Posts Tagged ‘ কার্লোস পুয়োল ’

রাজনীতিতেও চলছে বার্সা-রিয়াল লড়াই

catalonia human chain 

‘রিয়াল মাদ্রিদ যখন বার্সেলোনার বিপক্ষে খেলে তখন বিশ্ব থেমে যায়।’- এল ক্লাসিকোর জনপ্রিয়তা বর্ণনা করতে গিয়ে ঠিক এই বাক্যটিই ব্যবহার করেছিলেন রিয়ালের সাবেক কোচ হোসে মরিনহো। খুব বেশি বাড়িয়ে হয়তো বলেননি এই পর্তুগিজ কোচ। গত বছরের অক্টোবরে রিয়াল-বার্সা দ্বৈরথে অংশ নিতে স্পেনে ছুটেছিলেন ২৮টি দেশের ৬৮০জন সাংবাদিক। খেলাটি সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ৩০টিরও বেশি দেশে। খেলাটি একযোগে দেখেছিল ৪০ কোটি মানুষ। ফুটবলপ্রেমী, অথচ এল ক্লাসিকোর নাম শোনেননি এমনটা হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনার দ্বৈরথটা শুধু স্পেনেই না, সমগ্র ফুটবল বিশ্বেরই আকর্ষণ।

স্প্যানিশ এই দুইটি শহরের মধ্যে চলমান আরও একটি লড়াই হয়তো অচিরেই কেড়ে নিতে পারে সমগ্র বিশ্বের মনোযোগ। কারণ শুধু ফুটবলেই না, স্পেনের রাজনীতিতেও চলছে বার্সা-মাদ্রিদ লড়াই। সম্প্রতি স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা দাবি করে একটি মানববন্ধন করেছিলেন কাতালোনিয়ার বাসিন্দারা। স্বাধীনতার দাবি হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। স্প্যানিশ সরকারের প্রতি কাতালানদের দাবি, খুব তাড়াতাড়ি একটা গণভোট আয়োজন করতে হবে, যা থেকে নির্ধারিত হবে যে, তাদের একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে তোলার অধিকার আছে কিনা।

catalan1

‘কাতালোনিয়া স্পেন নয়’, ‘আমরা স্বাধীন হতে চাই’ ইত্যাদি ব্যানার লিখে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন এই মানববন্ধনে। লাল-হলুদের এই ঢেউটা অতিক্রম করেছে বার্সেলোনার বিখ্যাত ন্যু ক্যাম্প স্টেডিয়ামের ভেতর দিয়েও। কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনায় উপস্থিত ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী ইস্টার সারামোন। এখানকার অন্য অনেক বাসিন্দাদের মতো সারামোনও মনে করেন যে, কেন্দ্রিয় সরকার কাতালানদের উপর অনায্য আচরণ করছে। ট্যাক্স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, ভাষার অধিকারসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক ইস্যুর ক্ষেত্রে। তিনি বলেছেন, ‘স্বাধীনতার পক্ষে সংখ্যাগরীষ্ঠ মানুষ আছে কিনা, সেটা দেখার জন্য আমরা একটা গণভোট চাই। কিন্তু সমস্যা হলো স্পেন এটা শুনবে না। আমাদের একটাই আশা যে, ইউরোপ আর বাকি বিশ্ব এটার জন্য স্প্যানিশ সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।’

স্বাধীন কাতালোনিয়ার দাবিটা অনেকদিন ধরেই ছিল। সেটা আরও জোরদার করেছে ইউরোপের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। ইউরো অঞ্চলের আর্থিক সংকটের সর্বশেষ শিকারে পরিণত হয়েছে স্পেন। যার ফলে এখন আন্তর্জাতিক সাহায্য চাওয়ার চিন্তাভাবনাও আছে ইউরোপের অন্যতম বড় অর্থনীতির এই দেশটির। নানা ধরনের কৃচ্ছনীতি আরোপের ফলে স্পেনের কেন্দ্রিয় সরকারও হয়ে পড়েছে ব্যপকভাবে অজনপ্রিয়। ট্যাক্স বৃদ্ধি, জনসেবামূলক খাতে বরাদ্দ ঘাটতির বিষয়গুলো মেনে নিতে পারছে না কাতালানরা। সেই সঙ্গে কাতালান ভাষার উপর আধিপত্যশীল আচরণও ক্ষুব্ধ করেছে এই অঞ্চলের মানুষদের। গত বছরের শেষের দিকে স্পেনের প্রতিটা স্কুলে স্প্যানিশ ভাষায় পাঠদানের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার একটি প্রস্তাবও উস্কে দিয়েছে কাতালানদের স্বাধীকার আন্দোলন। সব মিলিয়ে বেশ খারাপ পরিস্থিতিতেই আছে স্পেনের কেন্দ্রিয় সরকার।

কিন্তু স্পেনের সবচেয়ে ধনী ও অন্যতম শিল্পায়িত অঞ্চলটিকে খুব সহজে স্বাধীনতাও দিতে চাইবে না মাদ্রিদের নীতিনির্ধারকরা। অর্থনৈতিক দিকগুলো বাদ দিয়ে শুধু ফুটবল দলটার দিকে তাকালেও স্পষ্ট বোঝা যায় কাতালানরা স্পেনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কাতালোনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে দিলে স্পেনকে দল গঠন করতে হবে কার্লোস পুয়োল, জরডি আলবা, সেস ফেব্রিগাস, জেরার্ড পিকে, জাভি, সার্জিও বুসকেটস, ক্রিশ্চিয়ান টেলোদের ছাড়া। তেমনটা হলে ফুটবল বিশ্বে সর্বজয়ী স্পেনের আধিপত্য কতটা বজায় থাকবে সন্দেহ আছে।

barcelona

যদিও স্বাধীন কাতালোনিয়ার দাবি দিনদিন বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে কাতালোনিয়ার ৭.৫ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ৮১ শতাংশই চায় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। বার্সেলোনা ফুটবল দলও গত ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়েছিল স্বাধীন কাতালোনিয়া ও তার ভাষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণের দাবি, ‘আমাদের স্বাধীন দেশের পরিচয় তৈরির একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আমাদের ভাষা। ঠিক যেমনটা আমাদের ক্লাব। আমরা খুব দৃঢ়ভাবে কাতালান ভাষা চর্চা ও শিক্ষার অধিকার রক্ষা করতে চাই।’

কাতালোনিয়া আর স্পেনের এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে বার্সেলোনা আর রিয়াল মাদ্রিদ। দুইটি শহরই দুই অঞ্চলের রাজধানী। তাই এখন হয়তো সমান্তরালেই চলতে পারে ফুটবলের ধ্রুপদী লড়াই আর রাজনীতির মারপ্যাঁচটা। মাঠের লড়াইয়ে আগামী মাসেই মুখোমুখি হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ¦ী এই দুই ফুটবল ক্লাব। ন্যু ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত হবে এবারের মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকো। সেদিন হয়তো ঘুঁচেও যেতে পারে খেলা আর রাজনীতির সীমানা। স্বাধীনতার দাবি সম্বলিত ব্যানার নিয়েই হয়তো হাজির হয়ে যেতে পারেন বার্সেলোনার সমর্থকেরা।

স্বাধীন কাতালোনিয়ার দাবি বার্সেলোনারও

Barcelona_2419869b‘ক্লাবের চেয়েও বেশি কিছু’ এটাই ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব বার্সেলোনার প্রধান শ্লোগান। সম্প্রতি সেটা বেশ ভালোমতোই প্রমাণ করেছে এই স্প্যানিশ জায়ান্ট। স্পেনে স্বাধীন কাতালোনিয়া রাষ্ট্রের দাবিতে চলমান আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছে তারা। সেই সঙ্গে কাতালান ভাষাভাষী মানুষের উপরে অনায্যভাবে কেন্দ্রিয় ভাষা (স্প্যানিশ) চাপিয়ে দেওয়ারও কড়া সমালোচনা করেছে বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ।

এক সপ্তাহ আগে স্পেনের শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন যে, দেশের সব স্কুলে যেন স্প্যানিশ ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়,  সেই প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কাতালোনিয়ার মানুষেরা। এই সিদ্ধান্তের ফলে কাতালান ভাষার উপর অনায্যভাবে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন চালানো হচ্ছে বলে মনে করেন তাঁরা। বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবও স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের এই ভাষিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। এক বিবৃতিতে ক্লাবটি বলেছে, ‘আমাদের স্বাধীন দেশের (কাতালোনিয়া) পরিচয় তৈরির একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আমাদের ভাষা। ঠিক যেমনটা আমাদের ক্লাব। বিগত ৩৪ বছর ধরে আমাদের স্বাধীন ভাষাচর্চা বাধার মুখে পড়েছে। আমরা খুবই দৃঢ়ভাবে কাতালান ভাষা চর্চা ও শিক্ষার অধিকার রক্ষা করতে চাই।’

বর্তমানে কাতালোনিয়া রাজ্যের স্কুলগুলোতে কাতালান ভাষাতেই পাঠ দান করা হয়। আলাদাভাবে স্প্যানিশ শেখার ব্যবস্থা সেখানে আছে। কিন্তু সেটা প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক না। ইউরোপের ম্যাপে স্বাধীন একটি দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন-বিক্ষোভ করে আসছে কাতালোনিয়া। স্পেনের আর্থিক সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আরও জোরদার হয়েছে কাতালোনিয়ার স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি। এরই মধ্যে নতুন এই ভাষানীতি প্রনয়নের ঘোষণা দিয়েছেন স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী জোসে ইগনাসিও ওয়ের্ট। প্রতিটি স্কুলে স্প্যানিশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার এই প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়ে এসেছেন কাতালোনিয়া রাজ্যের শিক্ষা উপদেষ্টা ইরেনে রিগাউ। টুইটারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বার্সেলোনার অধিনায়ক কার্লোস পুয়োল।

বার্সেলোনার এই রাজনৈতিক পদক্ষেপটি এসেছে স্প্যানিশ ইতিহাসের এক বিশেষ মুহূর্তে। ইউরো অঞ্চলের আর্থিক সংকটের সর্বশেষ শিকারে পরিণত হয়েছে স্পেন। যার ফলে এখন আন্তর্জাতিক সাহায্য চাওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপের অন্যতম বড় অর্থনীতির এই দেশটি। নানা ধরণের কৃচ্ছনীতি আরোপের ফলে স্পেনের কেন্দ্রিয় সরকারও হয়ে পড়েছে ব্যপকভাবে অজনপ্রিয়। আর এই সংকটময় পরিস্থিতি আরও উস্কে দিচ্ছে স্বাধীন কাতালোনিয়া রাষ্ট্রের দাবি। কাতালানরা মনে করে, এই অঞ্চলটি স্পেন থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই বেশি অগ্রগতি করতে পারবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

নভেম্বরের ২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় কাতালোনিয়া রাজ্যের সংসদীয় নির্বাচন। যেখানে ফলাফল নির্বাচনী প্রধান ইস্যু ছিল স্বাধীন কাতালোনিয়ার দাবিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে কিনা। আর বলাই বাহুল্য, নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে গণভোট-পন্থী প্রার্থীরা। কিন্তু এই গণভোট কিভাবে আয়োজন করা যাবে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ স্পেনের সংবিধান অনুযায়ী দেশটির কোন রাজ্য আলাদাভাবে একটি গণভোট আয়োজন করতে পারে না। তবে বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবের এই সাম্প্রতিক বিবৃতি চলমান কাতালোনিয়া রাষ্ট্রের দাবি যে আরও জোরদার করবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

বার্সেলোনা ক্লাবের সঙ্গে স্পেনের কেন্দ্রিয় সরকারের বিরোধটা অবশ্য নতুন কোন ব্যাপার না। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময়ও দেখা গিয়েছিল এই দ্বন্দ্ব। সেসময় স্পেনের কুখ্যাত একনায়ক ফ্রাঙ্কোর অন্যায় আধিপত্যের শিকার হয়েছিল বার্সেলোনা। ১৯৩৬ সালে ক্লাবটির সভাপতি জোসেফ সুনিয়োলকে গ্রেপ্তার করে হত্যা করেছিল ফ্রাঙ্কোর সেনাবাহিনী। ফ্রাঙ্কোর শাসনামলে কাতালান ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এমনকি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কাতালান ভাষায় লেখা বহু বই।— টেলিগ্রাফ