Posts Tagged ‘ বাংলাদেশ ’

হুদহুদের নাম “হুদহুদ” কেন?

হুদহুদ। অদ্ভুত! সত্যিই, নামটা একটু অদ্ভুতই বটে! সম্প্রতি যে ঘূর্ণিঝড়টি ভারত-বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার লাখো মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে -এটা তারই নাম। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট এই ঘূর্ণিঝড়টি কিভাবে পেল এই নাম? এর মানেই বা কী? কিভাবে করা হয় এই ঘূর্নিঝড়গুলোর নামকরণ?

Hudhud1

বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ আন্দামান সাগরে সৃষ্টি হয়ে মহা শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে। প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা। ১৭০ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা এই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। অথচ প্রবল এই ঘূর্ণিঝড়ের নামটি কিন্তু এসেছে ওমান থেকে।
হুদহুদ আসলে একটি পাখির নাম। আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক অঞ্চলেই দেখতে পাওয়া যায় আকর্ষণীয় পালক, ঝুঁটি ও লম্বা ঠোঁটের এই পাখিটিকে। ‘হুপি’ নামের এই পাখিকেই ওমান ভাষায় ডাকা হয় হুদহুদ বলে। এটি ইসরায়েলের জাতীয় পাখিও বটে। ২০০৪ সালে যখন আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণের আহ্বান জানানো হয় তখন অন্য আরও কিছু নামের সঙ্গে এই হুদহুদ নামটাও যোগ করেছিল ওমান।

Hudhud
আটলান্টিক মহাসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণ করা হয় ১৯৫৩ সাল থেকে। শুরুটা মিয়ামির জাতীয় হারিকেন সেন্টারে হলেও পরবর্তীতে এই নামকরণ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তত্ত্বাবধানে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণ প্রথা চালু হয়েছে ২০০৪ সাল থেকে। তার আগে এই অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়গুলো যা করার সেটা বেনামেই করত।
ঘূর্ণিঝড়গুলোর গতিপ্রকৃতি বোঝা, কার্যকরীভাবে সতর্কতা জারি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নির্নয় ইত্যাদির জন্য ঘূণিঝড়গুলোর নামকরণ করা উচিৎ বলে শক্ত পদক্ষেপ নেন আবহাওয়াবীদরা। অবশেষে ২০০৪ সালে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণের জন্য একজোট হয় আটটি দেশ। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড। প্রতিটি দেশ প্রস্তাব করে আটটি করে নাম। দেশের নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী একের পর এক আসে র্ন্বিাচিত নামগুলো।
এ বছরের জুনে আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়, নানাউকের নামকরণ করেছিল মিয়ানমার। এবার এসেছে ওমানের পালা। ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের নামটিও এসেছিল ওমান থেকে। এই অঞ্চলের পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়টির নাম হবে নিলোফার। এটি এসেছে পাকিস্তান থেকে।
বাংলাদেশের প্রস্তাবকৃত পাঁচটি নাম ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত হয়ে গেছে। অনিল (২০০৪), অগ্নি (২০০৬), নিশা (২০০৮), গিরি (২০১০) ও হেলেন (২০১৩)। বাংলাদেশের দেওয়া আরও তিনটি নাম ভবিষ্যতে ব্যবহার হবে। সেগুলো হলো: চপলা, অক্ষি ও ফনি।

Cyclone Names

Cyclone Names2
২০০৪ সাল পর্যন্ত যে এই ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণ করা যায়নি তার একটা অন্যতম প্রধান কারণ সনাক্ত করতে গিয়ে ভারতের ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা সেন্টারের প্রধান ড. এম মহাপত্র বলেছেন, ‘এই ধরণের বৈচিত্র্যময় একটা সাংস্কৃতিক অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করতে গিয়ে সবাইকে খুবই সতর্ক আর নিরপেক্ষ থাকতে হয়, যেন এটা কারও অনুভূতিতে আঘাত না করে।’
তবে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করার পরেও বিপত্তি যে বাধেনি, তা কিন্তু নয়। ২০১৩ সালের ঘূর্নিঝড় মহাসেনের নামকরণ করেছিল শ্রীলঙ্কা। কিন্তু এই নামটা নিয়ে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন দেশটির অনেক মানুষ। তারা বলেছিলেন যে, মহাসেন ছিলেন একজন শ্রীলঙ্কান রাজা, যিনি সেখানে এনেছিলেন শান্তি ও সমৃদ্ধি। তাঁর নামে এমন একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নামকরণ করাটা একেবারেই অনুচিত। পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কান কর্তৃপক্ষ ঘূর্ণিঝড়টির নাম বদলে রেখেছিল ভিয়ারু।

ইতিহাস নির্ধারণী মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ

bangladesh_illus_20130318

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাহবাগ চত্বরের আন্দোলন নিয়ে বেশ কয়েকটি ভুল ধারণা চালু হয়েছে। শাহবাগ চত্বর থেকে সরকারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে দ্রুত জামায়াত-ই-ইসলামী নিষিদ্ধ করার কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের সমালোচকেরা এই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। কেউ কেউ এটাকে আখ্যায়িত করছেন ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে। আরেকটি অভিযোগ হলো, এই বিচার করা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদলীয় নেতাদের ঘায়েল করার জন্য। এই উদ্বেগ-আশঙ্কাগুলো পশ্চিমা গণমাধ্যমের ফিল্টার গলে প্রকাশিত হয়েছে। আর এর পেছনে আছে কিছু সুসংগঠিত জনসংযোগ তত্পরতা, যেগুলো চালানো হচ্ছে কিছু নেতৃস্থানীয় জামায়াত নেতাদের তরফ থেকে।

এই নিন্দুকেরা যা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন সেটা হলো, ১৯৮৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান ঘটানোর পর এবার বাংলাদেশ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে তার জন্মকালীন আদর্শগুলোকে। বাঙ্গালী সংস্কৃতির অপহূত বহুমতভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ঘিরে গড়ে ওঠা বিতর্কিত ঘটনাগুলোর অবসান ঘটানোর কাজটাও তাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছেই একটা আবেগীয় ইস্যু। দেশের ভেতরে ও প্রবাসী, উভয়ের জন্যই। আর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল গঠন এই লক্ষ্যপূরণের পথে একটা বিশাল ধাপ।

এই দেশ বা রাষ্ট্র ফাঁসির দাবিতে উন্মত্ত জনতা বা কোন ডেথ স্কোয়াড তৈরি করে নি। বা শুধু বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে মেরে ফেলার জন্য এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেনি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারাধীনদের মধ্যে অনেকেই স্বীকার করেছে যে, তারা ১৯৭১ সালে নৃশংশতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। পুরোপুরি নিখুঁত না হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে, আইনের রীতিনীতি মেনেই ক্রিয়াশীল আছে। এছাড়াও, এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, পুরো বিশ্বজুড়েই এই ধরণের বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠনের ঘটনাগুলো অনেক বিতর্কের মুখে পড়ে। বিচারিক কর্মকাণ্ডগুলো প্রশংশিত বা নিন্দিত হয় কোন পক্ষের দিকে দিকে রায় যাচ্ছে, তা বিবেচনা করে।

এই বিষয়টা নিয়ে ভারতীয় বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে খুবই সাধারণীকৃত বিবরণী। কিন্তু শাহবাগের বিশাল লোকসমাগমটা শুধুই কিছু জামায়াত নেতার ফাঁসির দাবিতে হয়নি। এটা এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটবে। বহুমতভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথে নাকি জামায়াত প্রবর্তিত ভীনগ্রহের মতবাদস্বরুপ ধর্মীয় মৌলবাদের পথে।

চলমান এই আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দের অনেকে নিজেদেরকে ডাকছেন ‘প্রজন্ম ৭১’ নামে। এরা কেউই ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর জামায়াতের নেতৃত্বে রাজাকার-আলবদরদের নৃশংস-নির্মম সহিংসতা দেখেননি। কিন্তু বর্বর আক্রমণের সেই স্মৃতি, এই জাতির সামগ্রিক চেতনার সঙ্গে গেঁথে গেছে আজীবনের জন্য। এই তরুণ প্রজন্ম স্মৃতি-ইতিহাস থেকে শুধু অনুপ্রেরণাই সংগ্রহ করছে না; এটা সবার মাথায় রাখা দরকার যে, এই প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের খুবই কাছের মানুষদের খুন হওয়ার কথা জেনেছে, রাজাকারদের হাতে। ফলে ১৯৭১ সালের নৃসংশ সহিংসতার জন্য দায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি যে বাংলাদেশীদের চেতনাগত জায়গায় নাড়া দেবে, এটাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। আর তারা শাহবাগ চত্বরে আসতেই আছেন।

একদিক থেকে, এই তরুণ প্রজন্ম ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনারও পুনরুজ্জীবন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। যেটা গড়ে উঠেছিল বাংলা ভাষাভাষী তত্কালিন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের উপর জোর করে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রবল প্রতিবাদে। সেইসময়ই এই ভূখণ্ডে রোপণ হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূর্ণতা পায় ১৯৭১ সালে নয়মাসব্যাপী রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। একইভাবে, ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে জনসাধারণের ঢল নামে রাজপথে। সেবার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল তারা।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, যখনই দেশের রাজনীতি তার মূল ভিত্তি উদারনৈতিক বহুমতবাদের মূল জায়গা থেকে সরে যাচ্ছে, তখন রাজনীতিকে সঠিক পথ দেখানোর একটা অসাধারণ ক্ষমতা  এই দেশের মানুষের আছে।

সালাফি মতবাদের একটি সংযোজিত রুপ হচ্ছে জামায়াত। এবং এই সংগঠনটি বাংলাদেশী চিন্তাচেতনার সঙ্গে মিলতে পারে না। পুরো ৮০ ও ৯০এর দশক জুড়ে জামায়াত ও তাদের সহযোগী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর (যেমন জেএমবি, জেএমজেবি, হরকাতুল জিহাদ) হামলার শিকার ছিল সমাজের প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক উপাদানগুলো। এবং এনজিও-র দ্বারা ক্ষমতায়িত গ্রামের নারীরা।

জামায়াতও এখন করছে একটা বাঁচামরার সংগ্রাম। তারা এটা অনুধাবন করতে পারে যে, জনগণের মনোভঙ্গি তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। সেকারণে তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষমূলক অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু ও ভারতকে দোষারোপ করে, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর সহিংস হামলা চালিয়ে তারা মূল ইস্যুটা থেকে সবার দৃষ্টি ফেরাতে চাইছে।

সমাজের অভিজাত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত তথা আপামর জনসাধারণের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শাহবাগ চত্বরের গণজাগরণ, বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ইতিহাস নির্ধারণী মুহূর্তের সামনে। বিশ্ব এই মুহূর্তে ইতিহাসের একটা গতিপথ সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বাক্ষী হয়ে থাকছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তারা এটার গুরুত্বটা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারছে না। ১৯৫২, ১৯৭১-এর মতো এই গণজাগরণই একটা সংকেতরুপে দেখা দেবে, যা নির্ধারণ করে দেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্।

নাফিস আফরোজের এই লেখাটি ভারতের আউটলুক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে লেখক বিবিসি ওয়ার্ল্ডের দড়্গিণ ও পশ্চিম এশিয়ার সাবেক নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন

সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়

এই মুহূর্তে মনে হয় সত্যিই পৃথিবী তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। বা বলা যায় তাকানো শুরু করেছে, কিছুটা সংশয়, কিছুটা আশাবাদ, কিছুটা কৌতুহল-বিস্ময় নিয়ে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে আমরা সেরকমই একটা ইঙ্গিত পেয়েছি। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাভারেজের পরিমাণ বা ধরণ নিয়ে অনেকেরই অনেক সমালোচনা আছে। আমার নিজেরও আছে। কিন্তু এর মধ্যেও, বাংলাদেশের এই গণজাগরণ যে পুরো বিশ্বের সামনেই একটা বিকল্প রুপকল্প দাঁড় করিয়েছে, সে কথা উঠেছে বর্হিবিশ্ব থেকেই। এবং বাংলাদেশ যে বিশ্বকে আরও অনেক শিক্ষা-বার্তা দিতে পারে; শাহবাগ চত্বর যে পুরো বিশ্বের সামনেই নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, তেমন সম্ভাবনার কথাও উচ্চারিত হয়েছে বর্হিবিশ্বের মানুষদের মুখে। এবং তারা এই সম্ভাবনার কথা বলেছেন সম্ভ্রমের সঙ্গে, আশার সঙ্গে। কিন্তু কেন এই সম্ভ্রম, আশাবাদ?  পুরো বিশ্ব কেন তাকিয়ে আছে শাহবাগ চত্বরের ঐক্যবদ্ধ তারুণ্যের দিকে?

1

১৯৭১ সালে যে হানাদার পাকসেনাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, ৪২ বছর পর শাহবাগ আন্দোলন তার প্রথম শিক্ষাটা দিয়েছে এই পাকিস্তানকেই। দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে পাকিস্তানের শাসকেরা তাদের নাগরিকদের-শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছে ভুল ইতিহাস। বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের এই মানুষগুলো যে সবক্ষেত্রে প্রচ্ল অনাচার-বৈষম্য-নির্যাতন-নিপীড়ণের শিকার হওয়ার পর স্বাধীনতার ডাক দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই ইতিহাসটা পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষ জানে না। বা যারা জানে, তাদের বৃহদাংশ মনে করে শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশ একটা স্বাধীন দেশ হিসেবে দাঁড়াতে পেরেছে। এবং অনেকেই মনে করেন যে, স্বাধীন বাংলার জন্ম না হলেই ভালো হতো।

কিন্তু এই রকমের ইতিহাস বিকৃতির ফলাফল যে ভালো হয় না সেটা খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন পাকিস্তানের এক ইতিহাসের শিক্ষক। ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় ইয়াকুব খান বাঙগাস লিখেছেন,

‘১৯৭০-৭১ সালের ঘটনাগুলোর দিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে না চাওয়ায় আমরা এখনো আমাদের অন্যান্য সাংবিধানিক প্রদেশগুলো নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে আছি। এবং আমরা নিজেদের পৃথক পৃথক পরিচিতি নিয়ে গর্ব বোধ করতে পারি না। আমরা ভয় পাই যে, সিন্ধু আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে কারণ সেখানকার মানুষেরা উর্দুর পাশাপাশি তাদের ভাষাটারও স্বীকৃতি চায়। আমরা বেলুচিস্থানে একটা সামরিক অপারেশন চালিয়েছি তার প্রধান কারণ হলো, সেখানকার মানুষেরা তাদের প্রদেশটি নিজেরাই পরিচালনা করতে চেয়েছে। আমরা অস্বস্তিতে আছি এটা ভেবে যে, দক্ষিণ পাঞ্জাব ও বাহাওয়ালপুর আলাদা প্রদেশ হয়ে যায় কিনা। সেখানে একটা আকস্মিক অভ্যুত্থান ঘটে যায় কিনা, এই ভয়ে আমরা ব্যাপারগুলো নিয়ে আলাপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছি এবং আমরা গিলগিট-বালিস্তানের মানুষদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার দেই নি। এগুলোর বেশিরভাগই হচ্ছে ঐ বিগত দিনের ঘটনাগুলোর ভূত। আমরা সেগুলো নিয়ে ভাবতে চাই না, অগ্রাহ্য করি আর আশা করি যে, আলৌকিকভাবে সেগুলো নিজে থেকেই গায়েব হয়ে যাবে।’

কিন্তু তেমনটা যে বাস্তবে হয় না, সেকথাও পরিস্কারভাবেই বলেছেন ইয়াকুব খান। এবং পাকিস্তান যদি এই সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান করতে চায়, তাহলে দেশটির শাসকদের বাংলাদেশের কাছ থেকেই শিক্ষা নিতে হবে বলে মত দিয়েছেন ইতিহাস বিভাগের এই শিক্ষক। তিনি বলেছেন, ‘ ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু এই কারণে না যে, সেটা নিজে থেকেই পুনরাবৃত্তি ঘটায় বা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। বরং ইতিহাস এইজন্যও গুরুত্বপূর্ণ যে, বারংবার ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো অগ্রাহ্য করা একটা দেশের জাতিগত চেতনায় প্রভাব ফেলে। এবং পুরো দেশটাই পুরোনো ঐ ঘটনাগুলোর কবলে জিম্মি হয়ে থাকে।’ সমাধান হিসেবে তিনি পাকিস্তান সরকারকে দেখিয়েছেন ভুল স্বীকার করার পথ। লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি সরকারের জন্য এটাই সুবর্ণ সময়, তত্কালিন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের উপরে তারা যে বর্বরতা চালিয়েছিল সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করার। সত্য ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসবে এমন ঐতিহাসিক দলিলগুলো এতদিন ধরে তারা লুকিয়ে রেখেছে। সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করতে রাজি হতে হবে। সেমময়কার যেসব অপরাধী এখনো বেঁচে আছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার করতে হবে। জনসমক্ষে ঘোষণা দিতে হবে যে, ১৯৭০-৭১ সালে আমরা একটা জাতি হিসেবে, হ্যাঁ, আমরা, সামগ্রিকভাবে যা করেছি সেটার জন্য আমরা দুঃখিত।’ সেটা পাকিস্তান সরকার করবে কিনা, সেটা তাদের ব্যাপার।

আমাদেরকে তো এই মুহূর্তে দেশের পরিস্থিতি নিয়েই ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন থাকতে হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪২ বছর পরেও আমাদেরকে জিম্মি হয়ে থাকতে হচ্ছে খোদ স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীটির সহিংস হুমকির কাছে। যেখানে খোদ পাকিস্তানেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় হাজির করার দাবি উঠছে, সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো তাণ্ডব চালিয়ে যেতে পারছে পাক বাহিনীর সহোদর জামায়াত-শিবির। এই কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন?

যেখানে খোদ পাকিস্তানেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়েছে বেশ সমাদরের সঙ্গে, সেখানে বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারিতে জামায়াত-শিবির বিভিন্ন জায়গায় শহীদ মিনার ভেঙ্গেছে। ইতিহাসের কি নির্মম পরিহাস! মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙ্গে, বাস-ট্রেনে আগুন দিয়ে, বোমাবাজি-ককটেলবাজি করে জনমনে ত্রাস ছড়িয়েছে এই পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা। আর গণজাগরণকে অস্বীকার করে, পুরো দেশের মানুষের নায্য দাবীর আন্দোলনকে অস্বীকার করে নব্য রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি। তারা যে শুধু নিজেরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই আন্দোলন করে, সেকথা এখন পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে দেশের মানুষের কাছে। তাহলে কি দেশে শুধু আওয়ামী লিগেরই রাজনীতি থাকবে? তখন বিরোধী দল কে হবে? বামদলগুলো নাকি ইসলামপন্থী দলগুলো? তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব হবে? নাকি শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে দেশ চলে যাবে ফ্যাসিবাদী শাসনের কবলে? উত্তর এখন জানা নেই, ভাবতে হবে সবাইকেই।

তবে এই প্রশ্নগুলোর উপস্থিতি এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমানে বাংলাদেশ একটা সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি পার করছে। কিন্তু অনেক খারাপ সংবাদ, মেনে নিতে না পারার মতো পরিস্থিতির মধ্যেও এবারের সংকটটা তৈরি হয়েছে অনেক অনেক আশা নিয়ে, অনেক অনেক স্বপ্ন নিয়ে। ৫২, ৬৯, ৭১, ৯০-এর মতো ২০১৩ সালের ইতিহাসটাতেও লিপিবদ্ধ হচ্ছে জনমানুষের উপস্থিতি। জনগণের সংঘবদ্ধতা, তারুণ্যের তীব্র দীপ্তি, মুক্তিকামী মানুষের সংহতি-সৃজনশীলতা দিয়ে ২০১৩-র ইতিহাস রচিত হচ্ছে। এটাই অনেক আশার কথা। অনেক বড় স্বপ্ন দেখার জায়গা। সত্যিকারের গণজাগরণে, মানুষের মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের ঐক্যবদ্ধতায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। এখন আমাদের সামনে, সাধারণ জনগণের সামনে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের নিমূল করে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখার। দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে সত্যিকারের স্বাধীন করার সময় বোধহয় এখনই। এবারের এই জেগে ওঠা তারুণ্য যদি আবার প্রতারিত হয়, তাহলে তার চেয়ে হতাশার বোধহয় আর কিছুই থাকবে না। আর আমাদের সামনে অনুপ্রেরণা হিসেবে তো অনেককিছু আছে। ৫২ আছে, ৬৯ আছে, ৭১ আছে, ৯০ আছে। আমরা তো অনেকখানি এগিয়েই গেছি। এখন আমাদের শুধু ইতিহাস থেকে শিক্ষাটা নিয়ে শুরু করে দিলেই হয়। তবে তার আগে আত্মসমালোচনা দরকার। আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া দরকার। ভুল স্বীকার করে নিতে পারার মানসিকতা দরকার। সবারই। ব্যক্তিমানুষেরও, সংগঠনেরও। সরকারেরও। এটাই বোধহয় আমাদের প্রকৃত মানবিকতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। ভুল কারো হতেই পারে। কিন্তু ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরে সেটা স্বীকার করে নিতে পারার মতো বিনীত আমাদের হওয়া উচিত্।

জামায়াত-শিবির এখন পর্যন্ত যেসব নাষকতা চালিয়েছে, তার সবকিছুই তারা করছে বিভ্রান্তিমূলক, প্রতারণামূলক প্রচারণার মাধ্যমে। যেগুলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাস্যরসেরও উপাদান হয়। কিন্তু এটা তো তারা করতে পারছে। কেন করতে পারছে? এটা কি আমাদেরই ব্যর্থতা না? কেন স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন জামায়াত-ই-ইসলামি এইভাবে ধর্মের নামে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারছে? শাহবাগের এই নায্য দাবী, এখানকার তরুণেরা একুশ-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দ্বারা যেভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে, ২য় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যেভাবে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, সেটা কি পুরো দেশের মানুষ অনুধাবন করছেন? সবার কাছে কী গণজাগরণের দৃপ্ত তারুণ্যের দিপ্তী পৌঁছাচ্ছে? আমরা কি ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে বিরাজমান শিক্ষাগত-সাংস্কৃতিক ব্যবধান-বৈষম্য ঘোঁচানোর কথা ভাবছি?

জামায়াত-শিবির স্বাধীনতার পর গত ৪২ বছরে যেভাবে পুরো দেশজুড়ে তাদের বহুবিধ বিস্তার ঘটিয়েছে সেটা হুট করে গায়েব করে দেওয়া সম্ভব না। নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তাদেরকে অনেকটাই দুর্বল করে দেওয়া যায় কিন্তু পুরোপুরি নির্মুল হয়তো করা যাবে না। কারণ আজ চাঁদের গায়ে সাঈদী দেখাচ্ছে, কাল মেঘের গায়ে মওদুদীকে দেখাবে। এবং কে জানে, সেটা দেখেও হয়তো অনেক ধর্মভীরু মানুষ প্রাণের তোয়াক্কা না করে রাস্তায় বেরিয়ে আসবে বাস-ট্রেন পোড়াতে, বোমাবাজি করতে। সেধরণের পরিস্থিতি মোটেই কাম্য নয়। অহিংস গণজাগরণের মানসিকতায় সেই পরিস্থিতির ঠাঁয় নাই। ফলে আমার মতে, জামায়াত-শিবির নির্মূল করার জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির বৈষম্য ঘোঁচানোর কাজ শুরু করাটা খুবই জরুরি। সত্যিকার অর্থেই দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায়, গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত্ ৭১-এর এই পুনরুদ্ধারিত চেতনার আগুন। মানুষ শুধু একবার এই শাহবাগের তরুণদের কথা শোনার অপেক্ষায় আছে। দেশ গড়ার যে তেজী প্রত্যয় নিয়ে অনেক তরুণ শাহবাগে পড়ে আছে দিনের পর দিন, তাদের দৃপ্ত মুখটা দেখলেই হয়তো এই শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে সংশয়ে ভোগা অনেক মানুষ প্রাণপণে দাঁড়িয়ে যাবেন জামায়াত-শিবিরের নাষকতার বিরুদ্ধে। দেশে একমাত্র সাংস্কৃতিক প্রচার দিয়েই শান্তির পায়ড়া ওড়ানো সম্ভব, অহিংস উপায়ে। এখন আমরা সম্মিলিতভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে পারব কিনা, সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।

এই মুহূর্তে আসলে শুধু বাংলাদেশই না, পুরো বিশ্বই একটা সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি পার করছে। আর সত্যিই হয়তো এই যুদ্ধপিড়ীত, বিপন্ন বিশ্ব তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। এখন হয়তো বর্হিবিশ্বে এই শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি-সংশয়-নেতিবাচকতা  আছে। ভবিষ্যত্ নিয়ে উত্কণ্ঠা আছে। কিন্তু অনেকেই শাহবাগ আন্দোলনের ভবিষ্যত্ দেখার জন্য তাকিয়ে আছেন প্রচ্ল কৌতুহল নিয়ে। তারা এখান থেকে পাচ্ছেন নতুন দিনের ইঙ্গিত, তারা খুঁজে বের করছেন এই আন্দোলনের অনন্যতা, এই আন্দোলনের সম্ভবনা। কে জানে!

02-21-2013motherlanguage

এই আশাবাদের কারণ হচ্ছে, পুরো বিশ্বকেই পথ দেখানোর নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে আগেও আছে। ভাষা যে মনুষ্য সমাজের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, এবং এই ভাষার অধিকার ছাড়া যে একটা জাতির বিকাশ সম্ভব না, এই সত্যটা পুরো পৃথিবীকে রক্তের বিনিময়ে জানিয়েছিলেন ভাষা শহীদেরা। মনুষ্যবিকাশের পথে ভাষা-সংস্কৃতির যে অপরিহার্যতা, তার প্রতি এখন সহমত পোষণ করেছে পুরো বিশ্ব। ১৯৯৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। আর তারপর থেকে পুরো বিশ্বে নানাভাবে বেড়েছে ভাষা বিষয়ক গবেষণা, প্রতিবেদন, চিন্তাভাবনা। ২০০০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে ভাষিক বৈচিত্র্য, বিপন্ন বা বিলুপ্তির হুমকির মুখে থাকা ভাষাগুলো সংরক্ষণ, মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তা, ব্রেইল ও সংকেত ভাষার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ও ভাষার সম্পর্ক, বহুভাষিক শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করেছে জাতিসংঘ। ফলে, বাংলাদেশ আরও একবার নতুন কিছু দিতেই পারে পুরো বিশ্বকে। শাহবাগ আন্দোলন থেকে আরও অনেক শিক্ষাবার্তা, সংকেত-ইশারা হয়তো আগামীতেও পেতে পারেন বর্হিবিশ্বের মুক্তমনা উত্সুক ব্যক্তি/সংগঠন। কে জানে, তারা বোধহয় তেমন কিছু একটা আশাও করছেন?

শাহবাগসৃষ্ট রাজনৈতিক ভূমিকম্প: কতটা কাঁপিয়েছে, আরও কতটা কাঁপাতে পারে?

Shahbag-Protest

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে নৃশংসতা আর অবর্ননীয় নিপীড়ণ চালিয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই দুরুহ। এতকিছু করেও তারা বুঝে গিয়েছিল যে, মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধের সামনে হার স্বীকার না করে কোন উপায় নেই। সেসময় সেই নরপিশাচেরা মেতেছিল ঘৃণ্য এক হত্যাযজ্ঞে। অত্যন্ত নির্মমভাবে তারা হত্যা করেছিল আমাদের সূর্য্যসন্তানদের। আমাদের চিন্তা-চেতনার আদল গড়ে দিতে সক্ষম এমন মানুষদের। মনে হয় ১৯৭১ সালে আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছিল ১৪ই ডিসেম্বর। জহির রায়হান, শহীদুলল্লাহ কায়সাররা যদি আজকে বেঁচে থাকতেন তাহলে হয়তো আমাদের এত এত এত এত গ্লানি-ক্ষোভ-হতাশা-শোষণ-বঞ্চনা নিয়ে দিন পার করতে হতো না। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের উপস্থিতি থাকত অনেক মর্যাদা, অনেক সম্মান নিয়ে। আর সেইসময় পাক-বাহিনীর সহায়তা করে ঘৃণ্য ভূমিকা পালন করেছিল রাজাকার-আলবদর বাহিনী। তাই স্বাধীন বাংলার মাটিতে এই রাজাকারদের ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই। ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই।

গত ৫ ফেব্রুয়ারী কুখ্যাত রাজাকার কাদের (কসাই) মোল্লার রায় শোনার পর খানিকটা অসহায় লাগছিল। তারপর সৃষ্টি হলো ক্ষোভ, যখন দেখলাম যে, হত্যা-গুম-লুট-ধর্ষণ করেও রাজাকার কাদের মোল্লা বিজয় চিহ্ন দেখিয়ে চলে যাচ্ছে নিশ্চিন্ত আবাসে। সে নিজেও জানে যে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ে তার বিজয়ই হয়েছে। স্বাধীন বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এক রাজাকার আদালত থেকে বিজয়-চিহ্ন দেখিয়ে চলে যাচ্ছে, এটা দেখে আমরা অনেকেই হোঁচট খেয়েছিলাম, টালমাটাল হয়ে পড়েছিলাম। তবে এই অপমানজনক পরিস্থিতিতে আমাদের খুব বেশিক্ষণ হতবিহ্বল হয়ে থাকতে হয়নি তরুণ ব্লগার-অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ত্বড়িত উদ্যোগে। আর তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে অল্প সময়ে মধ্যেই রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন অগণিত মানুষ। এই বিপুল পরিমাণ মানুষ তাদের বহুদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ-হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন গানে গানে, শ্লোগানে-শ্লোগানে। এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনেপ্রাণে ধারণ করে রাখা, লালন করে রাখা এই আবেগতাড়িত মানুষগুলি কিন্তু এখনো বাড়ি ফিরে যাননি। আজ শাহবাগ আন্দোলনের ১০ম দিন। এখনো একটুও কমেনি প্রতিবাদের আগুন। বরং আরও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে। এমনকি বর্হিবিশ্বেও।

গণজাগরণে সামিল হওয়া বাংলাদেশের এই জনগণ কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে এতদিন অস্তিত্বমান ছিলেন শুধু রাজনীতিবিদদের মুখের কথায়। জনগণ এইডা চায়, জনগণ ওইডা চায়, জনগণ হরতাল সফল করেছে, জনগণ হরতাল প্রত্যাখ্যান করেছে। আসলেই জনগণ কী চায়, সেইটা যখন তারা দেখিয়েছে, তখন শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ভূমিকম্প। কত মাত্রার সেটা এখনো নির্নয় করা সম্ভব হয়নি। সেটা সবাই মিলেই পরিমাপ করতে হবে।

শাহবাগ-সৃষ্ট রাজনৈতিক ভূমিকম্প যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে ইতিমধ্যেই অনেকখানি কাঁপিয়ে দিয়েছে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহই নেই। সরকার অভূতপূর্ব দ্রুতগতিতে আইন সংশোধন করে আবার রায় পূর্ণবিবেচনার আপিল করার সুযোগ সৃষ্টি করছে। জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক সহযোগী বিএনপিও টানা ৮দিন নব্য রাজাকারের ভূমিকা পালন করার পর শাহবাগের তরুণদের দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করেছে। এগুলো আমাদের মধ্যে অনেক অনেক আশার সঞ্চার করে। শুধু রাজনৈতিক নেতাদের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকা, আর পছন্দ না হলে হা-হুতাশ করার ছাড়াও বড় ধরণের বদল ঘটাতে পারার দৃঢ়তা যে দেশের সাধারণ মানুষের আছে, সেই বিশ্বাসটা আরও দৃঢ় হয়। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণের এই সক্রিয় ভূমিকা আরও কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে বা আমরা নিয়ে যেতে চাই সেটা বিবেচনা করা দরকার কি না?

গতকাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক বখতিয়ার বাদল লিখেছেন, ‘১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ কোন মারামারি-খুনাখুনির নাম না, শুধু একটা রাষ্ট্রবিপ্লব না, এইটা একটা সমাজ বিপ্লব ছিল। কারণ তখন আমরা অসম্ভবকে ভাবতে পারছিলাম, হাজার বছরের উপনিবেশিক শাসন পার করে একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে আমরা নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে পেয়েছিলাম, সেই বিপ্লব কিন্তু একদিনে আসে নাই, আসছিল ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৯ এর হাত ধরে। আজকের ২০১৩ কি আমাদের হাত ধরে আর কোন নতুন একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে? খুব অন্যরকম কোন সমাজের স্বপ্ন দেখাতে পারে?’ এখন যে নতুন এক মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেইটা ইতিমধ্যে বেশ ভালোই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ফেসবুকে-অনলাইনে চলছে সাইবার যুদ্ধ। গড়ে উঠেছে স্বাধীন-বাংলা ফেসবুককেন্দ্র। প্রকাশিত হচ্ছে এই সময়ের  চরমপত্র। অভিনব-সৃজনশীল সব প্রতিবাদ কর্মসূচি, শ্লোগান আমাদের বুকে সেই ৭১-এর দামামাই বাজিয়ে চলেছে। তাহলে আমরা কি সত্যিই একটা সমাজবিপ্লবের দিকেই এগিয়ে যেতে পারি? ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মতো?

বিশ্বাস করতে খুবই ইচ্ছা হয়, আমরা ৭১ এর ১৪ ডিসেম্বর যে সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারটা হারিয়েছিলাম, সেটা এই শাহবাগ চত্বরের গণজাগরণ থেকে আমরা উদ্ধার করতে পারব। নতুন প্রজন্মের এই অভূতপূর্ব-প্রতিবাদী চেতনাই হয়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ/সোনার বাংলা গড়ার ভিত্তি। ধুলিস্যাত্ হবে আমাদের গোলামী মনোবৃত্তি। শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে যেমনটা বলেছেন, ‘(তোমরা) বাংলাদেশকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দেশে তৈরি করবে। নোবেল প্রাইজ আনবে।’ তেমনটা করতে গেলে কিন্তু আমাদেরকে অনেক গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।  আমাদেরকে ভাবতে হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন হবে, রাজনীতি কেমন হবে, সমাজ-সংস্কৃতির আদল কিভাবে দাঁড়াবে ইত্যাদিপ্রভৃতি। আমরা কি এগুলো চিন্তা করার জন্য রাজি থাকব? নাকি সবকিছু সরকারের/সকল প্রকার রাজনীতিবিদদের/পুলিশ-র্যাব গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তুলে দেব?

কথাগুলো বলাটা জরুরি মনে করেছি, কারণ রাজনীতিবিদদের উপর আমার আস্থা একেবারেই নাই। তারা কখনোই সেটা অর্জন করতে পারে নাই। কি আওয়ামী লিগ, কি বিএনপি, কি প্রগতিশীল বামপন্থী… কেউ না। জামায়াত-শিবিরের কথা বলার তো কোন অবকাশই থাকে না। তারা যে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে একসময় মন্ত্রী হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, এই গ্লানি আমাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। আফসোস করি কিছু করতে না পারার জন্য। কিন্তু এবার গ্লানিমোচনের অন্তিম সময় এসে গেছে। তাই সবার আগে রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই।

কিন্তু ‘তারপর যা হয় দেখা যাবে’/‘এইটা আগে হোক, তারপর অন্য আলাপ’— এইটা বলতেও আমি রাজি না। কারণ আমার মনে হয় বাংলাদেশের আমজনতার জন্য একটা চমত্কার সুযোগ এসেছে নিজেদেরকে রাজনীতিবিদদের অবাধ স্বেচ্ছাচারিতার শেকল থেকে মুক্ত করার। এই সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেলে অনেককেই হয়তো হতাশাগ্রস্থ জীবনে নিমজ্জিত হতে হবে। চোখে থাকবে বেহাত-বিপ্লবের হাহাকার। ঘরপোড়া গরু বলেই হয়তো আরও বেশি আসে এই নেতিবাচক চিন্তাগুলো। ঠিক না হলে বলে দেবেন। মেনে নিতে কোন আপত্তি নাই।

স্বাধীন বাংলাদেশে এই ধরণের জনজাগরণ আমরা প্রথম দেখেছিলাম ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের সময়। নুর হোসেনদের রক্ত দিয়ে আমরা পেয়েছিলাম গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা। স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের কবল থেকে মুক্ত হয়ে অর্জন করেছিলাম অনেক নাগরিক অধিকার। কিন্তু তারপর ২২ বছর ধরে আমরা যে গণতন্ত্রটা পেয়েছি সেটা জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য পরিচালিত শাসনব্যবস্থা ছিল না। দুই দফায় আওয়ামী লিগ, দুই দফায় বিএনপি যেভাবে আমাদের দেশ পরিচালনা করেছে-করছে সেটাকে একমাত্র সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র বলেই আখ্যায়িত করা যায়। ভালো কোন পরিবর্তনের আশায় আন্দোলন করে যে কেমন হতাশ হতে হয়, তার আরও টাটকা উদাহরণ আমাদের সামনে আছে।

২০০৭ সালের আগস্টে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিপীড়ণ করে-জেলজুলুম দিয়ে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা গেছে তরুণদের জন্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য। পরবর্তীতে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকার যে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল, তার পেছনে মনে হয় ২০০৭ এর আগস্ট বিক্ষোভের একটা বড় ভূমিকা আছে। আচ্ছা। তারপর ২০০৯ সালে নতুন সরকার গঠন করার পর এখন পর্যন্ত আওয়ামী লিগ যেভাবে দেশ পরিচালনা করেছে, তাতে কী তৃপ্তিদায়ক কোনো ব্যাপার আছে? উল্টো সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে ব্যাপক আকারের দুর্নীতি, দলীয়করণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির চাপে পিষ্ট হয়ে আমাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে।

ফলে এইবার যখন শাহবাগ চত্বরকে ঘিরে জনমানুষ আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হয়েছে তখন স্বপ্ন দেখার অবকাশ তৈরি হয় যে, আবারও যেন আমাদেরকে অসাধু রাজনীতিবিদদের খপ্পড়ে না পড়তে হয়। দেশ কিভাবে চলবে না চলবে সেখানে যেন আমাদেরও কথা বলার জায়গা থাকে। নায্য পাওনা-দাবির কথা যেন আমরা বলতে পারি। সেগুলো বলতে গিয়ে যেন আমাদেরকে নিপীড়ণের মুখে না পড়তে হয়। সেটা আমরা কিভাবে করব, দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের শরিকানা কিভাবে থাকবে— এই প্রশ্নগুলো তুলতে শুরু করাটা আমার কাছে জরুরি মনে হয়েছে। আমরা রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও কতোটা সক্রিয় হতে পারি, বা আদৌ হবো কি না— এগুলোর উপরেই হয়তো নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যত্। সোনার বাংলার ভবিষ্যত্। শুভ বসন্ত।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মসজিদটি কী বাংলাদেশে?

ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার শুরু হয়েছিল ১২শ শতকে। কিন্তু নতুন একটি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিস্কারের ফলে ইতিহাসটা নতুন করেই লিখতে হতে পারে। সম্প্রতি শৌখিন এক ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ রংপুরের রামজাপুর নামক গ্রামে পেয়েছেন এমন এক মসজিদের ধ্বংসাবশেষ যেটা সপ্তম শতকে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সত্যতা প্রমাণিত হলে এটিই হয়তো হবে দক্ষিণ এশিয়ায় নির্মিত প্রথম মসজিদের নির্দশন। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা যাবে যে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবদ্দশাতেই বা তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল ইসলাম ধর্ম । কিন্তু এ ধরণের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অবহেলায় থেকে যাচ্ছে দৃষ্টিসীমার বাইরে। কখনও কখনও অর্থের লোভে দেশীয় অনেক মুল্যবান প্রত্নসম্পদ বর্হিবিশ্বে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন থেকে।

রামজাপুরের গ্রামটিতে নতুন একটি মসজিদ বানাতে গিয়েই গ্রামবাসীরা খুঁজে পান ৭ম শতকের এই মসজিদটি। খোঁড়াখুড়ির পরে সেখান থেকে পাওয়া যায় অনেক প্রাচীন ধনসম্পদ ও ইসলাম সংশ্লিষ্ট নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন। কুরানের বাণী সম্বলিত একটি পাথরও পাওয়া যায় এখান থেকে। শৌখিন বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ টিম স্টিল এই নতুন আবিস্কারটিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যদি এইটা প্রমাণ করতে পারি, তাহলে হয়তো এটাই হবে দক্ষিণ এশিয়ায় নির্মিত প্রথম মসজিদ। শোনা যায় যে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনকালে ভারতের কেরালা ও চীনে মসজিদ নির্মান করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর কোন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। আর আমরা এখানে একটা মসজিদ খুঁজে পেয়েছি, সেটার কথা কেউ দাবি করেনি, কিন্তু এটা সত্যিকারের একটা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। আর এটা নির্মান করা হয়েছিল ৭ম শতকে। মহানবীর জীবদ্দশার কাছাকাছি সময়ে।’ এই সব গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিয়ে গেছে বলে জানায় এলাকাবাসী। রমজাপুরের বয়োবৃদ্ধ এক ব্যক্তি বলেন, ‘এখানে যত কিছু পাওয়া গিয়েছিল, সবই কতৃপক্ষ নিয়ে গেছে। আমরা এগুলোর কথা আর পরে কখনও শুনতে পাইনি।’ স্থানীয় একটি জাদুঘরে এইসব নিদর্শনের খোঁজ করতে গেলে সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি আল জাজিরার প্রতিনিধিকে।

ইন্টারনেটে একটু অনুসন্ধানের পরে অনুমান করা যায় যে, কেন কর্তৃপক্ষ এইসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে কোন আলাপ করতে চায় না। এইধরণের মূল্যবান নিদর্শন কেনাবেচা করা হয় ইন্টারনেটে। এমন বেশ কিছু ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে যে, মিউজিয়ামের অনেক প্রত্নসম্পদ, যেগুলো ইন্টারনেটে বিক্রি করা হয়েছে তাদের প্রাপ্তিস্থান বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি আল জাজিরার প্রতিনিধি।

ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ টিম স্টিল বিশ্বাস করেন যে, রংপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম রমজাপুরের এই মসজিদে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ। এই ধরণের প্রত্নসম্পদ খুঁজে বের করা ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারকে ১২ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক। এখানকার কাদামাটি প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁড়াখুঁড়ির জন্যও আদর্শ স্থান। কিন্তু স্থানীয় গ্রামবাসীর কোনই আস্থা নেই কর্তৃপক্ষের উপরে। কেউ বিশ্বাসও করে না যে, সরকার এই স্থানটার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝে কোন কাজ করবে। তারপরও তাঁরা সযত্নে রক্ষা করে যাচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক এই স্থানটিকে। কারণ তাঁদের কাছে, এটা খুবই পবিত্র একটা স্থান।
মূল রিপোর্টটি দেখতে ক্লিক করুন

স্বপ্নের পিছু ছাড়া যাবে না: শচীন

বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শততম শতকটির দেখা পেয়েছেন শচীন টেন্ডুলকার। আজ এশিয়া কাপের চতুর্থ ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষেই ক্রিকেট বিশ্বকে নতুন এই মাইলফলকটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান।

এই একটি সেঞ্চুরির জন্য দীর্ঘ এক বছরের প্রতীক্ষা যে পাহাড় সমান চাপ তৈরি করেছিল, সেটা অস্বীকার করেননি শচীন। ক্যারিয়ারের শততম শতকটি পূর্ণ করার পর যেন ৫০ কেজি ওজনের ভার কমে গেছে বলে সাংবাদিকদের জানান ভারতের এই ব্যাটিং কিংবদন্তী। অনন্য এই কীর্তিটি করে শচীন দেখিয়ে দিয়েছেন অসম্ভব বলে আসলে কিছুই নেই। দীর্ঘ ২২ বছরের ক্যারিয়ারে ব্যাটিং রেকর্ডের প্রায় সবকিছুই নিজের দখলে নিয়ে আসার পর তরুণ ক্রিকেটারদের প্রতি শচীনের আহ্বান, ‘স্বপ্নের পিছু কখনো ছাড়া যাবে না।’

গত বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করা ৯৯তম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির পর থেকেই শচীনের ব্যাটের দিকে উত্সুক চোখে তাকিয়ে ছিল গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। শচীনের সেঞ্চুরির আশায় ‘এবারই হবে!’, ‘এই ম্যাচেই তাহলে হচ্ছে!’ ইত্যাদি লিখতে লিখতে ক্রীড়া সাংবাদিকরা ক্লান্তই হয়ে পড়েছিলেন বলা যায়। কিন্তু শচীনের এই শততম সেঞ্চুরিটির দেখা পেতে পার হয়ে গেছে পুরো একটা বছর। চারপাশের এই ধরণের আলোচনা-সমালোচনা যে প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছিল সেটা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন শচীন। তবে তিনি যে শুধু সেঞ্চুরির জন্যই মাঠে নামেন না, বরং দলের সামষ্টিক পারফরমেন্সই যে তাঁর প্রধান বিবেচ্য বিষয়, সেটাও সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দিয়েছেন লিটল মাস্টার। ভারতীয় ইনিংস শেষ হওয়ার পর এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, ‘সত্যি বলতে, একদম এক বছর আগে আমি যখন ৯৯তম সেঞ্চুরিটি করেছিলাম, তখন এ নিয়ে কেউই খুব বেশি কথা বলেনি। কিন্তু এরপর গণমাধ্যমগুলোই প্রথমে এটা শুরু করেছিল। তারপর সব জায়গাতেই যেখানে আমি গিয়েছি, আমাকে এই শততম সেঞ্চুরির কথাই শুনতে হয়েছে। এটা খুবই কঠিন পরিস্থিতি। আমি তো শুধু শততম সেঞ্চুরির জন্যই খেলি না। আমি সবসময়ই দলের সামগ্রিক পারফরমেন্সই প্রধান হিসেবে বিবেচনা করেছি।’

ছোটরা, যারা ব্যাট হাতে হয়ে উঠতে চায় আগামীর শচীন, তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের ব্যাটিং আইকন বলেছেন, ‘খেলাটা উপভোগ করো, আর নিজের স্বপ্নের পিছু করো। স্বপ্ন সত্যি হয়। আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ২২ বছর। স্বপ্নের পিছু করা কখনোই বাদ দিও না।’

নিজের উপর আত্মবিশ্বাস আর নিজের স্বপ্নের পিছনে ছুটতে ছুটতেই ক্রিকেটের রেকর্ড বুকে শচীন এমন এক জায়গা করে নিয়েছেন, যেখানে অন্য কারও পৌঁছানো আর সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। কাজেই এমন উপদেশ এখন শচীনের মুখেই মানায়। আগামীতে এই উপদেশ অনুসরণ করেই কেউ হয়ত তাঁর তৈরি করা মাইলফলকগুলো ছুঁয়ে ফেলতে পারবে।

বাংলাদেশকেই বেছে নিলেন শচীন

বাংলাদেশকেই বেছে নিলেন শচীন

এ মাসের ১২ তারিখে সেঞ্চুরি-খরার এক বছর পূর্ণ করেছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। গত বছরের ১২ মার্চ ক্যারিয়ারের ৯৯তম সেঞ্চুরি পাওয়ার পর থেকেই শচীনের ব্যাটের দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। কিন্তু এক বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন ভারতের এই ব্যাটিং আইকন। আর শততম সেঞ্চুরির অনন্য এই রেকর্ডটি করার জন্য বাংলাদেশকেই বেছে নিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান। এশিয়া কাপের চতুর্থ ম্যাচে ক্রিকেট বিশ্বকে নতুন এই মাইলফলক উপহার দিলেন লিটল মাস্টার।

বাংলাদেশের বিপক্ষে যেন শচীনের সেঞ্চুরিটি না হয়, এটা অবশ্য খুব করেই চেয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘আমি খুব করে চাই, শচীনের শততম সেঞ্চুরিটি হোক, কিন্তু আমাদের বিপক্ষে নয়।’ কিন্তু মুশফিকুরের এই আশা শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো না। দীর্ঘদিন পর শচীনের ব্যাট আবার ঝলসে উঠল ঢাকাতেই। বাংলাদেশের বিপক্ষে। টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে প্রথম থেকেই খুব সাবধানে ব্যাটিং করেছেন টেন্ডুলকার। শততম সেঞ্চুরিটি পূর্ণ করতে তিনি খেলেছেন ১৩৮টি বল। এর মধ্যে ছিল একটি ছয় ও ১০ টি চার।

গত বছর অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শচীনকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল হেলমেট খুলে দুই হাত উপরে তুলে আকাশের দিকে তাকানোর ভঙ্গিমায়। এরপর টেস্ট, ওয়ানডে মিলিয়ে ২৩টি ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন ৩৯ বছর বয়সী এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। খেলেছেন ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। কিন্তু অনেক সম্ভাবনা জাগিয়েও ক্রিকেট প্রেমীদের অপেক্ষাতেই রেখেছিলেন শচীন। অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষেই চিরচেনা ভঙ্গিমায় শতক উদযাপন করতে দেখা গেল কিংবদন্তি এই ব্যাটসম্যানকে। মুশফিকুর রহিমের অনিচ্ছা সত্ত্বেও শচীনের এই সেঞ্চুরিটির সঙ্গেই ইতিহাসের অংশ হিসেবে রেকর্ড বুকে জায়গা করে নিল বাংলাদেশ। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের উপস্থিত দর্শকেরাও হয়তো পরবর্তীকালে স্মৃতি রোমন্থন করে আনন্দ পাবেন যে, ‘শচীনের ইতিহাস গড়া এই দিনটিতে সেখানে আমিও ছিলাম।’

পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ এক দিন ঝুলিয়ে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র

১৯৭১ সালে উপমহাদেশে পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে যে বেশ উত্তেজিত ছিল, তা সর্বজনবিদিত। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ায় ভারতও। তবে সে সময় পরিস্থিতি যে আরও অনেক উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল, তা এতদিন সবার অগোচরেই ছিল।

সদ্যপ্রকাশিত গোপনীয় এক দলিলের সুবাদে জানা গেছে, ওই সময় ভারতকে আক্রমণের মাধ্যমে যুদ্ধে জড়ানোর পরিকল্পনা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও। মার্কিন বিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ ছিল। এ ছাড়া ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তটাও প্রায় এক দিন ঝুলিয়ে রেখেছিল তত্কালীন নিক্সন প্রশাসন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এই ছয় পাতার দলিলটি প্রকাশ করেছে বলে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়।

গোপনীয় এই দলিল অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে পরিষ্কারভাবেই পাকিস্তানকে সমর্থন জুগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় ভারত বা পাকিস্তান—উভয় দেশকে কোনো ধরনের সামরিক অস্ত্র বা সহযোগিতা দেওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানকে অস্ত্রশস্ত্রের জোগান দিয়ে গেছে নিক্সন প্রশাসন। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাতে চেয়েছিল ওয়াশিংটন।

১৯৭১ সালের জুনে মার্কিন অস্ত্রবাহী তিনটি পাকিস্তানি জাহাজ আটক করার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল ভারত। সেটা তারা করতে পারত জাহাজগুলো করাচি পৌঁছানোর আগেই—সেখানে আক্রমণ অথবা বঙ্গোপসাগরে অবরোধ জারি করে। এগুলোর কোনো একটা পদক্ষেপ নিলেই ভারতকে আক্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীকে। সে রকম কিছু করা হলে ভারতকে ‘আগ্রাসী’ আখ্যা দিয়ে সপ্তম নৌবহরকে এই আক্রমণ চালানোর নির্দেশটা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন নিজেই। সদ্যপ্রকাশিত এই দলিলে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাস আঁঁচ করেছিল যে যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে মার্কিন বিমানবাহিনী ভারতের ওপর হামলা চালাতে পারে। আর এ জন্য তাদের কাছে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন আছে।’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে আটকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধার করার জন্য এই সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয়েছিল বলে আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু আসলে এটা ব্যবহার করে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল ওয়াশিংটনের। ১৪ ডিসেম্বর তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল নিয়াজি ঢাকায় আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে জানান। পাল্টা জবাব পেতে ১৯ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাঁকে। ভারতের জ্যেষ্ঠ রাষ্ট্রদূতদের সন্দেহ, হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্যই ওই কালক্ষেপণ করা হয়েছিল।

‘ইংল্যান্ডকে হারাতেই হবে’

মাত্র কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্নে একটা বড়সড় আঘাত দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শুধু আঘাত বললেও কম বলা হয়। দেশের যে কোন চরম ক্রান্তিকালিন পরিস্থিতির সঙ্গেই তুলনা দেওয়া যেতে পারে সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির। মাত্র ৫৮ রানেই অলআউটের লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। সমর্থকরা হতাশা চেপেও রাখতে পারেন নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিম বাসে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে কলঙ্কিত করে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রীড়া অঙ্গনের ভাবমুর্তি। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজই কিনা হয়ে গেল বাংলাদেশের পরম মিত্র! যে কোমার রোচ, সুলেমান বেনদের নির্মম আঘাতে বাংলাদেশ ধুলোয় লুটিয়েছিল, তারা আবারও তেমনভাবেই জ্বলে উঠুক, ক্রিস গেইল, কাইরন পোলার্ডরা ব্যাটে ঝড় তুলুক, এটাই এখন বাংলাদেশ সমর্থকদের একান্ত প্রার্থনা। ইংল্যান্ডকে যে হারাতেই হবে!

‘বি’ গ্রুপ থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার হিসাব-নিকাশটা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ইতিমধ্যেই পা রেখেছে শেষ আটের আঙ্গিনায়। ভারতেরও কোয়ার্টার ফাইনাল প্রায় নিশ্চিতই বলা যায়। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে বাংলাদেশ, উইন্ডিজ আর ইংল্যান্ডের মধ্যে। কাগজে-কলমে তিন দলেরই জোর সম্ভাবনা আছে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার। কিন্তু এত হিসাব-নিকাশের খাতা খুলে বসে থাকতে হবে না যদি আগামীকাল ইংল্যান্ডকে হারের স্বাদ দিতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। উপমহাদেশে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ থেকে একেবারেই শূণ্য-রিক্ত হাতে ফিরে যেতে হবে এ অঞ্চলের এককালীন শাসক ইংল্যান্ডকে। তারচেয়েও বড় কথা, নিশ্চিত হয়ে যাবে বাংলাদেশের পরবর্তী রাউন্ড। এরকম অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষ তো স্যামি, গেইল, ব্রাভোদের পেছনে দাঁড়াবেই।

ঢাকার এক হোটেল কর্মকর্তা এনামুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সমর্থন দেব। ইংল্যান্ডকে হারাতেই হবে।’ শুধু এনামুর রহমানই না, বাংলাদেশের ক্রিকেট পাগল কোটি কোটি মানুষের মুখে এখন একই কথা। ‘ইংল্যান্ডকে হারাতে হবে।’ অতি উত্সাহী দু-একজন তো বলছেন, ‘ইস, খেলাটা যদি বাংলাদেশে হতো, গলা ফাটিয়ে চিত্কার করেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জিতিয়ে দিতাম।’ একেবারে কিন্তু ফেলেও দেওয়া যায় না কথাটা। বাঙ্গালীর গলার জোরের পরিচয় কিন্তু ইংল্যান্ড কয়েকদিন আগে ভালোমতোই পেয়েছিল!

তবে সমর্থকদের ভাবনা যাই হোক, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিশ্চয়ই শুধু অপরের দিকে তাকিয়েই দিন পার করছেন না। ইতিমধ্যেই তাঁরা নিশ্চয়ই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের জন্য জোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২ উইকেটের অসাধারণ জয় দিয়ে নিজেদের সামর্থ্য তো ভালোমতোই প্রমাণ করেছেন সাকিব-তামিমরা। হল্যান্ডের বিপক্ষেও খেলেছেন অনেক পরিণত ক্রিকেট। কাজেই গত বিশ্বকাপের মতো এবারও প্রোটিয়া-বধের স্বপ্ন তো বাংলাদেশ দেখতেই পারে। অধিনায়ক সাকিব আল হাসান বলেছেন, ‘আমরা ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটার দিকে খুব আগ্রহভরে তাকিয়ে থাকব। এটা ঠিক। কিন্তু আমাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই গড়ে নিতে হবে। আসল কথা হলো, দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে হবে।’ বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভরসা আব্দুর রাজ্জাকও গলা মিলিয়েছেন অধিনায়কের সঙ্গে। বলেছেন, ‘দলের সবাই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটার দিকেই তাকিয়ে আছে। কেউই পয়েন্ট তালিকার জটিল হিসাব-নিকাশ নিয়ে ভাবছে না। আমরা পরের ম্যাচটা জিতেই কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে চাই।’

আগামীকালের ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলাটা বাংলাদেশের না হয়েও এক অর্থে বাংলাদেশেরই। গোটা খেলাটার উপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সম্ভাবনা। ১২ দিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল এদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে ক্ষুব্ধ ক্রিকেট পাগল সমর্থকদের হতাশার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখেছে। আতঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু তারপর “We are Sorry” লেখা প্ল্যাকার্ডগুলোও তো দেখেছে। আর এবার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণঢালা শুভকামনা আর ভালোবাসাও নিশ্চয়ই উইন্ডিজ ক্রিকেটাররা দেখছেন। ক্রিস গেইলরা কী এই ভালোবাসার প্রতিদান দেবেন না?

ফিরে আসুক ব্রিস্টলের স্মৃতি

বাঁচা-মরার লড়াইয়ে আজ চট্টগ্রামের জহুরুল হক স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গত ম্যাচের ভয়াবহ লজ্জার দুঃসহ স্মৃতি মুছে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়েই নিশ্চয়ই মাঠে নামবেন সাকিব-তামিমরা। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষও সেই প্রত্যাশা নিয়েই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ সাফল্যের পর এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিটের তকমা আাঁাটা ইংল্যান্ড এখনও পর্যন্ত খুব বেশি সুবিধা করে উঠতে পারে নি। ভারতের সঙ্গে টাই আর আয়ারল্যান্ডের কাছে হারের পর বেশ টলোমলো অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল স্ট্রাউস বাহিনী। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ খেলাটাতে তারা শেষপর্যন্ত হারতে হারতেও পেয়েছে ৬ রানের অবিশ্বাস্য জয়। তার উপর পিটারসেন আর স্টুয়ার্ট ব্রডের ইনজুরিতেও কিছুটা ছন্দপতন হতে পারে ইংল্যান্ড শিবিরে।

চট্টগ্রামের জহুরুল হক স্টেডিয়ামে এই বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচটা প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফ্লাডলাইটের আলোয়। দিবা-রাত্রির এই গুরুত্বপূর্ণ লড়াইটার ক্ষেত্রে টসে জিতে ব্যাট করতে পারাটা একটা বাড়তি সুবিধা আনতে পারে বলে ধারণা করছেন ক্রিকেট বোদ্ধারা। গতকাল দুপুরে অনুশীলনের সময় বেশ কিছুক্ষণ ধরে চট্টগ্রামের হালকা বাদামী এই উইকেটটা পর্যবেক্ষণ করেছেন ইংলিশ অধিনায়ক অ্যান্ডি স্ট্রাউস, বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ, গ্রান্ড ফ্লাওয়াররা। স্পিনাররা এই পিচে নিশ্চিতভাবেই একটা বড় ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করছেন অনেকে। সেক্ষেত্রে পিটারসেনের অফ স্পিনের অভাবটা কিছুটা টের পেতে পারেন স্ট্রাউস। আজ জিততে পারলেই কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটটা অনেকখানিই নিশ্চিত করে ফেলতে পারবে ইংলিশরা।

অন্যদিকে বাংলাদেশের লড়াইটা প্রত্যাবর্তনের। ভয়াবহ দুঃসময়ের ঘোর কাটিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। আজ নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে গত বছর ব্রিস্টলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ রানের সেই অসাধারণ জয়। সেই ম্যাচের জয়ের নায়ক মাশরাফি-বিন-মোর্তজাকে অবশ্য আজ মাঠে পাওয়া যাবে না। তবে এবারের ম্যাচটা কিন্তু হতে যাচ্ছে নিজেদের মাঠে। সাকিবরা পাশে পাবে বাংলাদেশের হাজার হাজার দর্শককে। এটাও নিশ্চয়ই বাড়তি শক্তি জোগাবে বাংলাদেশ শিবিরে।

আব্দুর রাজ্জাক, সাকিব আল হাসানের স্পিন আক্রমণ দিয়ে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের অল্প রানেই বেঁধে ফেলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। কিন্তু টাইগারদের প্রধান দুশ্চিন্তার জায়গা নড়বড়ে ব্যাটিং অর্ডার। প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ২৮৩ রানের বড় স্কোর গড়ে আশা জাগালেও পরের দুইটা ম্যাচে শুধু ভয়াবহ হতাশাই উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। কোচ জিমি সিডন্সও গতকাল অনুশীলনে আলাদাভাবে সময় দিয়েছেন ইমরুল কায়েস, জুনায়েদ সিদ্দিকীদের। আজ মিডলঅর্ডারে আশরাফুলের পরিবর্তে মাঠে নামতে পারেন মাহমুদুল্লাহ। সেক্ষেত্রে বোলার মাহমুদুল্লাহর থেকে ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহর উপরই প্রত্যাশাটা বেশি থাকবে বাংলাদেশ সমর্থকদের।

গত বছর ব্রিস্টলে ইংল্যান্ডকে হারিয়েই টেস্ট খেলুড়ে সবগুলো দেশকে পরাজয়ের স্বাদ দেওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল টাইগাররা। আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের অসময়ে আবারও সেই ব্রিস্টলের মধুর স্মৃতিটাই ফিরে আসুক— এই আশাতেই প্রহর গুনছে গোটা বাংলাদেশ।