কিভাবে হবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন?

Shahbag Square protest reaches Day 9

গণজাগরণের ঢেউ দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। ছয় দফা দাবি আদায়ের পর দেশজুড়ে একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনার পরিকল্পনাও গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকদের আছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বিডিনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, ‘সবাই আমাদের ছয় দফা দাবি সম্পর্কে জানেন। এগুলো পূরণ হয়ে গেলে আমরা দেশজুড়ে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনার কথা ভাবছি, যার মূল লক্ষ্য হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া। এতে করে আমাদের দেশের রাজনীতি থেকে ময়লাগুলো সব ধুয়ে যাবে।’ নিঃসন্দেহে খুবই ভালো ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সাংস্কৃতিক প্রচার চালানো অবশ্যই জরুরি। পুরো দেশের মানুষের কাছে শাহবাগের গণজাগরণ বার্তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়াটার উপরই আসলে নির্ভর করছে নতুন প্রজন্মের এই মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য। কিন্তু এই কাজটা করা হবে কিভাবে?

যদি বিষয়টা এমন হয় যে, একেক দিন একেকটা শহরে শুধু একটা করে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে, তাহলে কার্যকরী কোন প্রভাব ফেলা যাবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। হয়তো ঐ দিনটাতে একটা শহরে একটু উত্তাপ-উত্তেজনা ছড়াবে, মানুষ কৌতুহল নিয়ে দেখতে আসবে, খুব বেশি হলে আরও কিছুদিন এলাকা সরগরম থাকবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় পুরো দেশে বিরাজমান সাংস্কৃতিক-শিক্ষাগত বৈষম্য/ব্যবধান দূর করা যাবে না। মানুষের মনোজগতে কার্যকরী প্রভাব ফেলতে গেলে হয়তো আরও জনসম্পৃক্ততামূলক পদ্ধতির কথা ভাবতে হবে শাহবাগ চত্বরকে। মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনেক সন্দেহ-সংশয়, বিভ্রান্তি দূর করার কাজটা সহজ না।

আজকে আমরা শিবিরের পেজগুলোকে এখন এত প্রকটভাবে উন্মোচিত হতে দেখছি। ছাগুদের কীর্তি-কারবার নিয়ে হাসাহাসি করছি, এগুলোর বিরুদ্ধে সাইবার যুদ্ধ করছি। কিন্তু এগুলো ক্রিয়াশীল ছিল তো অনেকদিন ধরে। এবং সরকারের নিরন্তর সমালোচনা করে তারা সত্যিই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। সেইসব সমালোচনার পেছনে যে এই জামায়াত-শিবির আছে, সেটা আমরা খেয়ালই করে দেখিনি। কারণ সমালোচনা করার যৌক্তিক কারণ ছিল। পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির পর যদি কোন পেজ থেকে আবুল হোসেনের একটি কেরিকেচার-যুক্ত ছবি পোস্ট করা হতো, তাহলে কি কেউ বুঝতে পারতেন যে, সেটা জামায়াত-শিবিরের পেজ? সেইরকম সমালোচনা তো অনেকেরই ছিল সরকারকে নিয়ে। ফলে সরকার-আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের কুকীর্তিকে পুঁজি করেই কিন্তু এতদিন ধরে অনেকের “লাইক” পেয়ে এসেছে এই ‘বাঁশের কেল্লা’গুলো। এটা তো শুধু ফেসবুকের কথা হলো। এর বাইরেও গ্রামে-বন্দরে, হাটে-বাজারে-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে-সর্বত্রই নানাবিধ প্রচারণা চালিয়ে এসেছে, সরকার বা আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে। এবং সেগুলো এখনকার মতো মিথ্যা প্রচারণা দিয়েও করতে হয়নি। সরকার, তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ যেভাবে গত চার বছর ধরে নানাবিধ দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারীতা চালিয়ে গেছে, তাতে তাদের উপরে মানুষের আস্থা প্রায় তলানিতে নেমে এসেছিল। সেগুলোর প্রভাব তো হুট করে চলে যাবে না। জামায়াত-শিবির মানুষের ভেতরে এতদিন ধরে যে প্রচারণা চালিয়েছে এবং তারা যে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সমর্থন আদায় করার কাজটা করে গেছে, জনসমাজে সেটার প্রভাব এক-দুইটা মহাসমাবেশ করে উড়িয়ে দেওয়া কি সম্ভব?

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সুবাদে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে যে, শিবির কিভাবে পরিচালিত হয়, কিভাবে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করে। কিভাবে তারা একজন ছাত্রকে সংগঠনটির উপর নির্ভরশীল করে ফেলে। শিবিরের স্বর্ণযুগে, ভর্তিপরীক্ষার আগ দিয়ে প্রতিটা হলে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করত ছাত্রশিবির। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতি ভালো ব্যবহার করা হতো। এরপর যারা যারা ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাদেরকে সেই সুখবরটা জানানোর কাজটিও করতেন ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। একজন গরীব বা অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীর হলে থাকার ব্যবস্থা, প্রয়োজনে খাবার খরচটিও বহন করে সংগঠনটি। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর সঙ্গে গড়ে তোলে পারিবারিক সম্পর্ক। তাদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক সহযোগিতাও করে শিবিরের নেতারা। এবং কখনোই তাদেরকে মিছিল-মিটিং-মারামারির ভেতরে ঢোকানো হয় না। ফলে এই রকম অনেক শিক্ষার্থী কৃতজ্ঞতাবশই শিবিরের প্রতি সমর্থন জানান। ক্যাডারদের জন্যও থাকে আলাদা ব্যবস্থা। সেটার ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি অন্য ধরণের। এভাবে খুবই সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয় ছাত্রশিবির। ভালো ফলাফল করে পাস করা শিক্ষার্থীদের চাকরির ব্যবস্থাও অনেকাংশে করে দেওয়া হয় ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে। এভাবেই তারা ছড়িয়ে পড়ে পেশাগত জায়গায়। প্রভাব বিস্তার করে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে। দীর্ঘদিনের সুসংগঠিত কর্মতত্পরতা আর প্রচারণার মাধ্যমে জনমানসে শক্ত খুঁটি গেড়েছে জামায়াত-শিবির।

এবং তাদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবিলা করার মতো কার্যকর তত্পরতা কিন্তু এতদিন ধরে প্রগতিশীলদের দিক থেকে তেমনভাবে ছিল না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংস-বল প্রয়োগের মাধ্যমে ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাস থেকে উত্খাত করা গিয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু সফলতা কতখানি আর এই সহিংস বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি হয় সেটা এখনকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেই সবাই দেখতে পারবেন। বিগত চার বছরে ছাত্রশিবিরকে রুখার নামে ছাত্রলীগকে দেওয়া হয়েছিল অবাধ স্বাধীনতা। আব্দুস সোবহান প্রশাসনের শেষসময়ে সেই ছাত্রলীগই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে চড়াও হয়েছে প্রশাসনের উপর। নিয়োগ বাণিজ্যে অসন্তুষ্ট হয়ে প্রশাসন ভবনে ভাঙচুর করেছে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী। আর উপাচার্য,-উপ-উপাচার্যবিহীন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে পড়েছে অভিভাবকহীন। পরিহাসের কথাটি হচ্ছে, এই অভিভাবকত্বহীনতার সুযোগ নিয়ে নাকি এখন ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে গোলযোগ তৈরি করতে পারে। শেষ শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সভাপতির পদটিও হারিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা। তাহলে কী প্রতিরোধ করলেন উনারা এতদিন? আমার ধারণা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত ৪টি বছর থেকে শিক্ষা নিতে পারে এখনকার শাহবাগ আন্দোলন। দুই ক্ষেত্রেই ইস্যুটা একই। জামায়াত-শিবির প্রতিরোধ। গত চার বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েও শিবির উত্খাত করতে পারেনি ছাত্রলীগ ও প্রশাসন। তাদের তো পূর্ণ ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়কে শিবির মুক্ত করা। কেন পারলো না? তাহলে কী পদ্ধতিতে কোন ভুল ছিল? আমার ধারণা এই দিকটি ভাবার দাবি রাখে।

শত্রুপক্ষের প্রচারণা নিয়ে শুধু হাসাহাসি করলেই তো সমস্যার সমাধান হবে না, সেগুলো মোকাবিলার জন্য কার্যকর কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সেই কথাটা ভাবতে হবে। আর এখন যেভাবে র্যাব-পুলিশ দিয়ে সহিংসভাবে জামায়াত-শিবির রুখার বা জনসাধারণকে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, সেটা কোন সমাধান না। ব্লগার রাজীব খুন হওয়ার পর যেমন আমরা শ্লোগান দেই যে, ‘এক রাজীব লোকান্তরে, লক্ষ্য রাজীব ঘরে ঘরে’। তেমনি তারাও ‘শহীদ’দের লাশ দেখিয়ে জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে অন্য দশজন তরুণকে। পিঠ একদম দেওয়ালে ঠেকে যাওয়ার পর, আর কোন উপায়ান্তর না দেখলে হয়তো এই তরুণদের মধ্যেই কেউ কেউ হয়ে উঠতে পারে আত্মঘাতি বোমাবাহক। তেমন পরিস্থিতি কি তাহলে আরও খারাপ হবে না?

Somabesh

গতকাল ছিল ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ক্ষুদে যোদ্ধা অপূর্ব’র বেশে সত্যিই যেন ফিরে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণটি হুবহু অনুকরণ করে অজস্র মানুষকে আবারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত করেছেন অপূর্ব। আবারও মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের ঐক্যবদ্ধতায় উচ্চারিত হয়েছে মুক্তির সংগ্রাম করার অঙ্গীকার। সত্যিই আজ আমরা আবার রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীমুক্ত স্বাধীন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার দৃঢ় শপথ নিয়েছি। কিন্তু প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করব কিভাবে, কোন পদ্ধতিতে, সেটাও আমাদের ভাবতে হবে। জামায়াত-শিবিরের গোড়া কোন পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং এটা কেন বিস্তৃত হতে পেরেছে সেটাই আমাদের সবার আগে ভাবা উচিত্। গ্রাম-গঞ্জের, জেলা-উপজেলার সাধারণ মানুষের কাছে গণজাগরণের বার্তা সত্যিই পৌঁছে দিতে চাইলে আপামর জনসাধারণের মনে জমে থাকা অনেক অনেক প্রশ্ন, সন্দেহ-সংশয়ের সঠিক জবাব দিতে পারতে হবে শাহবাগ আন্দোলনের সংগঠকদের। শুধু জবাব না, অনেক অনেক প্রশ্নের কথাই আগে ভাবতে হবে।

  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: