Posts Tagged ‘ গাদ্দাফী ’

লুট হচ্ছে লিবিয়ার প্রত্নসম্পদ

গাদ্দাফীর মৃত্যুর পর এখন বিজয়োল্লাসে মেতে আছে লিবিয়ার বিদ্রোহীরা। প্রতিশোধস্পৃহায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গাদ্দাফীর দুর্গ-বাসভবন। কিন্তু এসবের ডামাডোলে খুবই দুঃখজনক কিছু ঘটনাও ঘটে চলেছে নবজাগড়নের লিবিয়ায়। বেনগাজির ন্যাশনাল কমার্শিয়াল ব্যাংকে রক্ষিত অমূল্য সব প্রত্নসম্পদ লুট করে নিচ্ছে সুযোগসন্ধানী লুটেরা গোষ্ঠী। বিপুল পরিমাণ সোনা ও রুপার কয়েন হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন ‘প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের অন্যতম বড় চুরি’ হিসেবে। ‘বেনগাজির সম্পদ’ নামে পরিচিত এই ধনসম্পদের মধ্যে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের আমলের সোনা-রুপার মুদ্রাও আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেনগাজির ন্যাশনাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের কনক্রিটের ছাদ ভেঙ্গে এই দুর্মূল্য প্রত্নসম্পদ লুট করছে লুটেরারা। সোনা-রুপার মুদ্রার বাইরেও এখানে অনেক ভাস্কর্য, ব্রোঞ্জের মূর্তি, অলঙ্কারাদি, হাতির দাঁত চোরদের হস্তগত হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটাকে লিবিয়ার সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের একটা অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন ইতালির প্রত্নতত্ত্ববিদ সেরেনেলা ইসোলি। তিনি বলেছেন, ‘এই প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলো এখনও ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। এগুলোর চুরি যাওয়াটা লিবিয়ার সংস্কৃতির জন্য একটা বিশাল ক্ষতি।’

১৯১৭ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে আর্টেমিসের মন্দির থেকে এই প্রত্নসম্পদগুলো সংগ্রহ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রোমের ইতালিয়ান আফ্রিকা জাদুঘরে প্রদর্শিত হয় এই ‘বেনগাজি সম্পদ’।  এরপর১৯৬১ সালে আবার লিবিয়ার মাটিতে ফিরিয়ে আনা হয় এই অমূল্য প্রত্নসম্পদগুলো। তারপর থেকে এগুলো বেনগাজির ন্যাশনাল কমার্শিয়াল ব্যাংকে সংরক্ষিত ছিল।— ডেইলি মেইল

গাদ্দাফীর ‘অষ্টম আশ্চর্য’

দীর্ঘ ৪২ বছরের শাসনামলে অনেক নিন্দা-সমালোচনা কুড়িয়ে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফী। আরব বসন্তের নবজাগড়নে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর লিবিয়ায় পতন হয়েছে গাদ্দাফী সরকারের। কয়েকদিন আগে বিদ্রোহীদের হাতে নির্মমভাবে হত্যার পর গতকাল সাহারা মরুভূমির কোন এক অজ্ঞাত স্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন এই স্বৈরশাসক। তবে বরাবরই কঠোর শাসরে জন্য পশ্চিমা বিশ্ব ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বদনাম কুড়ালেও লিবিয়ার এইড মরুপ্রান্তরেই অনন্য এক কীর্তি গড়ে গেছেন লৌহমানব গাদ্দাফী। দেশবাসীদের বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সমগ্র লিবিয়াজুড়ে তিনি যে ভূগর্ভস্থ পাইপ নেটওয়ার্ক নির্মান করেছিলেন তা পরিচিতি পেয়েছে ‘বিশাল মনুষ্যনির্মিত নদী’ নামে। বিশ্বের বৃহত্তম এই সেচ প্রকল্পটিকে খোদ গাদ্দাফী বলতেন ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য।’

সির্তে, ত্রিপোলি, বেনগাজিসহ লিবিয়ার অন্যান্য মেরু অঞ্চলে খাবার পানি সরবরাহ ও সেচকার্যের জন্য পুরো দেশটি জুড়ে ২৮৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পাইপ নেটওয়ার্ক নির্মিত হয়েছে এই প্রকল্পটিতে। ইতিহাসে এযাবত্কালের সবচেয়ে বড় এই পাইপ নেটওয়ার্কটিতে আছে ১৩০০-রও বেশি কুয়া। যেগুলোর বেশিরভাগই ৫০০ মিটারেরও বেশি গভীর। এখনও লিবিয়াতে প্রতিদিন ৬৫ হাজার ঘনমিটার বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিচ্ছে গাদ্দাফীর এই ‘অষ্টমাশ্চার্য।’

১৯৫৩ সালে লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে তেল অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিশালায়তনের এক ভূগর্ভস্থ জলাধারের খোঁজ পাওয়া যায়। ১৯৬০ সালের শেষে ৪০ হাজার বছর পুরোনো এই জলাধার থেকে ‘বিশাল মনুষ্যনির্মিত নদী প্রকল্প’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়। তবে বাস্তবে কাজ শুরু হতে হতে অতিক্রান্ত হয় আরও ২৪ বছর। ১৯৮৩ সালে লিবিয়ার কনগ্রেসে এই প্রকল্প প্রস্তাবটি পাস হয়। এক বছর পরে সারির এলাকায় নির্মানকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গাদ্দাফি। কোন প্রকার বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান ছাড়াই, পুরোপুরি গাদ্দাফি সরকারের অর্থায়নে বিশাল এই কর্মযজ্ঞের নকশা প্রণয়ন করে আমেরিকান প্রকৌশলী কোম্পানি ব্রাউন এন্ড রুট ও প্রাইস ব্রাদার্স। বিশালাকৃতির কনক্রিট পাইপগুলো নির্মানের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান রপ্তানি করা হয় ইতালি, স্পেন, জার্মানি, জাপানসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ থেকে। পুরো প্রকল্পটি সফলভাবে শেষ করার জন্য খরচ হয়েছিল ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ। ১৯৯০ সাল থেকে এই প্রকল্পে নিযুক্ত প্রকৌশলীদের কারিগরী প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইউনেসকো।

এ বছর গাদ্দাফী সরকারের পতনকামী বিদ্রোহী জনতার সমর্থনে এগিয়ে আসা ন্যাটোর বোমা হামলায় এই মনুষ্যনির্মিত নদীর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ফলস্বরুপ বিশুদ্ধ খাবার পানির সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে অনেক লিবিয়বাসী।— উইকিপিডিয়া অবলম্বনে