Posts Tagged ‘ গ্রায়েম স্মিথ ’

আমরা এই আকালেও স্বপ্ন দেখি

আবারও আমার সেই বন্ধুর একটা উক্তি দিয়েই শুরু করি। ৫১ রানে ছয় উইকেট পড়ে যাওয়ার পর সে বলল, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যদি দুই দিন মাঠে ঘাম ঝড়িয়ে প্রাকটিস না করে, শুধু ঘরে বসে গত মাচটা জেতার পর মানুষের বাধভাঙ্গা উচ্ছাসের ভিডিওগুলো দেখত, তাহলেও তারা অন্তত ১৫০টা রান করত’।

তখনো পর্যন্ত চরম আশাবাদীরা বুক বেঁধেছিলেন ১৫০ না হোক, অন্তত তিন অঙ্কের কোটাটা ‘টাইগার’রা পার করতে পারবে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নদীটা পুরোপুরি পার না হতে পারলেও নাঈম, আশরাফুল, রাজ্জাকরা হয়তো তরীটা তীরের কিছুটা কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারবেন। আর তখনো তো উইকেটে আশরাফুল ছিলেন। তিনি যে আমাদের অনেক ভরসার প্রতীক! কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। তরীটা ডুবল। খুব বিশ্রীভাবেই ডুবল। আমাদের আশা-ভরসা, মান-সম্মান, আস্থা, গর্ব-অহঙ্কার সবকিছুরই সলীল সমাধি ঘটল ‘টাইগার’দের উইকেট বৃষ্টির তোড়ে। আর ধীরে ধীরে ঘনিয়ে এল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারতম দিন। ক্ষুব্ধ-বাকহীন বাংলাদেশের সমর্থকরা দিশেহারা হয়ে গেল। হতাশা প্রকাশের ভাষা না পেয়ে তারা কিছুটা বাড়াবাড়িই করে ফেলল। কয়েক জায়গায় ভাঙচুর-পোস্টার ছেড়া এগুলো না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু উইন্ডিজ ক্রিকেট বাসে ইট পাটকেল ছোড়াটা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য না। আমরা নিশ্চয়ই চাই না, আমাদের ক্রিকেট অঙ্গনটাও পাকিস্তানের মতো হয়ে যাক।

তবে এটাকে শুধুই উশৃঙ্খল কিছু মানুষের হঠকারি কার্যকলাপ বলে এককথায় নিন্দা প্রকাশ করে উড়িয়ে দেওয়াটাও বোধহয় উচিত হবে না। এই ক্ষোভের উত্স কী? এই প্রশ্নটাও সম্ভবত তোলার সময় এসেছে।

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা জয়ের পেছনে সাকিব-শফিউলদের ক্রীড়ানৈপুনের সাথে সাথে মিরপুরের গ্যালারিভর্তি দশকেরও যে একটা বিশাল ভূমিকা ছিল, এটা নিশ্চয়ই সবাই সমর্থন করবেন। এমনকি অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও তো ম্যাচ পরবতী সংবাদ সম্মেলনে সে কথা স্বীকার করেছিলেন। ও’ব্রায়েনদের একেকটা উইকেট পতনের পর যেন সাকিবদের পক্ষ থেকে সত্যিই হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মানুষ। সে ম্যাচেও কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং শেষে হার নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু তবুও শেষ পর্যন্ত তারা সাহস ধরে রেখেছিলেন। চিত্কার করে, প্রার্থনা করে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের।

কিন্তু গতকাল তো মানুষ ‘টাইগার’দের পেছনে দাড়ানোর কোন সময়ই পেল না। চিত্কার করে সাহস জোগানোর সুযোগই পেল না। সূয অস্ত না যেতেই শেষ হয়ে গেল দিবা-রাত্রির এই অতি গুরুত্বপূণ লড়াই। যে মানুষগুলো রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকিট জোগাড় করেছিল, বা অনেক আয়োজন করে খেলা দেখার পরিকল্পনা করেছিল, খেলা শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা যে কী পরিমাণ হতাশ হয়েছিলেন, সেই ভাষা বোঝার ক্ষমতা কী আমাদের আছে? বাংলাদেশের ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের বোধহয় সেই ভাষাটা অনুবাদ করা দরকার। প্রতি ম্যাচে মাঠে নামার আগে বোধহয় তাদের সবার আগে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কথা ভাবা দরকার। যাদের হাসি-কান্না একদম ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে সাকিব-তামিমদের ব্যাট-বলের সঙ্গে। যারা তামিমদের একটা চারের মার দেখে অবর্ণনীয় খুশিতে ভেঙ্গে পরে। আবার উইকেট পতনের সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ বাড়িয়ে ফেলে। আমাদের ‘টাইগার’রা কিন্তু সত্যিই আগামী ম্যাচগুলোর আগে এই প্রতিক্রিয়াগুলোর ভিডিও দেখে নিতে পারেন। কাজে লাগলেও লাগতে পারে।

কারণ এখনো তো আমাদের বিশ্বকাপটা শেষ হয়ে যায় নি। অনেকখানিই ফিকে হয়ে গেছে, এটা ঠিক। কিন্তু এখনো গ্রুপ পর্বের আরো তিনটা খেলা বাকিই থেকে গেছে। সাকিবরা নিশ্চয়ই এই লজ্জার তীব্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। এটাই প্রার্থনা। আর আশার কথা হলো এত ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তেও বাঙ্গালী তার রসবোধ হারায় নি। বাংলাদেশ মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর শাহবাগ মোড়ে দুইটা মেয়েকে খুব সেজেগুজে রিকশায় যেতে দেখে একজন বলে উঠল, ‘সামনে য্যায়েন না রে আপা, ‘টাইগার’রা খারায় আছে’! ঐ বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বিচারেও কী এটাকে ইভ টিজিং বলবেন? তারচে বরং আপাতত ঐ আপাদের জায়গায় আমরা স্ট্রাউস, গ্রায়েম স্মিথ বা পিটার বোরেনদের নাম বসিয়ে দিতে পারি। লজ্জায় নীল, শোকে পাথর ‘টাইগার’রা এবার ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠবে, এই আশা তো আমাদের থাকতেই পারে। আর সর্বনিম্ন রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার এত লজ্জা, এত কলঙ্ক, হতাশার পরও তো দেখলাম একজন বলছেন, ’সাকিব তোমরা এগিয়ে যাও। হারলেও তোমাদের সাথে আছি. জিতলেও সাথে আছি।’ সাকিব-তামিমরা শুনতে পাচ্ছেন তো?

গিবসের ‘ছয়’ ছক্কা

২০০৭ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছিল বেশ কয়েকটি নতুন দেশ। স্কটল্যান্ড, বারমুডা, আয়ারল্যান্ড। একেবারেই নবাগত এই দলগুলোকে বিশ্বকাপের আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য আইসিসির সমালোচনাও করেছিলেন কেউ কেউ। অনেকেই মত দিয়েছিলেন যে, এতে বিশ্বকাপে মতো একটা বড় আসরের চরিত্র নষ্ট হবে। অনেক ম্যাচই অগুরুত্বপূর্ণ-একতরফা রুপ ধারণ করবে। টুর্নামেন্ট কিছুদিন গড়াতেই সমালোচকরা তাঁদের কথার পিঠে মোক্ষম যুক্তিও পেয়ে গেলেন।

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচেই স্কটল্যান্ড ২০৩ রানে হেরে গেল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। পরের দিনই শ্রীলঙ্কা, বারমুডাকে হারাল আরো বড় ব্যবধানে। ২৪৩ রানে। আর এই ধরণের ম্যাচগুলো দেখার পর পরেরদিন অনেকেই আর আগ্রহ বোধ করেন নি হল্যান্ড-দক্ষিন আফ্রিকা মধ্যকার বিশ্বকাপের সপ্তম ম্যাচটির প্রতি। তবে যারা ‘একতরফা ম্যাচ খুব বিরক্তিকর বা দেখতে ভালো লাগে না’ জাতীয় মন্তব্য করে এই খেলাটা দেখতে বসেন নি, তারা পরে খুব ভালোমতোই টের পেয়েছিলেন যে, সব একতরফা ম্যাচই বিরক্তিকর হয় না। কিছু কিছু সময় একতরফা ম্যাচগুলো থেকেও পাওয়া যায় প্রচণ্ড উত্তেজনার উত্তাপ।

১৬ মার্চ এরকমই একটা ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল হল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচ শুরুর আগেই শুরু হয়েছিল বৃষ্টির উত্পাত। একে তো আগে থেকেই একতরফা ম্যাচ ভেবে অনেকেই খুব বেশি আগ্রহ দেখান নি। তার উপর খেলার শুরুতেই এ ধরণের প্রতিবন্ধকতার ফলে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন ম্যাচটা থেকে। কেউ তখন ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেন নি যে, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ইতিহাস গড়া এক খেলা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন তারা। সেদিন দক্ষিণ আফ্রিকান ইনিংসের ২৯তম ওভারে রচিত হয়েছিল এক অনন্য রেকর্ড। একদিনের ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো ছয় বলে ছয় ছক্কা মারার বিরল কীর্তি গড়েছিলেন হারশেল গিবস।

