Posts Tagged ‘ ছয় বলে ছয় ছক্কা ’

গিবসের ‘ছয়’ ছক্কা

২০০৭ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছিল বেশ কয়েকটি নতুন দেশ। স্কটল্যান্ড, বারমুডা, আয়ারল্যান্ড। একেবারেই নবাগত এই দলগুলোকে বিশ্বকাপের আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য আইসিসির সমালোচনাও করেছিলেন কেউ কেউ। অনেকেই মত দিয়েছিলেন যে, এতে বিশ্বকাপে মতো একটা বড় আসরের চরিত্র নষ্ট হবে। অনেক ম্যাচই অগুরুত্বপূর্ণ-একতরফা রুপ ধারণ করবে। টুর্নামেন্ট কিছুদিন গড়াতেই সমালোচকরা তাঁদের কথার পিঠে মোক্ষম যুক্তিও পেয়ে গেলেন।

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচেই স্কটল্যান্ড ২০৩ রানে হেরে গেল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। পরের দিনই শ্রীলঙ্কা, বারমুডাকে হারাল আরো বড় ব্যবধানে। ২৪৩ রানে। আর এই ধরণের ম্যাচগুলো দেখার পর পরেরদিন অনেকেই আর আগ্রহ বোধ করেন নি হল্যান্ড-দক্ষিন আফ্রিকা মধ্যকার বিশ্বকাপের সপ্তম ম্যাচটির প্রতি। তবে যারা ‘একতরফা ম্যাচ খুব বিরক্তিকর বা দেখতে ভালো লাগে না’ জাতীয় মন্তব্য করে এই খেলাটা দেখতে বসেন নি, তারা পরে খুব ভালোমতোই টের পেয়েছিলেন যে, সব একতরফা ম্যাচই বিরক্তিকর হয় না। কিছু কিছু সময় একতরফা ম্যাচগুলো থেকেও পাওয়া যায় প্রচণ্ড উত্তেজনার উত্তাপ।

১৬ মার্চ এরকমই একটা ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল হল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচ শুরুর আগেই শুরু হয়েছিল বৃষ্টির উত্পাত। একে তো আগে থেকেই একতরফা ম্যাচ ভেবে অনেকেই খুব বেশি আগ্রহ দেখান নি। তার উপর খেলার শুরুতেই এ ধরণের প্রতিবন্ধকতার ফলে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন ম্যাচটা থেকে। কেউ তখন ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেন নি যে, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ইতিহাস গড়া এক খেলা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন তারা। সেদিন দক্ষিণ আফ্রিকান ইনিংসের ২৯তম ওভারে রচিত হয়েছিল এক অনন্য রেকর্ড। একদিনের ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো ছয় বলে ছয় ছক্কা মারার বিরল কীর্তি গড়েছিলেন হারশেল গিবস।

বৃষ্টির কারণে খেলার দৈর্ঘ্য কমিয়ে আনা হয়েছেল ৪০ ওভারে। ভেজা উইকেটের ফায়দা তুলতে টসে জিতে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নেদারল্যান্ড অধিনায়ক লুক ভন ট্রস্ট। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে স্কোরবোর্ডে কোন রান যোগ না হতেই এ বি ডি ভিলিয়ার্স ধরলেন সাজঘরের রাস্তা। আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল নেদারল্যান্ড শিবিরে। তখনও কেউ অনুমানই করতে পারেন নি যে, এই ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্তটা আসলে কী সর্বনাশটা ডেকে এনেছে নেদারল্যান্ড বোলারদের ভাগ্যে।

দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ১৯ ওভারে ১১৪ রান তুলেছিলেন গ্রায়েম স্মিথ ও জ্যাক ক্যালিস। স্মিথ ৫৯ বলে ৬৭ রানের ইনিংস খেলে ফিরে যাওয়ার পর ইতিহাস গড়া ইনিংস খেলতে উইকেটে এসে দাঁড়ালেন হারশেল গিবস। ম্যাচ শুরুর আগের বৃষ্টির মতো তিনিও ব্যাট হাতে ঝড়াতে শুরু করলেন বাউন্ডারির বৃষ্টি। নেদারল্যান্ড বোলারদের রীতিমতো নাভিশ্বাস তুলে দিলেন তাঁর স্বভাবসুলভ মারকুটে ব্যাটিং দিয়ে।

ইতিহাস গড়া ২৯ তম ওভারটাতে বল করতে আসলেন লেগস্পিনার ডান ভন বাঙ্গ। প্রথম বলটায় উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে লঙ অন দিয়ে উড়িয়ে মারলেন গিবস। ছয়। দ্বিতীয় বলটায় গিবস আবারও ব্যাট চালালেন একই ভঙ্গিতে। এবার বলটা সীমানার বাইরে পড়ল লঙ অফ দিয়ে। তৃতীয় বলে আবারও ঐ লঙ অফ দিয়েই বল সীমানার বাইরে পাঠিয়ে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন গিবস। এই ৫০ রান এসেছিল মাত্র ৩৬ বলে। এরপর কিছুক্ষণ যেন জিরিয়ে নিলেন ডানহাতি এই মারকুটে ব্যাটসম্যান। যেন প্রস্তুত হয়ে নিলেন পরবর্তী তিনটি বলের জন্য। চতুর্থ বল সীমানার বাইরে পাঠালেন ডিপ মিডউইকেট দিয়ে। পঞ্চম বলটা বুলেট গতিতে আছড়ে ফেললেন লঙ অফের উপর দিয়ে। আবারও প্রসারিত হলো আম্পায়ার মার্ক বেনসনের হাত। ছয়! ষষ্ঠ বলটা আবারও ডিপ মিডউইকেট দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠিয়েই গড়ে ফেললেন ইতিহাস। পা রাখলেন একদিনের ক্রিকেটের এমন এক অঞ্চলে যেখানে এতদিন অন্য কেউ যেতে পারেন নি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তো বটেই, সর্বোপরি একদিনের ক্রিকেটেও স্মরণীয় হয়ে থাকল ভন বাঙ্গের সেই ওভারটা। ৪ ওভার বল করে সেদিন তিনি দিয়েছিলেন ৫৬ রান। তবে মজার ব্যাপার হলো বিশাল এই ‘কীর্তি’ গড়ার পরও তিনিই কিন্তু সবচেয়ে খরুচে বোলার ছিলেন না। চার ওভার বল করে সর্বোচ্চ ৫৯ রান দিয়েছিলেন খোদ নেদারল্যান্ড অধিনায়ক লুক ভন ট্রস্ট।

সাতটি ছয় ও চারটি চার দিয়ে সাজানো ৭২ রানের ইনিংসটি খেলতে গিবসের লেগেছিল মাত্র ৪০ বল। আর নির্ধারিত ৪০ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোরবোর্ডে যোগ হয়েছিল ৩৫৩ রান। ম্যাচটি নেদারল্যান্ড হেরেছিল ২২১ রানে।