Archive for জুলাই, 2018

রাবি ছাত্রলীগ: মিউমিউ করা বিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার ইতিহাস

র‍্যাব-পুলিশের মতো ছাত্রলীগেরও একটা মুখস্ত প্লট আছে। তারা শিবির প্রতিহত করতে যান। যেখানে-সেখানে তারা শিবির খুঁজে পান। এমনকি নিজেদের দলের মধ্যেও খুঁজে পান। ছাত্রলীগের মধ্যে কেউ কোনো আকাম করলে বলা হয় সেটা শিবিরের অনুপ্রবেশকারী।
———————–
র‍্যাব-পুলিশের ক্রসফায়ার গপ্পো মানুষ যেমন আর খাচ্ছে না, তেমনি ছাত্রলীগের এই ‘শিবির জুজ’ও আর খাওয়ার যোগ্য থাকছে না। সেজন্যই তারা এভাবে তোতলাচ্ছেন।
———————–

শিবির কী জিনিস দেখেছেন আপনারা? কোনোদিন গেছেন শিবির প্রতিহত করতে? শিবিরের স্বর্গখ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। শিবিরের রমরমার সময়। জীবনে কোনোদিন ছাত্রলীগকে শিবির প্রতিহত করতে যাইতে দেখি নাই। এখন তারা যেটা করছেন সেটা ক্ষমতার নির্লজ্জ আস্ফালন। এই জিনিস বেশিদিন টেকার না।
————————-
২০০৫ সালে ভর্তি হয়েছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন শিবিরের বিশাল বিশাল সব মিছিল দেখতাম। এ মাথায় দাঁড়ালে ও মাথা দেখা যাইত না। ক্লাস নিতে নিতে শিক্ষককে থেমে থাকতে হতো মিনিট দশেক। এখনকার এইসব লুটপাটের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সম্ভবত সেসব দেখেননি।
তো, সেই শিবির রাজত্বে ছাত্রলীগ ছিল বিড়ালের মতো। মিউমিউ করত। এখনকার ক্ষুদ্র কোনো বাম ছাত্র সংগঠন যে অবস্থায় আছে- ছাত্রলীগের অবস্থাও কমবেশি একই রকম ছিল। শিবিরের সঙ্গে গ্যাঞ্জাম কিছু হলে, সেটা হতো ছাত্রদলের।
কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সেসময় সাংস্কৃতিকভাবে ছিল প্রচণ্ড তৎপর। প্রাণবন্ত-উচ্ছল একটা পরিবেশ ছিল ক্যাম্পাসের। প্রতি সপ্তাহেই এখানে-ওখানে হতো পথনাটক। শহীদ মিনারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সভা-সেমিনার; পত্র-পত্রিকা, গান-আড্ডায় মুখর থাকত বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতার পরিসরটা ছিল অনেক বড়। যার ছিটেফোটাও কিছু নেই এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরকারের আমলে।
—————————
এরপর আসল ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এখনকার ছাত্রলীগ নেতারা, যে নেত্রীর নাম নিতে নিতে, মহামান্য বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন- সেই শেখ হাসিনা কারাবন্দী হয়েছিলেন। তাদের আরও অনেক নেতা গিয়েছিলেন গারদের ওপাশে। কিন্তু ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মীকে আওয়াজ তুলতে দেখিনি। আওয়াজ কি— তারা ছিলেনই না অত্র অঞ্চলে।
এরপর আগস্ট বিক্ষোভ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে তাদের কেউ কেউ যোগ দিয়েছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের তৈরি করা পাটাতনে।
আমরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা- যারা বন্ধুত্বের সূত্রে, রাজনৈতিক চিন্তা-চর্চার সূত্রে সংগঠিত হয়েছিলাম, তারাই আওয়াজ তুলেছিলাম সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনায্য-অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগের কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন মাত্র।
————————-
ছাত্রলীগ নামের এই বিড়ালটা দুম করে গায়ে ডোরাকাটা দাগ কেটে বাঘ হয়ে গেল ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর। সেই ‘ভোট বিপ্লবের’ চেতনীয় জোশে তারা মারামারি বাধিয়ে দিলেন শিবিরের সঙ্গে। কারণ তখন তাদের জানাই ছিল যে, পুলিশ তাদের সঙ্গে আছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের কিছু বলবে না। অনেক ক্ষমতার বলে বলিয়ান হয়ে তারা শিবির প্রতিহত করতে গেলেন!!!
————————-
ছাত্রলীগের কাছে ব্যাপারটা ছিল শুধুই ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার। শিবির প্রতিহত করার নামে সেসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জারি করেছিল নয়া জরুরি অবস্থা। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল সব ধরণের স্বাধীন তৎপরতার বিরুদ্ধে। সভা-সেমিনার-মিছিল-সমাবেশ-লিফলেট সব বন্ধ।
অন্যদিকে ছাত্রলীগকে দেওয়া হয়েছিল অবাধ স্বাধীনতা। কোমড়ে অস্ত্র গুঁজে প্রক্টরের সঙ্গে হাঁটা শুরু করেছিলেন ছাত্রলীগ নেতারা। সেই যে শুরু… ২০০৯ সালের দিক থেকে… তারপর থেকে সেভাবেই প্রশাসনের ছত্রছায়ায়-প্রশ্রয়ে দানব হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহ থাকলে পড়তে পারেন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ কাহিনী

—————————-
কিন্তু শিবির কি প্রতিহত করতে পেরেছে তারা? ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের শুরুর দিকে যখন পুরো দেশ কেঁপে কেঁপে উঠছিল- তখন অভিভাবকশূণ্য হয়ে পড়ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। শিবির সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন সেসময়ের কর্মকর্তা-হর্তাকর্তারা। তারা ভয়ে ছিলেন। আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহ থাকলে পড়তে পারেন: কেমন আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়?

তো, এই হলো তাদের শিবির প্রতিহত করার নমুনা। এই হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষিতে গত এক যুগে ছাত্রলীগের ইতিহাস। মিউমিউ করা বিড়াল থেকে বাঘ হয়ে ওঠার ইতিহাস।
—————————-
বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠ পরিবেশ, জ্ঞানচর্চা, তর্ক-বিতর্ক, গান-্আড্ডার পরিবেশ তৈরি হতে পারে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্ত-স্বাধীন তৎপরতার মাধ্যমে। শিক্ষার্থীরা যত বেশি কথাবার্তা বলবেন, নানাবিধ তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হবেন- তত বাড়তে থাকবে স্বাধীনতার পরিসর। কমতে থাকবে দানবদের দৌরাত্ম।

বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত আরও লেখাপত্র

মুক্ত-বিশ্ববিদ্যালয় নাকি মুক্ত-বাজার?

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা… শিখব কি?