বৃষ্টির কারণে খেলার দৈর্ঘ্য কমিয়ে আনা হয়েছেল ৪০ ওভারে। ভেজা উইকেটের ফায়দা তুলতে টসে জিতে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নেদারল্যান্ড অধিনায়ক লুক ভন ট্রস্ট। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে স্কোরবোর্ডে কোন রান যোগ না হতেই এ বি ডি ভিলিয়ার্স ধরলেন সাজঘরের রাস্তা। আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল নেদারল্যান্ড শিবিরে। তখনও কেউ অনুমানই করতে পারেন নি যে, এই ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্তটা আসলে কী সর্বনাশটা ডেকে এনেছে নেদারল্যান্ড বোলারদের ভাগ্যে।

দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ১৯ ওভারে ১১৪ রান তুলেছিলেন গ্রায়েম স্মিথ ও জ্যাক ক্যালিস। স্মিথ ৫৯ বলে ৬৭ রানের ইনিংস খেলে ফিরে যাওয়ার পর ইতিহাস গড়া ইনিংস খেলতে উইকেটে এসে দাঁড়ালেন হারশেল গিবস। ম্যাচ শুরুর আগের বৃষ্টির মতো তিনিও ব্যাট হাতে ঝড়াতে শুরু করলেন বাউন্ডারির বৃষ্টি। নেদারল্যান্ড বোলারদের রীতিমতো নাভিশ্বাস তুলে দিলেন তাঁর স্বভাবসুলভ মারকুটে ব্যাটিং দিয়ে।

ইতিহাস গড়া ২৯ তম ওভারটাতে বল করতে আসলেন লেগস্পিনার ডান ভন বাঙ্গ। প্রথম বলটায় উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে লঙ অন দিয়ে উড়িয়ে মারলেন গিবস। ছয়। দ্বিতীয় বলটায় গিবস আবারও ব্যাট চালালেন একই ভঙ্গিতে। এবার বলটা সীমানার বাইরে পড়ল লঙ অফ দিয়ে। তৃতীয় বলে আবারও ঐ লঙ অফ দিয়েই বল সীমানার বাইরে পাঠিয়ে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন গিবস। এই ৫০ রান এসেছিল মাত্র ৩৬ বলে। এরপর কিছুক্ষণ যেন জিরিয়ে নিলেন ডানহাতি এই মারকুটে ব্যাটসম্যান। যেন প্রস্তুত হয়ে নিলেন পরবর্তী তিনটি বলের জন্য। চতুর্থ বল সীমানার বাইরে পাঠালেন ডিপ মিডউইকেট দিয়ে। পঞ্চম বলটা বুলেট গতিতে আছড়ে ফেললেন লঙ অফের উপর দিয়ে। আবারও প্রসারিত হলো আম্পায়ার মার্ক বেনসনের হাত। ছয়! ষষ্ঠ বলটা আবারও ডিপ মিডউইকেট দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠিয়েই গড়ে ফেললেন ইতিহাস। পা রাখলেন একদিনের ক্রিকেটের এমন এক অঞ্চলে যেখানে এতদিন অন্য কেউ যেতে পারেন নি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তো বটেই, সর্বোপরি একদিনের ক্রিকেটেও স্মরণীয় হয়ে থাকল ভন বাঙ্গের সেই ওভারটা। ৪ ওভার বল করে সেদিন তিনি দিয়েছিলেন ৫৬ রান। তবে মজার ব্যাপার হলো বিশাল এই ‘কীর্তি’ গড়ার পরও তিনিই কিন্তু সবচেয়ে খরুচে বোলার ছিলেন না। চার ওভার বল করে সর্বোচ্চ ৫৯ রান দিয়েছিলেন খোদ নেদারল্যান্ড অধিনায়ক লুক ভন ট্রস্ট।

সাতটি ছয় ও চারটি চার দিয়ে সাজানো ৭২ রানের ইনিংসটি খেলতে গিবসের লেগেছিল মাত্র ৪০ বল। আর নির্ধারিত ৪০ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোরবোর্ডে যোগ হয়েছিল ৩৫৩ রান। ম্যাচটি নেদারল্যান্ড হেরেছিল ২২১ রানে।