Archive for মার্চ 20th, 2015

‘সে-ও কি কোথাও বসে ছবি আঁকে?’

কয়েকদিন আগে সংসদ ভবনের সামনে বসে অনেক রাজা-উজির মারছিলাম আমি আর বন্ধু সুমন। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের তর্কে ঢেউ তুলছিলাম মানিক মিয়া অ্যাভেনিউয়ের প্রশস্ত সড়কটাতে। গল্পে-কথায় উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দিচ্ছিলাম দেশের সমাজ-রাজনীতি। হঠাৎ করে দেখলাম এক কেতাদুরস্ত মধ্যবয়সী দম্পতি তাদের দুই সন্তান নিয়ে সিএনজি বা ট্যাক্সি ধরার নিমিত্তে সামনে এসে দাঁড়ালেন।

সুমন তার পরিস্কার প্যান্টটা বাঁচানোর জন্য পশ্চাৎদেশের নিচে একপাটি স্যান্ডেল নিয়েছে। (কেতাদুরস্ত হওয়ার জন্য না, কাপড় কাচার ভয়ে) আরেক পা খোলা… রাস্তায়। আমার দুই পায়েরই স্যান্ডেল খোলা। দুই বন্ধু খালি পায়ে সড়ক দাপিয়ে বসে আছি।
কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, আমাদের সামনে দাঁড়ানো সেই চার প্রানী ধীক্কার-তিরস্কার আর সন্ধিৎসু জিজ্ঞাসা নিয়ে আমাদের দিকে একটু পর পর তাকাচ্ছে। তারা কদাকিঞ্চিৎ এমন করেন কিনা, সন্দেহ আছে। বাচ্চাগুলো হয়তো ভাবতেও পারে না যে এভাবে খালি পায়ে রাস্তায় বসেও থাকা যায়।

একই সময় আমাদের ঠিক বামপাশেই চায়ের দোকানের কোনা থেকে বোতল-কাগজ টোকাচ্ছে ঐ দম্পত্তির বড় কন্যার বয়সী একটি ছেলে। এই ছেলের কথা হয়তো ঐ মেয়েটা জানে না। তারা ‘বসে আঁকে’। ‘আল্পনা-লতাপাতা’ আঁকে। কদাকিঞ্চিত ‘মহেন্দ্র দত্তর ছাতা’ও আঁকে। কিন্তু যে ছেলেটা ‘কাগজ কুড়িয়ে, বস্তায় ভরে’ একা চলে যায় তার খবর মেয়েটির কাছে পৌঁছায় না।

আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র মেয়েটিকেও যেমন বঞ্চিত করেছে খালি সড়কে-সবুজ ঘাসে নগ্ন পায়ে হাঁটার আনন্দ থেকে; ঠিক তেমনি নায্য অধিকার দেয়নি একা চলে যাওয়া ছেলেটাকেও।

এই ছেলেটাকেই হয়তো একদিন কোনো বড় রাস্তার মোড়ে লাল রঙের একটা নির্দোষ ফাঁকা কৌটো কুড়াতে দেখে বেদম মার দেবে ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী’। সেই দাগ শরীরে নিয়ে নিজের পেট বাঁচানো আর সস্তা কিছু নেশার তাড়নায় ‘কদাকার’ মুখওয়ালা ছেলেটি হয়তো হাতে তুলে নেবে হাত বা পেট্রোলবোমা। কোনো একদিন যদি সেটা ঐ মেয়েটির দিকেই ধেয়ে যায়? মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে?

কয়েক হাতের দুরত্বে থাকা দুইটি ফুটফুটে শিশু এভাবে একে-অপরের ঘাতক হয়ে অবস্থান করছে প্রতিনিয়ত।
মেয়েটিও হয়তো ভেবেছে কখনো কখনো: ‘সে-ও কি কোথাও বসে ছবি আঁকে???’ কিন্তু সেটা শোনানোর ফুরসত হয়নি… তার আগেই তারা একে-অপরের ঘাতক বনে গেছে…