কায় কাতালানদের এই দাবি মেনে নিতে নারাজ স্প্যানিশ সরকার। কাতালোনিয়া স্বাধীন হয়ে গেলে খুবই ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে আগে থেকেই টালমাটাল অবস্থার মধ্যে থাকা স্প্যানিশ অর্থনীতি। খুব কাছেই সতর্কবার্তা হয়ে ঝুলে আছে গ্রীস ট্রাজেডি। গ্রীসের মতো ঋণগ্রস্থ স্পেনও আছে দেউলিয়া ঘোষণা হবার আশঙ্কায়। স্পেনের পাশাপাশি ইউরোপের মোড়লরাও হয়তো চাইবেন না কাতালোনিয়ার আলাদা হয়ে যাওয়া। কারণ তাহলে নতুন করে আরেকটি বড় সংকটের মধ্যে পড়তে হবে ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের। এমনিতেই গ্রীস ও সাম্প্রতিক অভিবাসী পরিস্থিতি বেশ জর্জরিত করে রেখেছে তাদের। কিন্তু কাতালানরাও নাছোড়বান্দা। বহু দিনের লালিত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে এবার বাস্তবে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর কাতালোনিয়ার মুক্তিকামী মানুষ।

catalonia-map

১১৬৪ সাল পর্যন্ত খুবই শক্তিশালী একটা স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল কাতালোনিয়া। তারপর এটি যুক্ত হয় অ্যারাগনের সঙ্গে। আর ১৪৬৯ সালে অ্যারাগনের রাজা ফার্দিনান্দ ও স্পেনের রানী ইসাবেলার বিবাহবন্ধনের মধ্য দিয়ে স্পেনের সঙ্গে মিলন ঘটে অ্যারাগন ও কাতালোনিয়ার। তখন থেকেই ধীরে ধীরে স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে থাকে কাতালানরা। ১৭১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয় কাতালান রাষ্ট্র। তারপর থেকেই নিজেদের স্বকীয় সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ভাষা চর্চার স্বাধীনতা হারাতে হয়েছে বলে অভিযোগ কাতালোনিয়ার মানুষদের। যে নিপীড়ণের চরম রূপ দেখা গেছে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সামরিক শাসনের (১৯৩৯-১৯৭৫) সময়। ১৯৭০-এর দশকের শেষে স্পেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর কাতালোনিয়াকে দেওয়া হয় স্পেনের ১৭টি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা। তবে ভেতরে ভেতরে স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনাটাও সবসময় লালন করে গেছে কাতালানরা। সেই দাবি আরও জোড়ালো হয়েছে ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক ধ্বসের পর। নানাবিধ কৃচ্ছতানীতি যারপরনাই অসন্তোষ তৈরি করেছে কাতালোনিয়ায়। ২০১০ সালে কাতালানরা স্প্যানিশ সরকারকে কর দিয়েছে ৬১.৮৭ বিলিয়ন ইউরো। আর তাদের কাছে এসেছে ৪৫.৩৩ বিলিয়ন। কেন্দ্রীয় স্প্যানিশ সরকারের হাতে বিপুল পরিমাণ টাকা চলে না গেলে আরও উন্নয়ন করা যেত বলে কড়া মন্তব্য করেছিল কাতালোনিয়া সরকার।

গত বছরের নভেম্বরে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল একটি অনানুষ্ঠানিক গণভোট। মাদ্রিদে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার অনেক চেষ্টা করেছিল সেটা রুখে দিতে। কিন্তু শেষপর্যন্ত সফল হয়নি। ২.২ মিলিয়ন ভোটারের ভোটে বিপুলভাবে জয়ী হয়েছিল স্বাধীনতার দাবি। ৮০.৭ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে।

এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অনেকখানি আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে সেই স্বাধীনতার দাবি। কাতালোনিয়ান পার্লামেন্টের ১৩৫টি আসনের মধ্যে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করলেই স্পেন থেকে পৃথক হওয়ার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে দেবে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরা। ইতিমধ্যে তারা গঠন করেছে ‘জান্টস পেল সি’ বা ‘টুগেদার ফর ইয়েস’ নামের একটি জোট। যেখানে আছে কাতালোনিয়ার বর্তমান ও সাবেক তিন তিন প্রধানমন্ত্রীর পার্টি। এই জোট থেকে নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন বার্সেলোনার সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলাও। এই জোটের সঙ্গে আলাদাভাবে কাজ করবে বামপন্থী দল সিইউপি। আর স্বাধীনতার বিপক্ষে লড়বে স্পেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মারিনো রাহোর পার্টি পার্তিদো পপুলার (পিপি) ও কাতালোনিয়ার সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএসসি)।

২৭ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হলে দ্রুতই স্বাধীন হওয়ার কাজ শুরু করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ‘টুগেদার ফর ইয়েস’ জোটের প্রার্থী রাউল রোমেভা। এল পাইস পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমরা স্বাধীনতার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। আর সবাইকে এটা বুঝতে হবে যে আমরা সত্যিই এই প্রক্রিয়া শুরু করব। আমরা সম্ভাব্য সকল উপায়ে এটা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা (স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার) এটা আমাদের করতে দেয়নি। ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বরের গণভোটের পর আমরা যেটা করতে পারিনি সেটা করার সময় এবার এসে গেছে।’ নিজেদের স্বাধীন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট আর্থার মাস। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কর কর্তৃপক্ষ, কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট আকারের একটা সেনাবাহিনীও গড়ে তোলার কথা ভাবছেন মাস।

গত ১১ সেপ্টেম্বর কাতালোনিয়ার জাতীয় দিবসে বার্সেলোনার রাজপথ আবার মুখরিত হয়েছিল স্বাধীনতার দাবিতে। প্রায় ১.৪ মিলিয়ন মানুষ কাতালোনিয়ার পতাকা নিয়ে বর্ণিল র‍্যালি করেছিলেন বার্সেলোনার রাজপথে। তরুণ-তরুণীরা নেচে-গেয়ে উদযাপন করেছিলেন কাতালানদের স্বকীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতি। স্বাধীনতার দাবিতে গলা চড়িয়েছেন অনেক প্রবীনও। ফ্রাঙ্কোর একনায়ক শাসনামলে স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘদিন জেল খাটতে হয়েছিল ৯১ বছর বয়সী জোয়াকিম ব্যাটলকে। এখন তিনি হাঁটেন ক্রাচে ভর দিয়ে। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্রও কমেনি তাঁর স্বাধীনতার স্পৃহা। ব্যাটল বলেছেন, ‘আমি প্রবল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দিকে। আমরা এজন্য অনেক শতক ধরে অপেক্ষা করছি। আর আমার বিশ্বাস এখন সেই সময় চলে এসেছে।’

Demonstrators wave "Esteladas" (pro-independence Catalan flag) during celebrations of Catalonia's National Day (Diada) which recalls the final defeat of local troops by Spanish king Philip V's forces in 1714, in Barcelona on September 11, 2015. Hundreds of thousands of Catalans were set to pour into the streets today demanding independence, ahead of a regional election billed as an indirect vote on breaking away from Spain. AFP PHOTO/ GERARD JULIEN

২৭ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের পর স্পেন যদি সত্যিই স্বাধীনতার পথে হাঁটা শুরু করে তাহলে আবার বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে স্প্যানিশ অর্থনীতি। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থমন্ত্রী লুইস ডি গুইনডোস অবশ্য সবাইকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে, এমন কিছু হওয়া কখনোই সম্ভব না। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা এতে আস্থা পাবেন কিনা, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা শুরু হবে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা তখন শুধু স্পেনের সমস্যা হয়ে থাকবে না। পুরো ইউরোপকেই আবার পড়তে হবে নতুন টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে।

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা নতুন করে ভাবাবে ইউরোপিয়ান ফুটবল অঙ্গনকেও। কাতালোনিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেলে বার্সেলোনা-ভ্যালেন্সিয়ার মতো দলগুলো স্প্যানিশ লিগে খেলবে কিনা, বার্সেলোনা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগে অংশ নিতে পারবে কিনা- ইত্যাদি প্রশ্ন ঝুলে আছে ইউরোপের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে।

প্রাসঙ্গিক: 

রাজনীতিতেও চলছে বার্সা-রিয়াল লড়াই

স্বাধীন কাতালোনিয়ার দাবি বার্সেলোনারও

এল ক্লাসিকো কি শুধুই ফুটবলীয় লড়াই?

যখন বার্সার ওপর ছিল মাদ্রিদের রাজত্ব