এল ক্লাসিকো কি শুধুই ফুটবলীয় লড়াই?

ফুটবল বিশ্বে ‘ডার্বি’ বলতে বোঝানো হয় ‘একই শহর বা এলাকার দুইটা দলের দ্বৈরথ’। যেমন একই শহর ম্যানচেস্টারের দুই ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও সিটির লড়াই। বা ইতালির মিলান শহরের এসি মিলান ও ইন্টার মিলানের লড়াই। সেই অর্থে রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার ধ্রুপদী লড়াইকে কেন ডার্বি বলা হবে; তা ভেবে অবাক হতে হয়। দুইটা দল এক শহরের না, এক এলাকার না; এমনকি তাদের ‘জাতীয়তা’ও আলাদা।

স্বাধীনতার দাবিতে যুগ যুগ ধরে তোলপাড় হয়ে আসছে কাতালোনিয়া। ফ্রান্স ও ভূমধ্যসাগরীয় সীমান্তবর্তী কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা। অন্যদিকে কেন্দ্রীভূত স্প্যানিশ রাষ্ট্রের মধ্যমনি মাদ্রিদ। স্পেনের ম্যাপের একেবারে মাঝামাঝি মাদ্রিদের অবস্থান। কিন্তু ভৌগলিকভাবে অনেক দুরত্ব থাকার পরও রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার দ্বৈরথ কেন এমন ধ্রুপদী লড়াই হয়ে উঠল, তা জানার জন্য আমাদের নজর দিতে হবে দেশটির রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দিকে।

স্প্যানিশ ফুটবলের সঙ্গে দেশটির রাজনীতি খুব ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। ইউরোপের অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে স্পেনেই সম্ভবত দুইয়ের মিশেলটা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। ‘এল ক্লাসিকো’ বা রিয়াল-বার্সার ধ্রুপদী লড়াইয়ের সঙ্গে রাজনীতি-সংস্কৃতি, নিপীড়ণ আর প্রতিরোধগাথা এত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে, যেটা আর অন্য কোনো ফুটবল ম্যাচে দেখা যায় না।

বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাব সবসময় ছিল কাতালোনিয়া জাতীয়তাবাদের প্রতীক। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত, তিন বছরের রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের পর স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো যখন ক্ষমতা দখল করলেন তখন বার্সেলোনার ওপর নেমে আসে নির্মম অত্যাচার। এর একটা অন্যতম প্রধান কারণ: ১৯৩৬ সালে ফ্রাঙ্কোর সেনাবাহিনীর ক্যু’র বিরুদ্ধে প্রথম আওয়াজ এসেছিল বার্সেলোনা থেকে। সেবছর বার্সার সভাপতি জোসেফ সুনিয়োলকে গ্রেপ্তার করে হত্যা করে ফ্রাঙ্কোর সেনাবাহিনী। ১৯৩৬ সালের পর ফ্রাঙ্কোর শাসনামলে নিষিদ্ধ করা হয় কাতালান ভাষা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় কাতালান ভাষায় লেখা বহু বই। সামরিক শাসনামলে এসবের প্রতিবাদ জানানোর মঞ্চ হিসেবে কাতালোনিয়ার মানুষ বেছে নিয়েছিল ফুটবল মাঠকে। বার্সেলোনার মাঠ ন্যু ক্যাম্প পরিণত হয়েছিল নিপীড়ত মানুষের মুখ খোলবার জায়গা। এখানেই কোনো দ্বিধা-ভয় ছাড়াই তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারত মাতৃভাষায়। এভাবেই সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল একটা ফুটবল মাঠ ও ক্লাব। বার্সেলোনা এখনও সেই উত্তরাধিকার বহন করে। এখনও তাদের শ্লোগান: ‘ক্লাবের চেয়েও বেশি কিছু’।

Catalonia vs Argentina

অন্যদিকে ফ্রাঙ্কোর মদমপুষ্ট হয়ে রিয়াল মাদ্রিদ পরিণত হয় শাসকদের আভিজাত্যের প্রতীককে। উঁচু পদ পাওয়ার আশায় জেনারেল ফ্রাঙ্কোর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য রিয়ালের স্যান্টিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামে হাজির হতেন স্পেনের অভিজাতরা। সেনা কর্মকর্তা-ব্যবসায়ীরা। ফ্রাঙ্কোও রিয়াল মাদ্রিদের সাফল্যকে ব্যবহার করতেন নিজের ক্ষমতার যৌক্তিকতা টিকিয়ে রাখার জন্য। এর জন্য নিজের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে নগ্নভাবে ব্যবহার করতেও পিছপা হতেন না স্পেনের কুখ্যাত স্বৈরশাসক। বার্সেলোনার খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখানো, রেফারিদের কিনে নেওয়া ইত্যাদি নানা উপায়ে বার্সার ওপর আধিপত্য বজায় রেখেছে মাদ্রিদ। ১৯৭৫ সালের ২০ নভেম্বর ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুসংবাদ শুনে কুখ্যাত এই স্বৈরশাসকের মূর্তি নিয়ে আনন্দে লোফালুফি করেছিলেন বার্সেলোনার সেক্রেটারি জাউম রোসেল ও পরিচালক হুয়ান গ্রানাডোস। একটা নিপীড়ণ-নির্যাতনমূলক যুগের অবসান হওয়ায় তাঁরা যে কী পরিমাণ খুশি হয়েছিলেন তা স্পষ্টই বোঝা যায়।

ফুটবলে রিয়াল-বার্সার লড়াই যে মহা গুরুত্বপূর্ণ তা নতুন করে বলার কিছু নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিকভাবেও নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের অন্যতম সেরা দুই ক্লাব। খুব সাম্প্রতিক সময়েও, ২০১৩ সালে স্বাধীন কাতালোনিয়ার দাবিতে ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ জায়গা জুড়ে মানববন্ধন করেছেন সেখানকার অধিবাসীরা। হাতে-হাত রেখে এই প্রতিবাদের ঢেউ বয়ে গেছে বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্প স্টেডিয়ামের ভেতর দিয়েও। তার আগের বছর স্বাধীন কাতালোনিয়া ও তার ভাষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও দিয়েছে বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাব।

CATALONIA Human chain

তাই ‘ডার্বি’র প্রথাগত সংজ্ঞার সঙ্গে ঠিকঠাক না মিললেও রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনা লড়াই পরিণত হয়েছে ইউরোপের অন্যতম প্রধান দ্বৈরথে। এর সঙ্গে মেসি-রোনালদো, বেল-নেইমারের ফুটবলীয় লড়াইয়ের উন্মাদনা যেমন আছে। ঠিক তেমনি আছে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের উত্তাপ-উত্তেজনা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: