Posts Tagged ‘ রাজ্জাক ’

আমরা এই আকালেও স্বপ্ন দেখি

আবারও আমার সেই বন্ধুর একটা উক্তি দিয়েই শুরু করি। ৫১ রানে ছয় উইকেট পড়ে যাওয়ার পর সে বলল, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যদি দুই দিন মাঠে ঘাম ঝড়িয়ে প্রাকটিস না করে, শুধু ঘরে বসে গত মাচটা জেতার পর মানুষের বাধভাঙ্গা উচ্ছাসের ভিডিওগুলো দেখত, তাহলেও তারা অন্তত ১৫০টা রান করত’।

তখনো পর্যন্ত চরম আশাবাদীরা বুক বেঁধেছিলেন ১৫০ না হোক, অন্তত তিন অঙ্কের কোটাটা ‘টাইগার’রা পার করতে পারবে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নদীটা পুরোপুরি পার না হতে পারলেও নাঈম, আশরাফুল, রাজ্জাকরা হয়তো তরীটা তীরের কিছুটা কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারবেন। আর তখনো তো উইকেটে আশরাফুল ছিলেন। তিনি যে আমাদের অনেক ভরসার প্রতীক! কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। তরীটা ডুবল। খুব বিশ্রীভাবেই ডুবল। আমাদের আশা-ভরসা, মান-সম্মান, আস্থা, গর্ব-অহঙ্কার সবকিছুরই সলীল সমাধি ঘটল ‘টাইগার’দের উইকেট বৃষ্টির তোড়ে। আর ধীরে ধীরে ঘনিয়ে এল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারতম দিন। ক্ষুব্ধ-বাকহীন বাংলাদেশের সমর্থকরা দিশেহারা হয়ে গেল। হতাশা প্রকাশের ভাষা না পেয়ে তারা কিছুটা বাড়াবাড়িই করে ফেলল। কয়েক জায়গায় ভাঙচুর-পোস্টার ছেড়া এগুলো না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু উইন্ডিজ ক্রিকেট বাসে ইট পাটকেল ছোড়াটা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য না। আমরা নিশ্চয়ই চাই না, আমাদের ক্রিকেট অঙ্গনটাও পাকিস্তানের মতো হয়ে যাক।

তবে এটাকে শুধুই উশৃঙ্খল কিছু মানুষের হঠকারি কার্যকলাপ বলে এককথায় নিন্দা প্রকাশ করে উড়িয়ে দেওয়াটাও বোধহয় উচিত হবে না। এই ক্ষোভের উত্স কী? এই প্রশ্নটাও সম্ভবত তোলার সময় এসেছে।

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা জয়ের পেছনে সাকিব-শফিউলদের ক্রীড়ানৈপুনের সাথে সাথে মিরপুরের গ্যালারিভর্তি দশকেরও যে একটা বিশাল ভূমিকা ছিল, এটা নিশ্চয়ই সবাই সমর্থন করবেন। এমনকি অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও তো ম্যাচ পরবতী সংবাদ সম্মেলনে সে কথা স্বীকার করেছিলেন। ও’ব্রায়েনদের একেকটা উইকেট পতনের পর যেন সাকিবদের পক্ষ থেকে সত্যিই হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মানুষ। সে ম্যাচেও কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং শেষে হার নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু তবুও শেষ পর্যন্ত তারা সাহস ধরে রেখেছিলেন। চিত্কার করে, প্রার্থনা করে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের।

কিন্তু গতকাল তো মানুষ ‘টাইগার’দের পেছনে দাড়ানোর কোন সময়ই পেল না। চিত্কার করে সাহস জোগানোর সুযোগই পেল না। সূয অস্ত না যেতেই শেষ হয়ে গেল দিবা-রাত্রির এই অতি গুরুত্বপূণ লড়াই। যে মানুষগুলো রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকিট জোগাড় করেছিল, বা অনেক আয়োজন করে খেলা দেখার পরিকল্পনা করেছিল, খেলা শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা যে কী পরিমাণ হতাশ হয়েছিলেন, সেই ভাষা বোঝার ক্ষমতা কী আমাদের আছে? বাংলাদেশের ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের বোধহয় সেই ভাষাটা অনুবাদ করা দরকার। প্রতি ম্যাচে মাঠে নামার আগে বোধহয় তাদের সবার আগে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কথা ভাবা দরকার। যাদের হাসি-কান্না একদম ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে সাকিব-তামিমদের ব্যাট-বলের সঙ্গে। যারা তামিমদের একটা চারের মার দেখে অবর্ণনীয় খুশিতে ভেঙ্গে পরে। আবার উইকেট পতনের সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ বাড়িয়ে ফেলে। আমাদের ‘টাইগার’রা কিন্তু সত্যিই আগামী ম্যাচগুলোর আগে এই প্রতিক্রিয়াগুলোর ভিডিও দেখে নিতে পারেন। কাজে লাগলেও লাগতে পারে।

কারণ এখনো তো আমাদের বিশ্বকাপটা শেষ হয়ে যায় নি। অনেকখানিই ফিকে হয়ে গেছে, এটা ঠিক। কিন্তু এখনো গ্রুপ পর্বের আরো তিনটা খেলা বাকিই থেকে গেছে। সাকিবরা নিশ্চয়ই এই লজ্জার তীব্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। এটাই প্রার্থনা। আর আশার কথা হলো এত ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তেও বাঙ্গালী তার রসবোধ হারায় নি। বাংলাদেশ মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর শাহবাগ মোড়ে দুইটা মেয়েকে খুব সেজেগুজে রিকশায় যেতে দেখে একজন বলে উঠল, ‘সামনে য্যায়েন না রে আপা, ‘টাইগার’রা খারায় আছে’! ঐ বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বিচারেও কী এটাকে ইভ টিজিং বলবেন? তারচে বরং আপাতত ঐ আপাদের জায়গায় আমরা স্ট্রাউস, গ্রায়েম স্মিথ বা পিটার বোরেনদের নাম বসিয়ে দিতে পারি। লজ্জায় নীল, শোকে পাথর ‘টাইগার’রা এবার ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠবে, এই আশা তো আমাদের থাকতেই পারে। আর সর্বনিম্ন রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার এত লজ্জা, এত কলঙ্ক, হতাশার পরও তো দেখলাম একজন বলছেন, ’সাকিব তোমরা এগিয়ে যাও। হারলেও তোমাদের সাথে আছি. জিতলেও সাথে আছি।’ সাকিব-তামিমরা শুনতে পাচ্ছেন তো?