Archive for ফেব্রুয়ারি, 2015

ক্রিকবোমিও পরিস্থিতি: বড় অসময়ে এসেছে বিশ্বকাপ!

বাংলাদেশ ক্রিকেট পাগল একটা দেশ। অনেকটা থোরবড়িখাড়া ধরণের হলেও তাদের ‘টাইগার’দের নিয়ে গর্ব-ভালোবাসার অন্ত নেই বাংলাদেশের মানুষের। সেই বাংলাদেশ পঞ্চমবারের মতো অংশ নিয়েছে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপে। সাধারণ একটা সিরিজের ম্যাচ হলেও যেখানে উত্তেজনার অন্ত থাকে না, সেখানে বিশ্বকাপের সময় তো নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধু ক্রিকেট গেলার দশা হয়। কিন্তু এবার তেমনটা হবে কিনা, বলা মুশকিল। কারণ এবারের বিশ্বকাপ যে এসেছে… বড় অসময়ে।

বিশ্বকাপ ক্রিকেট এসেছে দেশের এক ওলটানো-পালটানো সময়ে… যখন সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মনে হয় সন্ধায় বেঁচে ফিরব তো!… হাতবোমার হাত থেকে হাত-পা বাঁচাতে পারব তো? পেট্রোলবোমার আগুনে পুড়ে যাবে না তো মুখটা? কোনো মতে খেয়েপড়ে বেঁচে থাকাও না… শুধু বেঁচে থাকাটাই যে এখন বড় সংগ্রামের বিষয়। এইরকম একটা প্রাণঘাতী-অস্থির সময়ে দুয়ারে হানা দিয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট। এই ক্রিকবোমিও পরিস্থিতির মধ্যে এবারও কী আমরা ফেটে পড়তে পারব ক্রিকেটীয় আনন্দ-উল্লাসে বা আক্ষেপ-আফসোসে; রাগে-ক্ষোভে?

Cricket Bomd Bangladesh Situation

খেলাধুলা যে জাতীয় রাজনীতি-অর্থনীতির সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যেতে পারে তার প্রমাণ আমরা অতীতে অনেক পেয়েছি। কখনো বা এটা হয়েছে নিপীড়িততের প্রতিবাদের পন্থা, সংগঠিত হওয়ার উপায়। কখনো বা হয়েছে শাসকদের ছড়ি। কখনো বা মাত্র একটি খেলার প্রভাবে সাধিত হয়েছে বিশাল মনোজাগতিক পরিবর্তন।

ক্রিকেটও কিন্তু আমাদের জাতীয় জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ওতোপ্রতোভাবে। কোন সরকারের আমলে ক্রিকেট বা ফুটবল দল কত বেশি সাফল্য পেয়েছে-এগুলো পরিসংখ্যান ব্যবহৃত হয় রাজনীতিতে। ক্রীড়াঙ্গনে কেমন টাকা বরাদ্দ করা হবে সেটাও আমাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর ক্রিকেট আমাদের মনোজগতে কতটা প্রভাব ফেলে সেটা নতুন করে বলার কি আছে?

ক্রিকেটের সঙ্গে আমাদের ‘দেশপ্রেম’ও জড়িয়ে গেছে খুব সুনিপুনভাবে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ধারণ করা যেমন দেশপ্রেম… সবচেয়ে বড় পতাকা বানিয়ে রেকর্ড গড়াটাও যেমন দেশপ্রেম… ক্রিকেটে বাংলাদেশকে সমর্থন করাটাও তেমন দেশপ্রেমের কাতারে পড়ে গেছে। দেশপ্রেম যেমন নিঃস্বার্থ… বাংলাদেশ দশকে সমর্থন করার ব্যাপারটাও নিঃস্বার্থ। ‘টাইগাররা জিতুক আর হারুক… সঙ্গে আছি’। কোনো চাওয়া-পাওয়া নাই, শুধু ভালোবেসে যাব- টাইপ ব্যাপার। সমর্থকদের আবেগে থরথর হয়ে বলতে শোনা যায়, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে চলো, জয় তোমাদের হবেই’ জাতীয় কথাবার্তা। ‘একাত্তরে যেভাবে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে দেশ স্বাধীন করেছি সেভাবে আমরা এবার বিশ্বকাপ জয় করব’ এমন সংযোগ রেখাও টানতে দেখা যায় কাউকে কাউকে। ক্রিকেটারদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য ৬৪ জেলায় কনসার্ট, নাচ-গানের আয়োজন করা হয়। ঠিক যেন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশের’ যুগোপযোগী ভার্সন। অনেক সময় এমন অনুভূতি পাওয়া যায় যেন মনে হয় যে ঐ ক্রিকেট দলটাই পুরো বাংলাদেশ। এর বাইরে আর কিছু নেই।

কিন্তু দেশের মানুষের মরোমরো দশার মধ্যে এই গ্রামীনফোন-বাংলালিংক মার্কা আবেগীয়-ক্রিকেটীয় দেশপ্রেম দেখানো কতটা শালীন-শোভন; তা নিয়ে সংশয় জাগে। যেটা স্রেফ ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই না| তার চেয়ে বরং ক্রিকেট আমাদের সমাজ-রাজনীতিতে কেমন প্রভাব রাখছে সেটাই দেখা যাক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। দেখা যাক এরকম একটা অস্থির সময়ে ক্রিকেট বিশ্বকাপ আমাদের জাতীয় জীবনে…চিন্তায়… মূলধারার গণমাধ্যমে, সামাজিক গণমাধ্যমে… জাতীয় রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কিভাবে প্রভাব ফেলছে…

ক্রিকেটীয় কূটনীতির দেখা ইতিমধ্যে পাওয়াই গেছে: মোদি-হাসিনার ক্রিকেটীয় শুভেচ্ছা বিনিময়। ক্রিকেটকে উপলক্ষ্য করে কূটনৈতিক যোগাযোগ হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর। ভবিষ্যতে আরও কী কী ঘটে সেটা দেখার অপেক্ষা থাকল।