Archive for জুলাই, 2013

অদ্ভুতুড়ে জার্সি নম্বর!

numbers১ নম্বর জার্সিটার কথা মাথায় এলেই ভেসে ওঠে দলের গোলরক্ষকের কথা। ঠিক যেরকম ৯ নম্বর জার্সিধারীকে ভাবা হয় দলের প্রধান স্ট্রাইকার, ১০ নম্বরকে দলের প্রাণভোমরা। তবে সব সময়ই হিসাবটা এ রকম সাদাসিধে থাকে না। প্রচলিত প্রথা ভেঙে প্রায়ই ‘উল্টাপাল্টা’ জার্সি পরতে দেখা যায় ফুটবলারদের। সম্প্রতি যেমনটা করতে চলেছেন হল্যান্ডের সাবেক তারকা খেলোয়াড় এডগার ডেভিস। মিডফিল্ডার হওয়া সত্ত্বেও এবার তিনি গায়ে চড়াবেন ১ নম্বর জার্সিটা।

ইংল্যান্ডের ছোট্ট ক্লাব বারনেটে ডেভিসের ভূমিকা বহু বিচিত্র। অ্যাজাক্স, এসি মিলান, বার্সেলোনা, জুভেন্টাসের মতো শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোতে খেলার পর গত বছর চতুর্থ বিভাগের এ দলটিতে যোগ দিয়েছেন ৪০ বছর বয়সী ডেভিস। তারপর থেকে তিনি পালন করছেন কোচের দায়িত্ব। একই সঙ্গে অধিনায়কত্বের বাহুবন্ধনীও উঠেছে তাঁরই হাতে। তিনিই যে দলটির সর্বেসর্বা, সেটা স্পষ্টই বোঝা যায়। এ সুবিধাটা কাজে লাগিয়েই বোধ হয় দলে কিছুটা নতুনত্ব আনতে চাইছেন ডেভিস। নিজের অদ্ভুত এই খেয়ালটি সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য, ‘এবারের মৌসুমে এটাই আমার নম্বর। আমি এ ধারাটাই চালু করতে চাই।’ ডেভিসের এই আবদার মেটানোর জন্য দলের নিয়মিত গোলরক্ষক গ্রাহাম স্টার্ককে পরতে হবে ২৯ নম্বর জার্সি।

ফুটবলে এই অদ্ভুতুড়ে জার্সির খেয়ালটা অবশ্য ডেভিসেরই প্রথম নয়। এর আগেও এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত গ্রিক ক্লাব অলিম্পিকোসে খেলার সময় প্লেমেকার প্যান্টেলিস কাফেস পরেছেন ১ নম্বর জার্সি। কখনো হয়তো বাধ্য হয়েও এমন প্রথাবিরোধী জার্সি পরতে হয়েছে কোনো কোনো ফুটবলারকে। ২০০৮ সালে স্ট্রাইকার ডেরেক রিয়োর্ডানকে দেওয়া হয়েছিল ১ নম্বর জার্সি। কারণ ১০ বা ৯ নম্বর জার্সিটির দখল ইতিমধ্যেই অন্য কারও কাছে ছিল।

মরক্কোর স্ট্রাইকার হিশাম জেরোউলিকে ‘০’ নম্বর জার্সি পরার অনুমতি দিয়েছিল তাঁর ক্লাব আবেরডিন। কারণ জেরোউলির ডাকনাম ছিল ‘জিরো’।

পছন্দসই জার্সি নম্বর পরতে গিয়ে দর্শকদের তোপের মুখেও পড়তে হয়েছিল ইতালিয়ান গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনকে। ২০০০ সালে হঠাত্ করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৮৮ নম্বর জার্সি। এতে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল ইতালির ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে। কারণ তাদের কাছে ইংরেজি ৮টাকে মনে হয়েছিল ‘H’। আর দুইটা ৮ মিলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল ‘HH’; যার অর্থ দাঁড়াতে পারে নািস স্যালুট ‘হেইল হিটলার’রের মতো। বুফন অবশ্য ভিন্নরকম একটা ব্যাখ্যাই দিয়েছিলেন, ‘আমি ৮৮ নম্বরটা বেছে নিয়েছিলাম। কারণ, এটা আমাকে চারটা বলের কথা মনে করিয়ে দিত। আর ইতালিতে বলের অর্থ কী, সেটা সবাই জানে—শক্তিমত্তা, দৃঢ়সংকল্প।’

শীর্ষ ইউরোপিয়ান ফুটবল প্রতিযোগিতায় প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৯৯ নম্বর জার্সিটা পরেছিলেন পোর্তোর ভিক্টর বাইয়া। ২০০৩-০৪ মৌসুমে মোনাকোর বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে এই জার্সি গায়েই শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন পোর্তোর গোলরক্ষক।

তবে এই অদ্ভুতুড়ে জার্সি নম্বর পছন্দ করার ক্ষেত্রে হয়তো সবাইকে পেছনে ফেলে দেবে চিলির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ইভান জামরানোর কাহিনিটা। ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগা শিরোপা জেতার সময় জামরানো পরতেন ৯ নম্বর জার্সি। ১৯৯৬ সালে তিনি পাড়ি জমান ইন্টার মিলানে। সেখানেও পেয়ে যান ৯ নম্বর জার্সিটাই। কিন্তু গোল বাধে ১৯৯৮ সালে রবার্তো ব্যাজ্জিও ইন্টারে আসার পর। ইতালির এই তারকা মিডফিল্ডার ১০ নম্বর জার্সিটির দাবি জানান, যেটা তখন ছিল ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার রোনালদোর দখলে। ব্যাজ্জিওর কথা মেনে নিয়ে ১০ নম্বর জার্সিটি ছেড়ে দেন রোনালদো। কিন্তু তাঁকে ৯ নম্বর জার্সিটি দেওয়া হয় জামরানোকে বঞ্চিত করে। ৯ নম্বর জার্সিটির ওপরে জামরানোর এতটাই আসক্তি ছিল যে কোনোভাবেই সেটা ছাড়তে রাজি ছিলেন না। কিন্তু একই নম্বরের জার্সি তো আর দুজন পরতে পারেন না। তাই নতুন এক ফন্দিই বের করেছিলেন জামরানো। জার্সির নম্বরটা ৯ রাখার জন্য তিনি পরতেন ‘১+৮’ লেখা একটি জার্সি। এভাবেই ইন্টার মিলানে বাকি দুই বছর খেলেছিলেন এই চিলিয়ান স্ট্রাইকার।

Davids_Image

আলটাইয়ের প্রাকৃতিক বিপর্যয়: বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের লড়াই

Altai_01

আলটাই পর্বতমালার উকক মালভূমিকে খুবই পবিত্র একটা স্থান বলে বিবেচনা করেন স্থানীয় আদিবাসীরা। ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় স্থান করে নেওয়া আলটাই পর্বতমালার একেবারে মধ্যমনি বলা যায় উকক মালভূমিকে। কিন্তু সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে এলাকাটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গলতে শুরু করেছে মাটির নিচে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বরফ। আলটাইয়ের আদিবাসীরা অবশ্য প্রকৃতির এই ভারসাম্যহীনতাটা টের পাচ্ছেন অন্য কারণে। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, প্রাচীন আমলের সব সমাধিস্থল পুনপ্রতিষ্ঠা করা, যেগুলো বৈজ্ঞানিকরা তুলে নিয়ে গেছেন গবেষণার জন্য। তারা মনে করে, এই পবিত্র সমাধিস্থলগুলোই আলটাই আর তার মানুষদের সুরক্ষিত রেখেছে বছরের পর বছর।

২৪০০ বছর আগে, এক উষ্ম গ্রীষ্মের দিনে এই উকক মালভূমিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছিলেন যাযাবর পাজর্ক গোত্রের এক জ্ঞানী নারী। তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল অনেক বড় একটা সমাধিতে। নানা ধরনের ঔষধি লতাপাতা, গাছের বাকল, নরম লোমওয়ালা চামড়ার কোট জড়িয়ে বানানো হয়েছিল তাঁর মমি। একটাই বড় কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বানানো হয়েছিল বিশালাকার কফিনটা। সঙ্গে উত্সর্গ করা হয়েছিল ছয়টি ঘোড়া। খুবই সুসজ্জিত ঘোড়াগুলো সদাপ্রস্তুত তাঁকে মৃত্যুপরবর্তী রাজ্যে নিয়ে যেতে।

১৯৯৩ সালের আরেক গ্রীষ্মে এই রহস্যময়ীর সন্ধান পান রাশিয়ার একদল গবেষক। এটাকে গত শতকের অন্যতম সেরা প্রত্নতাত্তিক আবিস্কার বলে প্রায়শই বিবেচনা করা হয়। এই আবিস্কারটার ফলেই পাজর্ক সমাজ ও জীবনের আরও গভীরে উঁকি দেওয়ার সুযোগ মিলেছে, যেটা এতদিন আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে অজানাই ছিল। কিন্তু পাজর্ক সমাজে তাঁর অবস্থান কী? এখনকার আলটাই আদিবাসীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাই বা কী? কে এই রহস্যময়ী নারী? কোনো শাসক নাকি কোনো পবিত্র আধ্যাত্মিক চরিত্র?

Altai_02

স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে তিনি পরিচিত উককের রাজকন্যা কাদান নামে। আর তাদের কোনই সন্দেহ নেই যে, এই রাজকন্যার সঙ্গে আলটাইয়ের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। অনান্য আরও অনেক ক্ষমতাধর পুরোহিতদের মতো, আলটাইয়ের এই কন্যাকেও সমাহিত করা হয়েছিল উকক মালভূমির পবিত্র পাহাড়ি উপত্যকায়। উত্তরসূরীদের সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য।

রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ এই ধরনের আবেগকে অবৈজ্ঞানিক ও পশ্চাতপদ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, গবেষণা থেকে এমন কিছুই বেরিয়ে আসেনি যা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রাজকন্যা কাদান বা সাইবেরিয়ার বরফকুমারীর দেহাবশেষের সঙ্গে বর্তমানের আলটাই মানুষদের কোনো সংযোগ আছে। জীনগতভাবেও নয়, এমনকি রুপকার্থেও না।

অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের এই ধরণের কথাবার্তার কোন বাস্তব ভিত্তিই খুঁজে পায় না স্থানীয় আদিবাসীরা। তাদের চোখে রাজকন্যা কাদান আর আলটাই অঞ্চলটি এক ও অভিন্ন। পূর্বসূরীদের আত্মাকে বিরক্ত না করা, তাদের সমাধিস্থল সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারা না পারার উপরেই নির্ভর করছে পুরো এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য, সমাজের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি।

উকক মালভূমিতে গবেষণারত কিছু বিজ্ঞানীও আদিবাসীদের এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সহানুভূতিশীল। আর হবেন না-ই বা কেন? বিষদভাবে গবেষণার জন্য কাদান রাজকন্যার সমাধি মাটি থেকে তোলার পর আশ্চর্য্যজনকভাবে নষ্ট হতে শুরু করেছে ঐ এলাকার ভারসাম্য। ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।

খননকার্যের সময়ই সেখানে একটা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর শোনা যায়। ২০০৩ সালে সেখানে আঘাত হেনেছিল ৭.৩ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। যেটা পুরো আলটাই গ্রামকেই মিশিয়ে দিয়েছিল মাটির সঙ্গে। সেখানকার আদিবাসীরা মনে করেন, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য রাজকন্য কাদানকে অবশ্যই ফিরে আসতে হবে তাঁর জন্য নির্ধারিত সুসজ্জিত স্থানটিতে।

Altai_03

রাজকন্যা কাদানকে তাঁর সুরক্ষিত স্থানে ফিরিয়ে আনতে অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেখানকার আদিবাসীরা। রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে যেভাবে দেখছে তাতে আদিবাসীদের কাজটা যে কঠিন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তারপরও ধরা যাক, তাঁরা সফলও হলেন। কিন্তু রাজকন্যা কী সত্যিই সুরক্ষিত থাকতে পারবেন তাঁর সমাধিস্থলে? মাটির নিচে জমে থাকা যে বরফগুলো প্রাচীন এই সমাধিস্থল সুরক্ষিত রেখেছিল, সেগুলো সম্প্রতি গলতে শুরু করেছে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে। জলবায়ু পরিবর্তন আক্ষরিক অর্থেই গলিয়ে দিচ্ছে আলটাই আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারগুলো। অন্তত এটাই এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈজ্ঞানিকদের কাছে।

বিংশ শতাব্দিতে আলটাইয়ের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যেসব জায়গায় উকক মালভূমির পবিত্র সমাধিগুলো সুরক্ষিত ছিল হাজার হাজার বছর ধরে, সেসব জায়গা আছে ভয়াবহ ঝুঁকির মখে। আলটাইয়ের অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে ইতিমধ্যেই গলতে শুরু করেছে ভূগর্ভস্থ বরফ। তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে তাতে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন ২০৮০ সাল নাগাদ এখানকার তাপমাত্রা বাড়বে ৩ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেমনটা হলে হয়তো পুরোপুরিই গায়েব হয়ে যাবে আলটাইয়ের ভূগর্ভস্থ বরফগুলো। ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসবে আলটাইয়ের পাহাড়ি উপত্যকায়।

বিজ্ঞানীরা এই প্রাকৃতিক ভারসাম্যটা রক্ষা করার জন্য লড়ে যাচ্ছেন প্রাণপনেই। ‘আলটাইয়ের বরফ সমাধি’গুলো সূর্যের তাপ থেকে বাঁচানোর জন্য সেগুলো ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছেন ইউনেসকো ও গেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।

বৈজ্ঞানিকভাবে তো চেষ্টা চলছেই, প্রাচীনপন্থী আদিবাসী মানুষদের বিশ্বাসকে সম্মান জানালেও তো খুব বেশি ক্ষতি নেই। পার্জক গোত্রের রহস্যময়ী রাজকন্যা কাদানকেও ফিরিয়ে দেওয়া হোক তাঁর বহুদিনের পুরোনো আশ্রয়ে। তিনিও তো চেষ্টা করতে পারেন প্রকৃতির রুদ্ররোষ প্রশমনের জন্য!?