Posts Tagged ‘ নাৎসি পার্টি ’

ইউরোপে এখনো ক্ষমা নেই নাৎসি প্রতীকের!

দলের পক্ষে করা জয়সূচক গোলটি উদযাপন করতে গিয়ে যে এতটা সর্বনাশ হয়ে যাবে সেটা হয়তো কল্পনাও করেননি সদ্য ক্যারিয়ার শুরু করা গিওর্গিস কাতাদিস। কিন্তু গোল উদযাপনের সময় গ্রীক এই মিডফিল্ডার এমন এক ভঙ্গি করেছিলেন যেটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, ইউরোপের যুদ্ধকালীন নৃশংসতা-নির্মমতার রক্তাক্ত অধ্যায়ের দুঃখগাথা। জার্মানির নাৎসি পার্টির সেই সেলুটের ভঙ্গিটা যে এখনো পর্যন্ত ইউরোপ কতটা ঘৃণা করে সেটা খানিকটা হলেও টের পাওয়া যায় ২০ বছর বয়সী কাতাদিসের প্রতি শাস্তি আরোপের মাত্রা দেখে। নাৎসি সেলুটের ভঙ্গিতে গোল উদযাপন করার দায়ে আজীবনের জন্য গ্রীস জাতীয় দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে তরুণ এই ফুটবলারকে। কাজটা তিনি জেনেবুঝে করেননি, কোন নাৎসি মতাদর্শে তাঁর বিশ্বাস নেই, এসব বলেও কোন ক্ষমা পাননি গিওর্গিস কাতাদিস।

4578590-3x2-940x627

কয়েকদিন আগেও গ্রীসের অনুর্ধ্ব ১৯ দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন গিওর্গিস কাতাদিস। গত বছর যোগ দিয়েছিলেন বর্তমান ক্লাব এইকে অ্যাথেন্সে। গত শনিবার অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ভেরিয়ার বিপক্ষে তিনিই করেছিলেন দলের পক্ষে জয়সূচক গোলটি। উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে তার দল এইকে অ্যাথেন্স পায় ২-১ গোলের জয়। কিন্তু জয়সূচক গোলটি উদযাপন করতে গিয়েই গোল বাধান এই মিডফিল্ডার।

গ্রীক ফুটবল ফেডারেশনের কাছে এটা একটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তাদের দৃষ্টিতে কাতাদিসের এই নাৎসি সেলুট দেওয়ার আচরণটা ‘খুবই উস্কানিমূলক’ এবং এটা ‘নাৎসিদের নির্মম নৃশংসতার শিকার হওয়া মানুষদের অপমান করার সামিল’।

কাটাডিসের এই গোল উদযাপন করার বিশেষ ভঙ্গিটা ব্যপকভাবে সমালোচিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতেও। তবে এই কাজটা একেবারেই জেনেবুঝে করেননি বলে দাবি করেছেন কাতাদিস। নিজের টুইটার পেজে তিনি লিখেছেন, ‘আমি বর্ণবাদী নই আর যদি জানতাম যে এটা কী অর্থবহন করে তাহলে আমি কোনভাবেই এমনটা করতাম না।’ দর্শকসারিতে বসে থাকা এক সতীর্থর দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তিনি এই নাৎসি সেলুটের ভঙ্গিটা করেছিলেন বলে পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন গ্রীসের এই ফুটবলার। এইকে অ্যাথেন্স ক্লাবের জার্মান কোচ ওয়াল্ড লিনেনও দাঁড়িয়েছেন কাতাদিসের পেছনে। তিনি শিষ্যের সমর্থনে বলেছেন, ‘সে খুবই তরুণ একটা ছেলে যার মধ্যে কোন রাজনৈতিক ধ্যানধারণা নেই। সে হয়তো এই ভঙ্গিটা ইন্টারনেট বা অন্য কোথাও থেকে দেখেছে আর সেটা অনুকরণ করেছে কোন অর্থ না জেনেই।’

গ্রীস ফুটবলের একজন প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন কাতাদিস। ইতিমধ্যেই গ্রীসের অনুর্ধ্ব-১৭, অনুর্ধ্ব-১৯ ও অনুর্ধ্ব-২১ দলে খেলে ফেলেছেন এই মিডফিল্ডার। গত বছর অনুর্ধ্ব-১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রীসকে ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পথেও ভালো অবদান রেখেছিলেন তিনি। খুব দ্রুতই হয়তো মূল জাতীয় দলেও ডাক পেতেন। তবে এই পরিমাণ সম্ভাবনাময় হয়েও কাতাদিসের অপরিসীম ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে ঐ একটি ভঙ্গি করার জন্য। ব্যাপারটা লঘু পাপে গুরু দণ্ড দেওয়ার মতো মনে হলেও এটা স্বীকার করতেই হবে যে, কাতাদিস এই নাৎসি সেলুটের ভঙ্গিটা করেছেন খুবই স্পর্শকাতর সময়ে।

Never Again

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্রীসে বসবাসকারী ইহুদিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নির্বাসিত করার ৭০তম বার্ষিকী ছিল গত ১৫ মার্চ। সেদিন গ্রীসের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর থেসালোনিকির ইহুদি বাসিন্দারা শহরের ফ্রিডম স্কয়্যারে সমবেত হয়েছিলেন দিনটি স্মরণ করতে। শহরের ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা ডেভিড সালটিয়েল বলেছেন, ‘এই দিনটির স্মরণার্থে আয়োজিত অনুষ্ঠান থেসালোনিকি শহরের জন্য একটা সম্মান। কিন্তু কিছু মানুষ ঐ সময়টাকে দেখে স্মৃতিবিধুর ভাবে। তারাই ঐ নাৎসি প্রতীকগুলো ফিরিয়ে আনছে।’ সাম্প্রতিক সময়ে গ্রীসে উত্থান হয়েছে গোল্ডেন ডন নামের একটি উগ্র ডানপন্থী পার্টির। যাদের মধ্যে আছে নিও-নাৎসি মূল। আর গত বছরের জুনে দেশের চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে তারা প্রথমবারের মতো দেশের পার্লামেন্টেও ঢুকে পড়েছে।

Golden-Dawn3

১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ন্যুরেমবার্গ ট্রাইবুন্যালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার করা হয় নািস পার্টি ও এর সঙ্গে জড়িতদের। ৬৭ বছর পরও ইউরোপ ভুলতে পারেনি হিটলারের নাৎসি পার্টির নৃশংসতা, নির্মমতা। এখনো কোনভাবেই যেন ইউরোপে পুনরায় নাৎসি পার্টির মতাদর্শ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, তা সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখে ইউরোপের দেশগুলো। এমনকি মাত্র একটিবার ঐ নাৎসি সেলুটের ভঙ্গি করার জন্য ২০ বছর বয়সী সম্ভাবনাময় তরুণ ফুটবলারকে আজীবন নিষিদ্ধ করে দিতেও কুণ্ঠা করে না প্রচুর সমস্যায় জর্জরিত, অর্থনৈতিকভাবে চরম বিপন্ন দেশ গ্রীস।

কী হবে তাহলে গিওর্গিস কাতাদিসের সম্ভাবনাময় ফুটবল ক্যারিয়ারটার? ক্ষণিকের ভুলটাই কী পুরো জীবনের নির্ধারক বনে যাবে? ক্লাব ফুটবলের অঙ্গনে কাতাদিসের ভবিষ্যত্টা হয়তো আগামী সপ্তাহে জানা যাবে। নিজের আচরণের পক্ষে যুক্তি দেখানোর জন্য পরবর্তী সপ্তাহে একটি সভা আয়োজন করতে যাচ্ছে এইকে অ্যাথেন্স। কিন্তু তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারটা? গ্রীস ফুটবল ফেডারেশন কি বন্ধ করা দরজাটা আবার খুলে দেওয়ার মতো উদারতা দেখাবে? নাকি নিজের ডানহাতটার দিকে তাকিয়ে সারাজীবন আক্ষেপই করতে হবে কাতাদিসকে?— বিবিসি অনলাইন ও ডেইলি মেইল