দেড় বছরেই পেশাদার ফুটবলার!

মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার সঙ্গে পেশাদারী ফুটবলার হিসেবে চুক্তি করেছিলেন এসময়ের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। তারচেয়েও কম, মাত্র ১২ বছর বয়সে বলিভিয়ার ক্লাব অরোরার হয়ে পেশাদারী ফুটবল খেলা শুরু করেছিলেন মাউরিসিও বালডিভিয়েসো। তবে সম্প্রতি মনে হয় এই সবধরণের রেকর্ডই ভেঙ্গে দিয়েছে নেদারল্যান্ডের বায়ের্কে ভন ডার মেইজ। ডাচ ক্লাব ভেনলোস ভোয়েটবল ভেরেইনিং ভেনলোর (ভিভিভি-ভেনলো) হয়ে তিনি চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন মাত্র ১৮ মাস বয়সে। গত ২৬ এপ্রিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়েই ১০ বছরের জন্য এই চুক্তি সাক্ষরের অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করেছে ডাচ ক্লাবটি।

বিশ্বজুড়ে যে তাকে নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে এটা হয়তো ভালোমতো জানেই না দেড় বছরের ভন ডার মেইজ। এখনো ভালোমতো কথা বলাও শেখে নি শিশুটি। তবে চুক্তি সাক্ষর অনুষ্ঠানে নিজের কাজটা নিজেই করেছে ক্ষুদে ফুটবলার। চুক্তিপত্রে নিজ হাতেই কলম দিয়ে আঁঁকিবুকি করে পেশাদারী ফুটবলের জগতে নিজের নাম লিখিয়েছে এই বিস্ময় বালক। উল্লেখ করা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, আশ্চর্যজনকভাবে ‘বল’ শব্দটি বেশ জোড়ালোভাবেই উচ্চারণ করতে পারে সে।

ইউটিউবের প্রকাশিত একটি ভিডিওর মাধ্যমে প্রথম সবার নজর কাড়েন বায়ের্কে ভন ডার মেইজ। ভিডিওটিতে দেখা যায় যে, সদ্যই একপা দুই পা হাঁটতে শেখা এই শিশুটি শতভাগ নির্ভূলতার সঙ্গে পরপর তিনটি বল চমত্কার দক্ষতায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পাঠাতে সক্ষম হয়। মাত্র দেড় বছর বয়সী পেশাদার ফুটবলারের এই ফুটবল দক্ষতা ইউটিউবের মাধ্যমে প্রকাশ করেন তার বাবা। এরপর থেকেই রীতিমতো তারকাখ্যাতি পেয়ে যায় ছোট্ট শিশুটি। এখন পর্যন্ত ভিডিওটি দেখা হয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ বার। ভবিষ্যতে এই শিশুটিই হয়ে উঠবে ডাচ কিংবদন্তী ইয়োহান ক্রুইফ বা ডেনিস বার্গক্যাম্পের মতো বিশ্বমানের ফুটবলার, এমন প্রত্যাশা থেকেই হয়তো এই ছোট্ট শিশুটিকে পেশাদারী ফুটবলের জগতে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডাচ ক্লাব ভিভিভি-ভেনলো। তবে এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না যে, ভবিষ্যতে সে স্ট্রাইকার হবে নাকি ডিফেন্ডার। চুক্তি সাক্ষরের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর এক সংবাদ বিবৃতির মাধ্যমে ক্লাবটি জানায়, ‘শিশুটির পছন্দনীয় পজিশন এখনো নিশ্চিত না। যদিও আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, ডানপায়ের এই খেলোয়াড়ের চমত্কার কৌশল, অধ্যাবসায় আছে।’

কিন্তু শিশুটি সত্যিই বড় হয়ে ওঠার পর ফুটবল খেলবে কিনা বা এত ছোট বয়সেই কোন শিশুর খেলোয়াড়ী সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায় কিনা, এমন প্রশ্ন তুলেছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা ও আচরণগত বিজ্ঞানীরা। ওরেগন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট ট্রোস্ট বলেছেন, ‘বাচ্চাদের অগ্রগতিটা একেক ধাপে একেক রকম হয়। প্রত্যেকটা ধাপে অনেক বৈচিত্র্যও লক্ষ্য করা যায়। কিছু বাচ্চার কোন কোন সঞ্চালক পেশি খুব দ্রুতই বিকশিত হয়। বা অন্যদের তুলনায় তাড়াতাড়ি বিকশিত হয়। কিন্তু যদি কোন বাচ্চা তাড়াতাড়ি হাঁটা শেখে, তার মানে এই না যে, সে বড় হয়ে ম্যারাথন চ্যাম্পিয়ন হবে। এত কম বয়সেই কারও এরকম খেলোয়াড়ি সক্ষমতার পরিমাপ করা যায়না।’

অন্য বিশেষজ্ঞরাও এই মন্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন। ‘শারিরীক অবস্থা ও শৈশব-কর্মের ম্যানুয়্যাল’ শীর্ষক  বইয়ের লেখক রবার্ট এম. মালিনা বলেছেন, ‘শৈশবের কোন পারদর্শীতা ও বাস্তবে মাঠে খেলোয়াড়ী দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারার ভেতরে অনেক পার্থক্য আছে।’ প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময়ই বাচ্চারা কোন নির্দিষ্ট একটা খেলায় নিজের সক্ষমতা প্রমাণের সবচেয়ে ভালো সুযোগ পায় বলে মত দিয়েছেন তিনি। এরপরই তিনি তুলেছেন সবচেয়ে মোক্ষম প্রশ্নটা, ‘কী হবে যদি বাচ্চাটা বড় হওয়ার পরে ফুটবলের উপর তার কোন আগ্রহ না জন্মায়?’

এতকিছুর পরেও দেড় বছর বয়সী এই শিশুটিকে পেশাদার ফুটবলারদের কাতারে নিয়ে এসেছে ডাচ ক্লাব ভিভিভি-ভেনলো। অনেকেরই বিশ্বাস যে, শুধুমাত্র নিজেদের প্রচার বাড়ানোর জন্যই এই অভূতপূর্ব কাজটা করেছে ক্লাবটি। তবে এই চুক্তি সাক্ষরটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রতিকী’ বলে ঘোষণা করলেও হয়তো সত্যিই ক্লাব কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে যে, এই শিশুটি একদিন বড় ফুটবলার হবে। কারণ শিশুটির পিতামহ, জান ভন ডার মেইজও ছিলেন একজন ফুটবলার। তিনিও খেলতেন এই ক্লাবের পক্ষে। ভন ডার মেইজ ছিলেন একজন মিডফিল্ডার। ১৯৫৮-৬০ ও ১৯৬৪-৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি সামলেছেন এই ডাচ ক্লাবটির মাঝমাঠ। তাঁর এই ফুটবল উত্তরাধিকার নাতির রক্তেও বইছে বলে বিশ্বাস ক্লাবটির। তাদের মতে, ‘এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, পিতামহের ফুটবল প্রতিভা নিয়েই সে বেড়ে উঠছে।’

অবশ্য সবকিছুর পরে আপাতত ক্ষুদে এই ফুটবলারকে আগামীর জন্য শুধু শুভকামনাই জানিয়ে রাখতে পারে ক্লাবটি। ভবিষ্যতে সে আদৌ ফুটবল মাঠে পা রাখবে কিনা, সেটা জানার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হবে সবাইকে। তবে নজিরবিহীন এই কাজটি করে ক্লাবটি যে বিশ্বজোড়া আলোড়নটা বেশ ভালোমতোই তুলতে পেরেছে, তা একেবারে নিঃসন্দেহেই বলা যায়।

  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: