Posts Tagged ‘ TED ’

সভ্যতার আদল গড়া নিউরনগুলো

স্নায়ুবিজ্ঞানী বিলয়ানুর রামাচন্দ্রন কথা বলেছেন মিরর নিউরনের আকর্ষণীয় কার্যাবলী নিয়ে। খুব সাম্প্রতি আবিস্কৃত হয়েছে যে, এই নিউরণগুলোর মাধ্যমে আমরা কিভাবে জটিল সামাজিক আচরণবিধিগুলো দ্রুত শিখে ফেলি। যেগুলোর কিছু কিছু আমাদের চেনাজানা মনুষ্য সভ্যতারই ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

আমি আজ আপনাদের সামনে কথা বলতে চাই মনুষ্য মস্তিস্ক নিয়ে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা এই বিষয়টা নিয়েই গবেষণা করি। এক মুহূর্তের জন্য এই সমস্যাটা নিয়ে একটু ভাবুন। এই হল একটা মাংস পিণ্ড। মোটামুটি তিন পাউন্ড ওজনের, যেটা আপনি আপনার হাতের তালুর মধ্যেই ধরতে পারেন। কিন্তু এটা এই আর্ন্তনক্ষত্রিক জগতের বিশালত্বকেও ধারণ করতে পারে। এটা অসীমের অর্থকে ধারণ করতে পারে। আপনি আপনার নিজের অস্তিত্বের অর্থ নিয়েও প্রশ্ন করতে পারেন। প্রশ্ন করতে পারেন ঈশ্বরের প্রকৃতি নিয়েও।

আর এটা সত্যিই এই দুনিয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর জিনিস। এটা্ই মনুষ্য প্রজাতির কাছে একটা বিশাল রহস্য। কিভাবে এ-সব কিছু এল? তো, এই মস্তিস্কটা, যেমনটা আপনি জানেন, তৈরি হয়েছে নিউরন দিয়ে। আমরা এখানে নিউরনগুলোকে দেখছি। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষের মস্তিস্কে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন থাকে। আর মস্তিস্কের মধ্যে এই প্রতিটি নিউরন প্রায় ১০০০ বা ১০,০০০ অন্যান্য নিউরনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এটা মাথায় রেখে, মানুষ হিসেব করেছে যে, এই পরিমাণ মস্তিস্ক কার্যকলাপের permutation ও combination -এর অঙ্কটা মহাবিশ্বের সব মৌলিক কনিকার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়।

তো, আপনি কিভাবে এই মস্তিস্ক নিয়ে জানাবোঝাটা শুরু করবেন? একটা পদ্ধতি হলো, সেইসব রোগীদের নিয়ে পরীক্ষা করা যাদের মস্তিস্কের বিভিন্ন অংশে ক্ষত আছে, এবং এটার উপর নির্ভর করে তাদের আচরণের পরিবর্তন পর্যালোচনা করা। এটা নিয়েই আমি TED এ গতবার কথা বলেছি। আজ আমি একটা ভিন্ন ধরণ নিয়ে কথা বলব। যেটা হলো: মস্তিস্কের বিভিন্ন অংশে ইলেকট্রোড লাগানো। যেন সত্যি সত্যিই মস্তিস্কের একেকটা স্বতন্ত্র স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ রেকর্ড করা যায়।

এখন, খুব সমপ্রতি একটা আবিস্কার সাধিত হয়েছে ইতালির পারমায়। জিয়াকোমো রিজোলাত্তি ও তাঁর সহকর্মী গবেষক দলের দ্বারা। সেটি হলো, এক ধরণের গুচ্ছ নিউরণের উপস্থিতি। যাদেরকে বলা হয় মিরর নিউরন। যেগুলো থাকে মস্তিস্কের সামনে, ফ্রন্টাল লোবসে। এখন, এই আবিস্কারটা এতদিন ধরে জানা একটা ধারণাকে উল্টে দেয় যে, মস্তিস্কের সামনে থাকা নিউরনগুলো সাধারণ মোটর কমান্ড নিউরন। এটাই আমরা জানি বিগত ৫০ বছর ধরে। এই নিউরনগুলো সক্রিয় হবে, যখন কোন ব্যক্তি কোন নির্দিষ্ট একটা কাজ করতে যাবেন। উদাহরণ হিসেবে, যদি আমি এটা করতে যাই, একটা আপেলের কাছে পৌঁছাতে চাই ও সেটা ধরতে চাই, তাহলে আমার মস্তিস্কের সামনে থাকা একটা মোটর কমান্ড নিউরন সক্রিয় হবে ও আমাকে নির্দেশ দিবে সেই বস্তুটা ধরে ফেলতে। এইগুলো হলো মোটর কমান্ড নিউরন। এটাই আমরা জানি একটা লম্বা সময় ধরে।

কিন্তু রিজোলাত্তি যা পেয়েছেন, তা হলো এই নিউরনগুলোরই একটা সাবসেট। সম্ভবত এগুলোর ২০ শতাংশ মতো। এই নিউরনগুলো সক্রিয় হবে, যখন আমি অন্য কাউকেও ঐ একই কাজ করতে দেখব। তো, এগুলো সেই নিউরন, যেটা সক্রিয় হবে যখন আমি নিজে কোন কাজ করতে যাব এবং তখনও, যখন আমি জো-কে কোন একটা বস্তুর কাছে পৌঁছাতে ও ধরতে দেখব। আর এটা সত্যিই তাক লাগানোর মতো। কারণ ব্যাপারটা এরকম যে, এই নিউরনগুলো অন্য মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গিটাও গ্রহণ করছে। এই নিউরনগুলো মস্তিস্কের মধ্যে অন্য মানুষদের কার্যকলাপের একটা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি স্টিমুলেশন তৈরি করে।

এখন, এই মিরর নিউরনগুলোর গুরুত্বটা কোথায়? একটা হলো, এগুলো নিশ্চিতভাবেই কোন ব্যক্তিকে অনুকরণ ও তার সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করা জাতীয় জিনিসের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ একটা জটিল কাজ অনুকরণ করতে হলে আমার মস্তিস্ককে অন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারতে হবে। তো, এটা অনুকরণ করা ও কারও সমকক্ষ হতে পারার জন্য জরুরি। আচ্ছা, এটা গুরুত্বপূর্ণ কেন? এবার আমরা নজর দেই পরবর্তী স্লাইডে। তো, আপনি কিভাবে এই অনুকরণ করেন? কেনই বা এটা গুরুত্বপূর্ণ? মিরর নিউরন আর অনুকরণ, কারও সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা?

এখন আমরা একটু নজর দেই সংস্কৃতির দিকে। মনুষ্য সংস্কৃতি প্রত্যয়টার দিকে। আপনি যদি প্রায় ৭৫ হাজার থেকে একশ হাজার বছর পিছিয়ে গিয়ে মানুষের বিবর্তনটা দেখেন, তো দেখবেন, প্রায় ৭৫ হাজার বছরের কাছাকাছি সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছিল। আর সেটা হলো একটা তড়িত্ উত্থান ও দ্রুতই খুব দক্ষতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড, যেগুলো মানুষেরই বিশেষত্ব, যেমন হাতিয়ার, আগুন, বাসস্থানের ব্যবহার এবং অবশ্যই ভাষার ব্যবহার। এবং অন্য কোন মানুষের চিন্তা অনুমান করতে পারার ও সেই মানুষের আচরণ অনুধাবন করতে পারার ক্ষমতা। এই সবকিছুই হয়েছিল তুলনামূলক দ্রুততার সঙ্গে।

যদিও মনুষ্য মস্তিস্ক তার বর্তমান আকারটা পেয়েছিল প্রায় তিন বা চারশ হাজার বছর আগে। কিন্তু একশ হাজার বছর আগে এই সবকিছু ঘটেছিল খুবই খুবই দ্রুত। আর আমার দাবি হলো, এ সবকিছুর মূলে ছিল একটা সুক্ষ মিরর নিউরন ব্যবস্থার উদ্ভব। যেটা আপনাকে অন্য মানুষদের কাজের অনুকরণ ও তার সমকক্ষ হতে সামর্থ্য যোগায়। তো, তার ফলে যখন কোন গোষ্ঠীর একজন সদস্য একটা আকস্মিক আবিস্কার করে ফেলে, ধরেন, আগুনের ব্যবহার বা নির্দিষ্ট কোন হাতিয়ারের ব্যবহার আবিস্কার করে ফেলে, তখন পরবর্তীতে তা বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার বদলে এটা দ্রুতই সমগ্র জনমানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়।

তো, এর ফলে বিবর্তনটা হঠাত্-ই ডারউইনিয়ান বিবর্তন না হয়ে, হয়ে পড়ে লামারকিয়ান বিবর্তন। ডারউইনিয়ান বিবর্তন খুব ধীরগতির, এটা নেয় কয়েকশ হাজার বছর। একটা পোলার বিয়ার থেকে কোট বানাতে এটা নেয় কয়েক হাজার প্রজন্ম। হয়ত একশ হাজার বছর। কিন্তু একটা মানুষ, একটা বাচ্চা, শুধু তার মা-বাবাকে একটা পোলার বিয়ার মেরে ফেলে সেটার চামড়াটা গায়ে জড়াতে দেখে। আর একধাপেই সেটা শিখে ফেলে। একটা পোলার বিয়ার যা শিখতে একশ হাজার বছর সময় নেয়, সেটা একটা মানুষের বাচ্চা ৫ মিনিটেই শিখতে পারে। বা ১০ মিনিটে। আর যখন এটা শেখা হয়ে গেল, তখন তা বাকি জনসমষ্টির মধ্যে ছড়িয়ে যায় গানিতিক হারে।

এটাই হলো ভিত্তি। জটিল কাজগুলোর অনুকরণ করতে পারাই হলো, যেটাকে আমরা বলি সংস্কৃতি আর এটাই সভ্যতার ভিত্তি। এখন, মস্তিস্কে আরেক ধরণের মিরর নিউরণ আছে, যেগুলো কিছুটা ভিন্ন ধরণের কাজে সম্পৃক্ত থাকে। কোন কাজের জন্য যেমন মিরর নিউরন থাকে। তেমনি কিছু মিরর নিউরন আছে স্পর্শ অনুভবের ক্ষেত্রে। অন্যভাবে বলা যায়, যদি কেউ আমাকে স্পর্শ করে, আমার হাত স্পর্শ করে, তাহলে মস্তিস্কের, সেনসোরি অঞ্চলের স্টোমাটোসেন্সরি কোরটেক্স-এর নিউরন সক্রিয় হবে। কিন্তু, এই একই নিউরন, কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়ে উঠবে, যখন আমি অন্য কোন মানুষকেও স্পর্শ পেতে দেখবে। তো, এটা অন্য মানুষের স্পর্শ পাওয়ার অনুভূতির সঙ্গেও একাত্ম বোধ করছে।

তো, এই নিউরনগুলো বেশিরভাগই সক্রিয় হবে, যখন আমি শরীরের বিভিন্ন অংশে স্পর্শানুভূতি লাভ করব। ভিন্ন ভিন্ন অংশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিউরন সক্রিয় হবে। কিন্তু এগুলোর একটা সাবসেটও সক্রিয় হবে, যদি আমি শুধু অন্য কাউকে শরীরের সেই একই অংশে স্পর্শ পেতে দেখি। তো, এখানে আবার আমরা কিছু নিউরন পাচ্ছি, যেগুলো অন্য কারো স্পর্শানুভূতির সঙ্গে একাত্মতা জানাচ্ছে। এখন, তাহলে প্রশ্নটা ওঠে যে: যদি আমি শুধু অন্য একজন ব্যক্তিকে স্পর্শ পেতে দেখি, তাহলে আমি কেন কনফিউসজড হয়ে যাই না, আর কেন শুধু অন্য ব্যক্তির স্পর্শানুভূতি দেখে আমি আক্ষরিকভাবেই সেই স্পর্শ অনুভব করি না? আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমি ঐ ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করলাম, কিন্তু আমি তো সত্যি সত্যিই সেই স্পর্শটা অনুভব করলাম না। এর কারণ হচ্ছে, আপনার ত্বকে কিছু রিসেপটর আছে। স্পর্শ ও ব্যাথা অনুভবের রিসেপটর। এগুলো আপনার মস্তিস্কে ফিরে যায়, আর গিয়ে বলে, “চিন্তা করো না, তোমাকে স্পর্শ করা হয় নি।” তো, অন্য ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের মাধ্যমে আপনি সত্যি সত্যিই স্পর্শ অনুভব করেন না। এছাড়া হয়তো আপনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়তেন ও তালগোল পাকিয়ে ফেলতেন।

আচ্ছা। তো, এই রিসেপটরগুলোর ফিরতি সাড়া, মিরর নিউরনের সিগন্যালগুলোকে বাতিল করে দেয়। ফলে আপনি সচেতনভাবে সেই স্পর্শ অনুভব করেন না। কিন্তু যদি আপনি আপনার একটা হাত সড়িয়ে ফেলেন, আপনি হাতটাকে অবশ করে ফেলেন, আপনি আমার হাতে একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে ব্রাচিয়াল প্লেক্সাস অবশ করে ফেললেন, এখন আমার হাত একেবারে সাড়হীন। এর মধ্য দিয়ে আর কোন অনুভূতি প্রবাহিত হচ্ছে না। এখন যদি আমি আপনাকে স্পর্শ পেতে দেখি, তাহলে আমি সত্যি সত্যিই আমার হাতে সেই স্পর্শ অনুভব করতে পারব। অন্যভাবে বললে, আপনি আপনার ও অন্য মানুষদের মধ্যে বিদ্যমান ব্যারিয়ার সড়িয়ে দিয়েছেন। তো, আমি এদেরকে ডাকি গান্ধি নিউরন বলে। বা একাত্মতার নিউরন (হাসি)

আর এটা কোন বিমূর্ত রূপক অর্থে না। আপনাকে, তার কাছ থেকে অন্য মানুষদের কাছ থেকে দূরে সড়িয়ে রেখেছে আপনার ত্বক। ত্বকটা সড়িয়ে ফেলুন, আপনি আপনার মাথায় অন্য মানুষদের স্পর্শানুভূতিও অনুভব করতে পারবেন। আপনি আপনার ও অন্য মানুষদের মধ্যে বিদ্যমান ব্যারিয়ার সড়িয়ে ফেলতে পারবেন। আর এটাই, বেশিরভাগ প্রাচ্য দর্শনের ভিত্তি, যে, অন্য মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সত্যিকারের কোন স্বাধীন-স্বতন্ত্র মনুষ্য সত্তা নেই। আপনারা, বস্তুত শুধু ফেসবুক বা ইন্টারনেট দিয়েই যে সংযুক্ত আছেন, তা-ই নয়। বরং আপনারা সত্যিকার অর্থে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত আছেন আপনাদের নিউরন দিয়ে। আর এই মুহূর্তে এই ঘরে এই নিউরনগুলোর একটা বন্ধন আছে। তারা কথা বলছে পরস্পরের সঙ্গে। আর সত্যিই আপনার সচেতনতা ও অন্য কারও সচেতনতার মধ্যে কোন ভিন্নতা নেই।

আর এটা কোন আউল-ফাউল দর্শন না। এটা গড়ে উঠেছে আমাদের স্নায়ুবিজ্ঞানের গোড়ার দিককার বোঝাপড়া থেকে। তো, আপনার কাছে অলীক হাতওয়ালা কোন ব্যক্তি আছে। যদি হাতটা সড়িয়ে দেওয়া হয় আর আপনার কাছে ঐ অলীক হাতটা আসে, তখন যদি আপনি অন্য কাউকে স্পর্শ পেতে দেখেন, তাহলে আপনি আপনার ঐ অদৃশ্য হাতে সেই স্পর্শ অনুভব করবেন। আরও মজার জিনিস হলো, যদি আপনি আপনার ঐ অলীক হাতটাতে ব্যাথা অনুভব করেন, তাহলে আপনি অন্য কোন ব্যক্তির হাত মালিশ করে দিতে দেখলেও আপনার ব্যাথার নিরাময় অনুভব করতে পারবেন। একদম যেন, এই নিউরনগুলো আপনাকে ব্যাথার উপশম করে দিচ্ছে শুধুই অন্য কারও হাত মালিশ করতে দেখে।

তো, এবার আমার শেষ স্লাইড। দীর্ঘদিন যাবত মানুষ বিজ্ঞান ও মানবিক— এই দুইটাকে জ্ঞানচর্চার দুইটা পৃথক শাখা হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। সি.পি.স্নো বলেছেন দুইটা ভিন্ন সংস্কৃতির কথা। একদিকে বিজ্ঞান, অন্যদিকে মানবিক। কখনোই এই দুইয়ের মিলন হয়নি। মিরর নিউরন ব্যবস্থার কার্যকলাপের উপর দৃষ্টিপাত করে আমি বলতে চেয়েছি, এটা আপনাকে সুযোগ করে দেয় সচেতনতা, আত্মসত্তার উপস্থাপন, কী আপনাকে অন্য মানুষদের থেকে পৃথক করে রাখে, কিভাবে আপনি অন্য মানুষদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আরেকবার চিন্তা করার। এমনকি সংস্কৃতি ও সভ্যতার উদ্ভব কেমন করে হলো তা নিয়েও। যে বিষয়গুলো খোদ মনুষ্য প্রজাতিরই বিশেষত্ব। ধন্যবাদ। (হাততালি)

আমাদের প্রায়োগিক প্রজ্ঞার ব্যবহার

অন্তরঙ্গ একটা বক্তৃতায়, সহযোগী কেনেথ শার্পের সহায়তায়, ব্যারি সোয়ার্জ প্রশ্ন তুলেছেন, “কিভাবে আমরা সঠিক কাজটা করি?” তিনি বেশ কিছু গল্প বলেছেন, যেগুলোর মধ্য দিয়ে শুধুই নিয়ম মেনে চলা আর সত্যিই প্রাজ্ঞভাবে সঠিক নির্নয় করার পার্থক্যটা খুব চমৎকারভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।

প্রথমেই আমি আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। দ্বিতীয় যে কাজটা করতে চাই, তা হল- পরিচয় করিয়ে দিতে চাই আমার সহ-লেখক, প্রিয় বন্ধু ও সহ-শিক্ষকের সঙ্গে। কেইন আর আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করছি। ঐ যে কেইন শার্প, ঐখানে। (হাততালি)

তো, অনেক মানুষের মধ্যেই  — অবশ্যই আমি এবং বেশিরভাগ মানুষ, যাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি  — তাদের সবার মধ্যেই একধরণের সম্মিলিত অসন্তুষ্টি আছে। যেভাবে আমাদের চারপাশের জিনিসপত্রগুলো কাজ করছে, তা নিয়ে। যেভাবে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে, তা নিয়ে। আমাদের বাচ্চাদের শিক্ষকেরা যেন তাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ফেল করছে। আমাদের ডাক্তাররা ভালোমতো জানে না যে, আমরা কে। আমাদের জন্য তাদের খুব বেশি সময়ও নেই। আমরা অবশ্যই ব্যাঙ্কারদের উপর আস্থা রাখতে পারি না, আমরা অবশ্যই ব্রোকাদেরকেও বিশ্বাস করতে পারি না। তারা গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটারই বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। আর এমনকি যখন আমরা নিজেদের কাজগুলোও করি, প্রায়ই, আমরা নিজেদেরকে আবিস্কার করি এমন একটা অবস্থানে, যেখানে আমাদেরকে বেছে নিতে হয় যে, কোনটা আমরা মনে করি যে সঠিক জিনিস আর কোনটা প্রত্যাশিত, আকাক্সিক্ষত বা লাভজনক- এই দুটোর মধ্যে একটাকে। তো, যেদিকেই তাকাই না কেন, সবজায়গাতেই, আমরা দুশ্চিন্তা করি যে, যেসব মানুষদের উপরে আমাদের নির্ভর করতে হয়, তারা সত্যিকার অর্থে আমাদের স্বার্থগুলোর কথায় মন দেয় না। বা যদি মন দেয়ও, তাহলে আমরা ভয় পাই যে, আমাদের স্বার্থগুলো ভালোভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে কী করা দরকার, তা নির্ণয়ের জন্য আমাদের সম্পর্কে তাদের যেটুকু জানা দরকার, সেটা তারা জানে না। তারা আমাদের বোঝে না। আমাদেরকে জানা বোঝার মতো সময়ও তাদের নেই।

এই ধরণের সাধারণ অসন্তুষ্টিগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমরা দুই ধরণের সাড়া প্রদান করে থাকি। যদি জিনিসপত্র সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে প্রথম সাড়া হলো: চলো, আরও নিয়ম বানাই। চলো, একগুচ্ছ বিস্তারিত আইনি ক্রিয়াবিধি প্রণয়ন করি যেন নিশ্চিত করা যায় যে, মানুষ সঠিক কাজটাই করবে। ক্লাসরুমে অনুসরণ করার মতো স্ক্রিপ্ট শিক্ষকদের দেওয়া হোক। যেন যদি তারা নাও জানে যে, তারা আসলে কী করছে, আর আমাদের বাচ্চাদের কল্যান সম্পর্কে তারা যদি পরোয়া নাও করে, তাহলেও যতক্ষণ তারা এই স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করবে, ততক্ষণ আমাদের বাচ্চারা শিক্ষিত হতে থাকবে। বিচারকদের দেওয়া হোক বিভিন্ন অপরাধীদের উপর প্রয়োগ করবার জন্য কিছু বাধ্যতামূলক শাস্তির তালিকা। যেন আপনাকে ভরসা করতে না হয় যে, বিচারক কিভাবে তার বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োগ করছে। বিচারকদের যা করতে হবে, তা হলো শুধু তালিকায় দেখতে হবে যে, কোন ধরণের অপরাধের জন্য কোন ধরণের শাস্তি প্রযোজ্য হয়। ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলো সুদ হিসেবে বা ফিস হিসেবে কত অর্থ আদায় করতে পারবে, তা নির্ধারণ করে দেওয়া হোক। আনকেয়ারিং একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠান, যেগুলোর সাথে আমাদের লেনদেন করতে হয়, সেগুলোর কাছ থেকে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য বানাও আরও বেশি বেশি নিয়ম।

অথবা  — অথবা হয়তো আর  — নিয়মগুলোর পাশাপাশি, দ্বিতীয় সাড়া হিসেবে, দেখা যাক আমরা কিছু বুদ্ধিপূর্ণ সুযোগ-সুবিধার বন্দোবস্ত করতে পারি কি না। যেন যাদের সঙ্গে আমাদের লেনদেন করতে হয়, সেই মানুষগুলো যদি আমাদের স্বার্থগুলোর দিকে মন না-ও দেয়. তাহলেও আমাদের স্বার্থ সংরক্ষণটাই যেন তাদের নিজেদেরই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এই ম্যাজিক সুযোগ-সুবিধা ব্যবস্থার ফলে মানুষ সঠিক কাজটা করবে। এমনকি সেটা বিশুদ্ধ স্বার্থপরতার জায়গা থেকে হলেও। তো, আমরা শিক্ষকদের বোনাস প্রদান করি, যদি বড় পরীক্ষাগুলোতে তাদের শিক্ষার্থী বাচ্চাদের পাশের হার বেশি হয়। এভাবেই সাধারণত আমরা স্কুল ব্যবস্থার উৎকর্ষতা বিচার করি।

নিয়ম আর সুযোগসুবিধা  — “লাঠি” আর “মূলা”। সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক পতন মোকাবিলায় ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রিগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে আমরা একগুচ্ছ নিয়মনীতি পাস করেছি। আমরা পাস করেছি ডোড-ফ্রাঙ্ক আইন, আমরা গঠন করেছি নতুন কনস্যুমার ফিন্যান্সিয়াল প্রোটেকশন এজেন্সি। আপাতত এলিজাবেথ ওয়ারেনের মাধ্যমে এটুকুই জানা গেছে পেছন দরজা দিয়ে। হয়তো এই নিয়মগুলো সত্যি সত্যিই ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানিগুলোর আচার আচরণের উন্নয়ন ঘটাবে। আমরা দেখব, ভবিষ্যতে। এর সাথে, আমরা ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রির লোকজনদের জন্যও কিছু সুযোগসুবিধার বন্দোবস্ত করার পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। যার ফলে তারা এমনকি তাদের নিজেদের কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও, শুধুই অল্প সময়ের জন্য মুনাফা করা ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করবে। তো, যদি আমরা সঠিক সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে তারা সঠিক কাজটা করবে — আর যেমনটা আমি বলেছিলাম — স্বার্থপরভাবে, আর যদি আমরা যথাযথ নিয়ম-কানুনের বন্দোবস্ত করতে পারি তাহলে তারা আমাদের একেবারে হাত পা বেঁধে ফেলে দেবে না। আর কেইন [শার্প] ও আমি নিশ্চিতভাবেই জানি যে, আপনাকে ব্যাংকারদের উপর প্রভাববিস্তার করতে হবে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পতনগুলো থেকে যদি আমাদের কোন শিক্ষা নেওয়ার থাকে, তাহলে এটাই হলো সেই শিক্ষা।

কিন্তু, আমরা যা বিশ্বাস করি, আর যা আমরা এই বইয়ে দাবি করেছি, তা হলো, এরকম কোন নিয়মকানুন নেই, কোনই ব্যাপার না যে, সেটা কত বিস্তারিত, কত সুনির্দিষ্ট। কোনই ব্যাপার না যে, সেগুলো কতখানি যতœ নিয়ে দেখভাল করা হচ্ছে বা প্রযুক্ত হচ্ছে। এরকম কোন নিয়মকানুন নেই যেটা আমাদেরকে এনে দেবে আমাদের যা চাই। কেন? কারণ ব্যাঙ্কাররা খুবই বুদ্ধিমান মানুষ। আর জলের মতো, তারা যে কোন নিয়মকানুনেই ফাটল খুঁজে বের করবে। আপনি একধরণের একটা নিয়মগুচ্ছ বানালেন, নিশ্চিত করার জন্য যে, যেসব সুনির্দিষ্ট কারণে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা “প্রায় ধ্বংস” হয়ে গিয়েছিল, তেমনটা যেন আর না হয়। কিন্তু এটা চিন্তা করা খুবই বোকামো হবে যে, অর্থনৈতিক পতনের এই উৎস বন্ধ করে দিয়েছেন মানে আপনি সম্ভাব্য সবধরণের অর্থনৈতিক পতনের উৎস বন্ধ করে দিয়েছেন। কাজেই, এটা শুধু একটা অপেক্ষার প্রশ্ন যে, পরের অর্থনৈতিক পতনটা কখন হবে। আর তারপর আমরা আশ্চর্যান্বিত হব যে, আমরা এত বোকা হয়ে কিভাবে থেকেছি যে, এটার বিরুদ্ধে আমরা নিজেদেরকে সুরক্ষা করিনি।

খুব মরীয়াভাবে আমাদের যা দরকার, ভালো নিয়মকানুন ও যৌক্তিক, বুদ্ধিপূর্ণ সুযোগসুবিধার বাইরে, বা পাশাপাশি, তা হলো সদ্গুন। আমাদের দরকার চরিত্র। আমাদের এমন মানুষ দরকার যারা সঠিক জিনিসটা করতে চায়। আর সুনির্দিষ্টভাবে, যে সদ্গুনটা আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরকার, যেটাকে অ্যারিস্টোটল বলতেন, “প্রায়োগিক প্রজ্ঞা”। প্রায়োগিক প্রজ্ঞা হলো সঠিক জিনিসটা করার নৈতিক ইচ্ছা আর কোনটা সঠিক জিনিস তা খুঁজে বের করার নৈতিক দক্ষতা। অ্যারিস্টোটল তার চারপাশে কাজ করা কারিগররা কিভাবে কাজ করে, সেটা দেখতে খুবই আগ্রহবোধ করতেন। আর তিনি খুবই মুগ্ধ এটা দেখে যে, কিভাবে তারা একেকটা অভিনব সমাধান  তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ভাবন করছে অভিনব সমস্যাগুলোর জন্য। যে ধরণের সমস্যার মুখে তারা আগে কখনও পড়েনি। একটা উদাহরণ হলো, তিনি Isle of Lesbos এ স্টোনম্যাসনদের কাজ করা দেখছিলেন। আর একসময় তাদেরকে গোলাকার কলামের মাপ নির্ণয় করতে হবে। আপনি একটু চিন্তা করে দেখেন, একটা রুলার ব্যবহার করে গোলাকার কলামের মাপ নির্নয় করা কিন্তু সত্যিই কঠিন। তো, তারা কী করল? তারা এই সমস্যাটার একটা চমৎকার সমাধান উদ্ভাবন করল। তারা এমন একটা রুলার বানাল, যেটাকে বাঁকানো যায়। যেগুলোকে আমরা আজকের দিনে ট্যাপ মেজার- নমনীয় রুলার বলে ডাকি। একটা রুলার, যেটাকে বাঁকানো যা। আর অ্যারিস্টোটল বলেছিলেন, “হাহ! তারা এটা প্রশংসা করেছে যে, কখনও কখনও গোলাকার কলাম ডিজাইনের জন্য, আপনাকে রুলারটা বাঁকাতেও হবে।” আর অ্যারিস্টোটল অন্যান্য মানুষের সঙ্গে আলাপ করার সময় প্রায়ই বলতেন, আমাদের নিয়মকানুনগুলোকে বাঁকানোর দরকার।

অন্য মানুষের সঙ্গে কাজ করার সময়, প্রয়োজন হয়, এমন এক ধরণের নমনীয়তা যা কোন নিয়মগুচ্ছ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেন যে, কখন আর কিভাবে নিয়মকানুনগুলোকে বাঁকাতে হবে। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেন যে, কিভাবে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ভাবন করতে হবে। যেভাবে আমার সহলেখক কেন আর আমি এটাকে বর্ণনা করেছি, তারা অনেকটা জ্যাজ মিউজিসিয়ানদের মতো। নিয়মকানুনগুলো হলো পেজ-এ নোটের মতো। আর সেটা আপনাকে শুরুটা করিয়ে দেয়। কিন্তু তারপর আপনাকেই পেজের ঐ নেটগুলোকে ঘিরে সঙ্গীত রচনা করতে হবে। সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তের সঠিক সমন্বয়তার বিচার করে আর নির্দিষ্ট কিছু সহযোগী বাদক নিয়ে। তো, অ্যারিস্টোটলের জন্য. ব্যাপারটা এরকম ছিল যে, যেকোন ধরণের রুল-বাঁকানো, রুলের ভিন্নতা খুঁজে বের করা ও সেটা প্রয়োগের ক্ষমতা আমরা এই দক্ষ কারিগরদের মধ্যে দেখতে পাই, ঠিক তেমনটাই থাকতে হবে, যদি আপনি হতে চান একজন দক্ষ নৈতিক কারিগর। আর অন্য মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে, প্রায় সবসময়ই, এক ধরণের নমনীয়তাই আপনার প্রয়োজন। একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি জানেন কখন তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ভাবন করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি এই বাঁকানো বা নতুন প্রয়োগগুলো করবেন, সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। যদি আপনি একজন নিয়মকানুন বাঁকাতে ও উদ্ভাবনে সক্ষম ব্যক্তি হন, আর সেটা যদি আপনি করেন বেশিরভাগই নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য, তাহলে আপনি যা করছেন তা হলো, অন্যান্য মানুষের উপর নির্মম নিয়ন্ত্রণ।

কাজেই, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনি এই প্রাজ্ঞতাপূর্ণ চর্চাটা করবেন অন্য মানুষদের কল্যানের স্বার্থে। নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়। কাজেই, সঠিক জিনিসটা করার ইচ্ছাটার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো, উদ্ভাবনের ক্ষেত্র ও ভিন্নতা খুঁজে বের করার নৈতিক দক্ষতা। দুটো একসাথে মিলিয়েই গড়ে ওঠে প্রায়োগিক প্রজ্ঞা। যেটাকে অ্যারিস্টোটল ভেবেছিলেন একটা প্রধান সদ্গুন।

এবার আমি আপনাদের একটা উদাহরণ দেব যে, কিভাবে এই প্রাজ্ঞতাপূর্ণ চর্চাটা বাস্তবে কাজ করে। এটা মাইকেলের মামলার ঘটনাটা নিয়ে। মাইকেল একটা যুবক ছেলে। সামান্য বেতনের একটা চাকরি করে। তাই দিয়ে বউ-বাচ্চার দেখভাল করে। তার বাচ্চাটা প্যারোচিয়াল স্কুলে যেত। এরপ সে তার চাকরিটা হারায়। সে কিভাবে তার সংসারের ভরনপোষণ করবে তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এক রাতে, সে কিছু বেশিই মদ্যপান করে। আর একটা ট্যাক্সিচালককে ছিনতাই করে। হাতিয়ে নেয় ৫০ ডলার। সে এই ছিনতাইটা করেছিল বন্দুক ধরে। সেটা ছিল একটা খেলনা বন্দুক। মাইকেল ধরা পড়ে। অভিযুক্ত হয়। এ ধরণের অপরাধের সাজা পেনসিলভানিয়ার শাস্তিপ্রদান নীতিমালা অনুযায়ী কমপক্ষে দুই বছর- ২৪ মাস হওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে জজ, জজ লুইস ফোরের ভেবেছিলেন, এটার কোন মানেই হয় না। লোকটা এ ধরণের অপরাধ আগে কখনও করে নি। সে একজন দায়িত্বপূর্ণ স্বামী ও বাবা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। মরীয়া কিছু পরিস্থিতির মুখে পড়েই সে এমনটা করেছে। এখন এধরণের সাজা দেয়া হলে তা পরিবারটাকে আরও নড়বড়ে করে দেবে। আর তাই তিনি একটা শাস্তি উদ্ভাবন করলেন — ১১ মাস। আর শুধু এটাই না, তিনি মাইকেলকে প্রতিদিন বাইরে গিয়ে কাজ করারও সুযোগ করে দিলেন। রাতটা জেলে কাটাও, দিনে বাইরে চাকরি করে আয় কর। মাইকেল করেছিল। সে তার শাস্তির মেয়াদ শেষ করেছিল। সে পূর্ণবাসিত হয়েছিল। নতুন একটা চাকরিও খুঁজে পেয়েছিল। আর পূর্ণমিলিত হয়েছিল তাদের পরিবার।

আর মনে হয়েছিল, এটা একটা একধরণের শান্তিপূর্ণ জীবনের পথই নির্দেশ করে। গল্পের একটা আনন্দপূর্ণ পরিণতি। একজন প্রাজ্ঞ জজের প্রাজ্ঞতাপূর্ণ উদ্ভাবনের কারণে। কিন্তু এরপর ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ালো যে, জনাব প্রসেকিউটর এতে খুশি হতে পারলেন না যে, জজ ফোরের শাস্তিদানের নীতিমালা অগ্রাহ্য করলেন ও নিজস্ব ব্যবস্থা উদ্ভাবন করলেন। ফলে, তিনি আপিল করলেন। তিনি অস্ত্রসহ ডাকাতির জন্য প্রযোজ্য সর্বনিম্ন সাজা দেওয়ার আবেদন জানালেন। যদিও মাইকেল সেটা করেছিল একটা খেলনা অস্ত্র দিয়ে। অস্ত্রসহ ডাকাতির নুন্যতম সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। তিনি আপিলটা জিতলেনও। মাইকেলকে ৫ বছর কারাদণ্ডের সাজা দেওয়া হলো। জজ ফোরেরও আইন অনুসরণ করতে বাধ্য হলেন। আর এই আপিলটা উঠেছিল তার পূর্বে প্রযুক্ত সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর। মাইকেল কারাগারের বাইরে চলে এসেছিল। একটা চাকরি করছিল। পরিবারের দেখভাল করছিল। আর তাকে আবার কারাগারে ফিরে যেতে হলো। জজ ফোরের করেছিলেন, যা তিনি করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। আর তারপর তিনি বেঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। আর মাইকেল হারিয়ে গিয়েছিল। তো, এটা হলো একটা উদাহরণ, প্রাজ্ঞতার চর্চা ও প্রাজ্ঞতার অবদমন, উভয়ের ক্ষেত্রেই। যে প্রাজ্ঞতার অবদমনটা করা হচ্ছে নিয়মকানুন দিয়ে। যে নিয়মকানুনগুলো বানানো হয়েছে, অবশ্যই, যেন সবকিছু ভালোভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য!

এবার ধরেন, মিস ডিউয়ির কথা। ডিউয়ি টেক্সাস এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষিকা। একদিন তিনি নিজেকে আবিস্কার করলেন একজন পরামর্শকদাতার শ্রোতা হিসেবে। যিনি শিক্ষকদের সহায়তার চেষ্টা করছেন যে, কিভাবে বাচ্চাদের পরীক্ষার নম্বর বেশি করানো যায়, যেন বড় পরীক্ষাগুলোকে বাচ্চাদের পাশের হার বেশি হয়। এবং স্কুল অভিজাত শ্রেণীতে উন্নিত হয়। টেক্সাসের এ ধরণের সব স্কুলই এই মাইলফলকগুলো ছোঁয়ার জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। আর অন্য স্কুলগুলোকে হারিয়ে যদি আপনি টিকে থাকেন, তাহলে আপনার জন্য থাকবে বোনাস আর নানারকম অন্যান্য সুযোগসুবিধা। তো, পরামর্শদাতার পরামর্শটা ছিল: প্রথম, সময় নষ্ট করবে না সেই বাচ্চাদের পেছনে, যারা পাশ করবেন। তুমি কী করছ বা না করছ, সেটা যেখানে কোন ব্যাপারই না। দ্বিতীয়, সময় নষ্ট করবে না সেই বাচ্চাদের পেছনে, যারা কোনভাবেই পরীক্ষায় পাশ করবে না, সে তুমি যাই কর না কেন। তৃতীয়, সময় নষ্ট করবে না সেই বাচ্চাদের পেছনে, যারা এই জেলায় এত পরে এসেছে যে, তাদের নম্বরটা গুনতির মধ্যে আসবে না। তোমার সমস্ত সময় আর মনোযোগ দাও সেই বাচ্চাদের দিকে যারা পাশ-ফেলের মাঝে ঝুলছে। তথাকথিত “ঝুলন্ত বাচ্চা”। যে বাচ্চাদের উপর তোমার হস্তক্ষেপ, তাদেরকে ফেল করে যাওয়া থেকে কোন মতে পাশ করিয়ে দিতে পারে। তো, মিস ডিউয়ি এটা শুনলেন। আর তিনি কিছুটা অস্বচ্ছন্দে মাথা নাড়ালেন। যেখানে সহকর্মী অন্যান্য শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে উল্লাস করছেন আর সমর্থনে মাথা ঝাঁকাচ্ছেন। যেন তারা একটু পরেই একটা ফুটবল ম্যাচ খেলতে যাচ্ছেন। আর মিস ডিউয়ির জন্য, এটা করার লক্ষ্যে তিনি শিক্ষক হন নি।

এখন, কেন আর আমি একেবারে সরলসাধা না। আর আমরা বুঝি যে, আপনার নিয়মকানুনের প্রয়োজন আছে। আপনাকে সুযোগ সুবিধার বন্দোবস্তও করতে হয়। মানুষকে জীবন ধারণ তো করতে হবে। কিন্তু এই নিয়মকানুন আর সুযোগসুবিধার উপর নির্ভর করার সমস্যাটা হলো যে, এগুলো পেশাগত কাজকর্মগুলোকে নৈতিকতাহীন করে দেয়। নৈতিকতাহীন করে দেয় দুই অর্থে। প্রথমত, তারা মনোবলহীন করে দেয় ব্যক্তি মানুষদের, যারা কাজকর্মগুলোর সঙ্গে যুক্ত আছেন। জজ ফোরের বেঞ্চ ছেড়ে চলে যান আর মিস ডিউয়ি হন পুরোপুরি মনোক্ষুন্ন। আর দ্বিতীয়ত, তারা খোদ কাজকর্মগুলোকেই নৈতিকতাহীন করে দেয়। পুরো চর্চাটাই হয়ে পড়ে নৈতিকতাহীন। চর্চা-করনেওয়ালারাও হয়ে পড়েন নৈতিকতাহীন। মানুষজন সঠিক কাজটা করবে এটা নিশ্চিত করার জন্য যখন আপনি সুযোগসুবিধা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবেন, তখন আপনি এমন ধরণের মানুষ গড়ে তুলবেন যারা এই সুযোগ-সুবিধাগুলোর প্রতি নেশাগ্রস্থ হয়ে যাবে। এটাই বলা যায় যে, এই ব্যবস্থা এমন মানুষ গড়ে তোলে, যারা কাজ করবেই শুধু এই সুযোগ-সুবিধাগুলোর জন্য।

এখন, সবথেকে তাক লাগানো ব্যাপারটা হচ্ছে যে, মনোবিজ্ঞানীরা এগুলো সবই জানেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে। মনোবিজ্ঞানীরা সবকিছুরই এই সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তিকরণের নেতিবাচক পরিণতিগুলোর ব্যাপারে জানেন প্রায় ৩০ বছর ধরে। আমরা জানি যে, ছবি আঁকার জন্য আপনি যদি শিশুকে পুরস্কার দেন, তাহলে তারা খোদ ছবি আাঁকানোটার দিকে নজর দেওয়াই ছেড়ে দেবে। শুধু ভাববে পুরস্কারটা নিয়ে। যদি আপনি শিশুকে বই পড়ার জন্য পুরস্কার দেন, তাহলে তারা বইয়ের মধ্যে কী আছে তা নিয়ে মাথা ঘামানো বাদ দেবে। শুধু ভাববে কতখানি পড়া হলো। আপনি যদি শিক্ষকদের পুরস্কৃত করেন বাচ্চাদের পরীক্ষা পাশের হার দেখে, তাহলে তারা বাচ্চাদের শিক্ষিতকরণ নিয়ে ভাবা বাদ দেবে। শুধু মনোযোগ দেবে বাচ্চাদের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে। যদি আপনি ডাক্তারকে পুরস্কৃত করেন বেশি পরিমাণ রোগী দেখার জন্য — যেটা এখন করাও হচ্ছে — তাহলে তারা আরও বেশি রোগী দেখবে। আবার যদি কম রোগী দেখার জন্য পুরস্কৃত করেন- তাহলে তারা কমই দেখবে। আমরা যা চাই, তা হলো এমন ডাক্তার, যিনি সঠিক পরিমাণ রোগী দেখবেন। সঠিক কারণের জন্য সঠিক পরিমাণ রোগীÑ রোগীদের কল্যান্যার্থে সেবা প্রদান করবেন। মনোবিজ্ঞানীরা এগুলো কয়েক যুগ ধরেই জানেন। আর এখন নীতি নির্ধারকদের একটু এ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। তাদের উচিৎ, সবসময় শুধু অর্থনীতিবীদদের কথা না শুনে কিছু সময় মনোবিজ্ঞানীদের কথাও শোনা।

আর এটা যে এই পথে চলতেই হবে, এমনটাও নয়। আমরা মনে করি, আমি আর কেন যে, আশা করার মতো সত্যিকারের উৎসও আছে। এই ধরণের চর্চার মধ্যে থেকেও আমরা একধরণের মানুষকে চিহ্নিত করেছি, যাদেরকে আমরা বলি, বিচক্ষণ আইনভঙ্গকারী। এই ধরণের মানুষদেরকে প্রথাগত নিয়মকানুন মান্য করা ও সুযোগসুবিধাপ্রাপ্তির একটা ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু তারা নিয়মকানুনের আশপাশ দিয়ে একটা পথ বের করে, নিয়মনীতিগুলোকে দুর্বল করার পথ বের করে। তো, এখন এমন শিক্ষকেরা আছেন, যাদেরকে শিক্ষাদানের জন্য একটা স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করতে হয়। আর তারা জানেন যে, যদি তারা এই স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করেন, তাহলে বাচ্চারা কিছুই শিখবে না। আর তাই তারা স্ক্রিপ্টটা অনুসরণ করে ঠিকই, কিন্তু এটা তারা করে দ্বিগুন সময় লাগিয়ে। আর এরমধ্যে তারা কিছু বাড়তি সময় বের করে বাচ্চাদের শেখায়। যে পদ্ধতিতে বাচ্চারা সত্যিকার অর্থে কিছু শিখতে পারবে। তো, এঁরা হলেন কিছুটা ব্যতিক্রমী মানুষ। প্রতিদিনকার নায়ক। তাঁরা খুবই শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু এমন একটা ব্যবস্থায় তারা কাজ করছেন যেখানে হয় তাদেরকে নির্মূল করা হবে বা উৎপীড়ণ করা হবে, সেখানে এই ধরণের কর্মকাণ্ড লম্বা সময় ধরে চালিয়ে যাওয়া খুবই দুরুহ ব্যাপার।

কাজেই বলা যায়, বিচক্ষণ আইনভঙ্গকারীরা, কিছুই না থাকার চেয়ে অনেক ভালো। কিন্তু এটা কল্পনা করা কঠিন যে, এরা খুবই দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকছেন। আরও বেশি আশাবাদী হওয়া যায় সেই মানুষদের নিয়ে, যাদেরকে আমরা বলি, ব্যবস্থা-পরিবর্তনকারী। এঁরা হলেন সেই মানুষ যারা কোন ব্যবস্থার নিয়ম-নীতিকে বোকা বানানোর চেষ্টা না করে বরং খোদ ব্যবস্থাটাকেই রুপান্তরের চেষ্টা করেন। আমরা এরকম অনেকগুলো উদাহরণ নিয়ে কথা বলেছি। একটা বিশেষ উদাহরণ হিসেবে বলা যায় জজ রবার্ট রাসেলের কথা। একদিন তিনি পড়েছিলেন গ্যারি পেট্টেনগিলের কেসটার সামনে। ২৩ বছর বয়সী পেট্টেনগিল ছিলেন একজন ভেট। যে সেনাবাহিনীতে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু তারপর ইরাকে গিয়ে সে পিঠে গুরুতর চোট পায়, আর তার ফলে তাকে চিকিৎসার জন্য বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়। সে বিবাহিত ছিল। সে সময় তার তৃতীয় বাচ্চা ভূমিষ্ট হতে যাচ্ছিল। পিঠের দুরাবস্থা, চারপাশের ভয়াবহ পরিস্থিতির ফলে সে পিটিএসডি-তে ভুগছিল। আর সে তার কিছু কিছু উপসর্গ কমানোর জন্য গাঁজা খাওয়া শুরু করে। সে তার পিঠের কারণে শুধু পার্ট-টাইম কাজ করতেই সক্ষম ছিল। ফলে সে তার পরিবারের দেখভাল ও খাদ্য সংস্থানের জন্য পর্যাপ্ত আয় করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। তো, সে গাঁজা বিক্রি করা শুরু করে। নেশার জগতে পুরোপুরি তলিয়ে যায়। তার পরিবারকে বের করে দেওয়া হয় বাড়ি থেকে। আর সমাজের কল্যানী সংস্থাগুলো হুমকি দিতে থাকে, বাচ্চাগুলোকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য।

শাস্তিবিধানের সাধারণ বিধিমালার অধীনে, মাদকাসক্তির অপরাধে পেট্টেনগিলকে লম্বা মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া ছাড়া আর কোন সুযোগ হয়ত জজ রাসেল পেতেন না। কিন্তু এক্ষেত্রে জজ রাসেলের কাছে একটা বিকল্প ব্যবস্থা ছিল। কারণ তিনি ছিলেন একটা বিশেষ ধরণের কোর্টের আওতায়। তিনি ছিলেন, যেটাকে বলা হয়, যুদ্ধাহত সৈনিকদের জন্য গঠিত বিশেষ কোর্ট (ভেটেরানস কোর্ট)। যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরণে কোর্ট প্রথমবারের মতো চালু করা হয়। জজ রাসেল গড়ে তুলেছিলেন এই যুদ্ধাহত সৈনিকদের কোর্ট (ভেটেরানস কোর্ট)। এ ধরণের কোর্ট শুধুমাত্র য্দ্ধুাহত সৈনিকদের জন্য, যারা আইনভঙ্গ করেছে। আর তিনি এই কোর্ট তৈরি করেছিলেন কারণ বাধ্যতামূলক শাস্তিদানের আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে বিচার জিনিসটাকেই বাদ দিয়ে দিচ্ছিল। কেউই অহিংস অপরাধীদের, বিশেষত অহিংস যুদ্ধাহত সৈনিক অপরাধীদের কারাগারে নিক্ষেপ করতে জায় না। তারা কিছু একটা করতে চায়, আমরা সবাই জানি, যেটাকে বলা হয় অপরাধী বিচার ব্যবস্থার ঘূর্ণায়মান দরজা, তা নিয়ে। আর ভেটেরানস কোর্ট যেটা করেছিল, তা হল, এটা অপরাধীদের বিবেচনা করেছিল একেকজন ব্যক্তিমানুষ হিসেবে। তাদের সমস্যার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাদের করা অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে অভিনব সাড়া প্রদানের চেষ্টা করেছিল। যেটা পরবর্তীতে অপরাধীদের সাহায্য করেছে পূর্ণবাসনের ক্ষেত্রে। আর একবার রায় শুনিয়ে দিয়েই ভেটেরানস কোর্ট নিজের কাজ শেষ করেনি। তারা অপরাধীদের পাশে থেকেছে। তাদের কাজকর্মের গতিবিধি অনুসরণ করেছে। এটা নিশ্চিত করার জন্য যে, অপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে একসাথে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তা যেন যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।

এখন ২২টা শহরে এই ধরণের ভেটেরানস কোর্ট কাজ করছে। কেন এই ধারণাটা ছড়িয়ে গেল? একটা কারণ হচ্ছে, জজ রাসেল এ বছরের ফেব্র“য়ারী পর্যন্ত তাঁর কোর্টে ১০৮ জন অপরাধীকে পেয়েছিলেন। আর এই ১০৮ জনের মধ্যে, অনুমান করুন কতজন বিচারব্যবস্থার ঘূর্ণায়মান দরজা দিয়ে কারাগারে প্রেরিত হয়েছে? একজনও না। একজনও না। যে কেউই অপরাধী বিচার ব্যবস্থার এই ধরণের রেকর্ড দেখে ভিড়মি খেতে পারেন। তাহলে, এ ধরণের ব্যবস্থা-পরিবর্তকও আমরা পাচ্ছি। আর মনে হচ্ছে এটা কার্যকরীও।

এরকম ব্যাঙ্কারও আছেন, যিনি অলাভজনক কমিউনিটি ব্যাঙ্ক গড়েছেন, যা অন্যান্য ব্যাঙ্কারদেরও উৎসাহিত করেছে। আমি জানি এটা বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু এটা এমন ব্যাঙ্কারদের উৎসাহিত করেছে, যারা কম আয়ের গ্রাহকদের মঙ্গলার্থে কাজ করেন। একটা প্রায় ভেঙ্গে পড়া কমিউনিটিতে অর্থ বিনিয়োগ করে তারা এটার পূর্ণগঠনে সাহায্য করছে। যদিও তাদের ঋণগ্রহীতারা সাধারণ মাপকাঠিতে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের ডিফল্ট রেট খুবই কম। কিন্তু ব্যাংকটা মুনাফাও করছে। ব্যাংকাররা তাদের ঋণগ্রহীতাদের পাশে থেকেছে। তারা শুধুই প্রথমে ঋণ গ্রহণ করে পরে সেই ঋণ বিক্রি করেনি। তারা ঋণগুলোর ক্ষেত্রে সেবা দিয়ে গেছে। তারা নিশ্চিত করেছে যে, ঋণগ্রহীতারা যেন অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।

ব্যাংকিংটা সবসময়ই এরকম পথে ছিল না, যেমনটা আমরা এখন সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেখতে পাই। এমনকি গোল্ডম্যান সাচও একসময় তার গ্রাহকদের যথার্থ সেবা প্রদান করতেন। এটা এমন একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আগপর্যন্ত, যেখানে সে শুধু নিজের স্বার্থের কথাই ভাববে। ব্যাংকিংটাও সবসময় এরকম ছিল না। আর তার এভাবেই চলার কোন বাধ্যবাধকতাও নেই।

এবার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরেকটা উদাহরণ। হারভার্ডের ডাক্তাররা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনাকে এমনভাবে রুপান্তরের চেষ্টা করছেন, যেন আপনার মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় ও সহানুভূুতিহীনতা তৈরি না হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের মধ্যেই এই বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। আর যে পদ্ধতিতে এটা করা হয়, তা হলো: তৃতীয় বর্ষের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কিছু রোগী নির্বাচন করে দেওয়া হয়, যাদের পুরো এক বছর ধরে দেখভাল করতে হবে। তো, এই রোগীরা শুধু একটা জৈবিক ব্যবস্থা না। তারা শুধুই একটা অসুখ-সম্পর্কিত জিনিস না। তারা মানুষ। প্রাণযুক্ত মানুষ। এর সাথে হয়ত এ নিয়ে প্রচুর পরিমাণ সাড়া পাওয়া যাবে। একজন শিক্ষার্থী থেকে আরেকজন, ডাক্তারদের থেকে সমগ্র শিক্ষার্থীমহল। আর তার পরিণামে সেখানে হয়ত আমরা এরকম একটা প্রজন্ম পাব। আমরা আশা করি- এমন ডাক্তারের, যার কাছে পর্যাপ্ত সময় থাকবে, যে রোগীদের তিনি দেখবেন, তাদেরকে দেওয়ার মতো।

তো, এধরণের অনেক অনেক উদাহরণ নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি। এদের প্রতিটিই দেখায় যে, সত্যিই একটা চরিত্র গড়ে তোলা ও উন্নয়ন করা সম্ভব। আর যথার্থ অর্থে একটা লক্ষ্য নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করাও সম্ভব। যেটাকে অ্যারিস্টোটল হয়ত বলতেন, প্রোপার টেলোস। আর কেইন ও আমি বিশ্বাস করি যে, এটাই পেশাগত অনুশীলকারীরা সত্যিকার অর্থে চায়। মানুষ নিজেদেরকে সদ্গুনসম্পন্ন অবস্থায় পেতে চায়। তারা সঠিক জিনিসটা করার অনুমতি পেতে চায়। তারা এরকম অনুভূতি চায় না যে, প্রতিদিন কাজ শেষে ঘরে ফেরার পর তাদের শরীর থেকে নৈতিক অবক্ষয়ের ময়লা ধুয়ে ফেলার জন্য স্নান করে ফেলতে হয়।

অ্যারিস্টোটল ভেবেছিলেন যে, প্রায়োগিক প্রজ্ঞা হলো আনন্দময়তার চাবিকাঠি। আর তিনি ঠিকই ভেবেছিলেন। আজকাল মনোবিজ্ঞানে অনেক ধরণের গবেষণা হচ্ছে, মানুষ কিসে খুশি হয়, তা নিয়ে। আর গবেষণার পর গবেষণায় যে দুইটা জিনিস সবচেয়ে বেশি এসেছে তা হলো — আমি জানি, এটা হয়ত আপনাদের অনেককেই কিছুটা অবাক করবে — যে দুইটা জিনিস আনন্দময়তার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো: ভালোবাসা আর কাজ। ভালোবাসা: যে কমিউনিটিতে আপনি বাস করেন, সেখানকার এবং আপনার কাছাকাছি থাকা মানুষদের সঙ্গে সফলভাবে সম্পর্ক বজায় রাখা। আর কাজ: এমন ধরণের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকা যেটা অর্থবহ ও সন্তোষজনক। যদি আপনার এ দুটো থাকে, অন্য মানুষদের সঙ্গে ভালো সুদৃঢ় সম্পর্ক আর কাজ, যেটা অর্থবহ আর পরিপূর্ণ, তাহলে আপনার আর বেশি কিছু লাগে না।

তো, ভালোভাবে ভালোবাসতে গেলে আর ভালোভাবে কাজ করতে গেলে আপনার চাই প্রাজ্ঞতা। নিয়মকানুন আর সুযোগসুবিধা আপনাকে কখনই বলে দেবে না যে, কিভাবে একজন ভালো বন্ধু হতে হয়, কিভাবে ভালো অভিভাবক হতে হয়, কিভাবে ভালো স্বামী/স্ত্রী হতে হয় বা কিভাবে ভালো ডাক্তার হতে হয়, ভালো উকিল, ভালো শিক্ষক হতে হয়। নিয়মকানুন আর সুযোগসুবিধা কখনই প্রাজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না। বরং শেষপর্যন্ত, আমাদের দাবি হল, প্রাজ্ঞতার আসলে কোন বিকল্পই নেই। আর প্রায়োগিক প্রজ্ঞা প্রয়োগের জন্য অনুশীলনের অংশ হিসেবে আত্মত্যাগমূলক কর্মকাণ্ড করারও প্রয়োজন পড়ে না। এটা আমাদেরকে দেয় সঠিক জিনিসটা করার ইচ্ছাশক্তি ও দক্ষতা। অন্যদের দ্বারা সঠিকটা করানো — প্রায়োগিক প্রজ্ঞা আমাদের আরও দেয় আমাদের নিজেদের দিয়েও সঠিক জিনিসটা করানোর ইচ্ছাশক্তি ও দক্ষতা।

ধন্যবাদ

(হাততালি)