স্বদেশীদের ভালোবাসা কেন পাননা লিওনেল মেসি?

একের পর এক তাক লাগানো সব কীর্তি করে ফুটবল বিশ্বকে হতবিহ্বল করে রাখছেন লিওনেল মেসি। মাঠে তাঁর পায়ের অসাধারণ কারুকাজ দেখে তাজ্জব বনে যায় ফুটবলপ্রেমীরা। ধারাভাষ্যকারেরা মেসির গোলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিশেষণ হারিয়ে ফেলেন! অবাক বিস্ময়ে ভাবেন, এরকম জাদুকরী ফুটবল খেলা কিভাবে সম্ভব? নিজের যোগ্যতার প্রমাণস্বরুপ মাত্র ২৪ বছর বয়সেই টানা তৃতীয়বারের মতো ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার জিতেছেন বার্সেলোনার এই আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার জার্সি গায়ে করে চলেছেন একের পর এক গোল, জিতে চলেছেন একের পর এক শিরোপা। মেসি যে এসময়ের সেরা ফুটবলার, তা এখন মোটামুটি সুপ্রতিষ্ঠিত। ফুটবল বিশ্বে জোর বিতর্ক চলছে, তিনি সর্বকালেরই সেরা ফুটবলার কিনা, তা নিয়ে। এই বিতর্কের রসদ জুগিয়ে প্রায়ই গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হন সর্বকালের সেরা দুই ফুটবলার হিসেবে খ্যাত পেলে-ম্যারাডোনা, সর্বকালের সেরা কোচ হিসেবে বিবেচিত স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, ব্রিটিশ স্ট্রাইকার ওয়েইন রুনি, মেসির বার্সা সতীর্থ জাভি-পুয়োলসহ আরো অনেক অনেক ফুটবল তারকারা। পেলে ব্যাতিত অন্যান্য সবাই মেসিকে সর্বকালের সেরা বলে সরাসরি কোন রায় না দিলেও অন্তত সর্বকালের সেরার সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনয়নটা দিয়েছেন জোড়ালো কণ্ঠে। ক্যারিয়ার শেষে মেসি অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে যাবেন, এমন বিশ্বাসও আছে অনেকের। তবে এত কিছুর পরেও এখনও কিন্তু একটা হতাশা কুরে কুরে খাচ্ছে লিওনেল মেসিকে। মন জয় করা তো অনেক দূরের কথা, এখনও নিজ দেশ আর্জেন্টিনার মানুষদের সমর্থনটাও ভালোমতো আদায় করতে পারেননি তিনি। তাঁর প্রতি অভিযোগ: তিনি কাতালানদের, আর্জেন্টিনার নন। দেশের প্রতি ভালোবাসার ঘাটতি আছে কিনা, এমন কটু প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছে সমগ্র ফুটবল বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখা এই ফুটবলারকে। কেন স্বদেশীদের ভালোবাসা পাননা লিও মেসি?

২০১১ সালে মেসির টানা তৃতীয়বারের মতো ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার জয়ের কয়েকদিন পরে আর্জেন্টাইন দৈনিক লা ন্যাশন পত্রিকার ক্রীড়া লেখক লিখেছিলেন, ‘যখন সারা বিশ্ব মেসিকে সম্মান জানাচ্ছে, সেসময় তিনি এখানে খুব কমই সমর্থন অর্জন করতে পেরেছেন।’ লেখাটার শিরোনাম ছিল: ‘এখন কাতালানদের সম্মান জানানোর সময়’। শিরোনামটি খুব স্পষ্টই নির্দেশ করে, মেসি ‘বার্সেলোনার একজন’, ‘আমাদের একজন’ নন।

অনেক আর্জেন্টাইনই মেসিকে খুব বেশি আপন ভাবতে পারেন না। কারণ তাঁর পুরো পেশাদারী ফুটবল ক্যারিয়ারটাই স্পেনকেন্দ্রিক। লাতিন আমেরিকান ফুটবলের ক্ষেত্রে, তারকা হওয়ার প্রথাগত ধাপগুলো হচ্ছে, প্রথমে নিজ দেশের কোন ক্লাবের পক্ষে খেলে নিজের সক্ষমতা-যোগ্যতার পরিচয় দেওয়া এবং নিজ দেশের মানুষের সঙ্গে একটা মানসিক বন্ধন গড়ে তোলা। তারপর আরও বড় সাফল্যের লক্ষ্যে ইউরোপিয়ান ফুটবলের বৃহত্তর আঙ্গিনায় পা রাখা। পেলে-ম্যারাডোনার মতো বেশিরভাগ লাতিন আমেরিকান ফুটবল তারকাই এই প্রথাগত পথেই হেঁটেছেন। সাম্প্রতিককালের ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারও হয়তো সেই পথেই হাঁটছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মেসিকে ভিন্ন একটা রাস্তাতেই চলতে হয়েছে বাধ্য হয়ে।

খুব ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি নামক রোগের কারণে মেসির প্রতিশ্রুতিশীল ফুটবল প্রতিভা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে বসেছিল। তাঁর বয়সের স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে অনেক ছোট ছিলেন এসময়ের সেরা এই ফুটবলার। চিকিত্সার ব্যবস্থা থাকলেও মাসিক এক হাজার ডলারের ব্যয়বহুল চিকিত্সাভার বহন করতে সক্ষম ছিলেন না মেসির বাবা-মা বা আর্জেন্টিনার কোন ফুটবল ক্লাব। কিন্তু ছোট্ট এই ছেলেটির ফুটবল মেধা নজর এড়ায়নি স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনার। তারা এগিয়ে আসে মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার গড়া ও তাঁর চিকিত্সা ব্যয় বহনের জন্য। চুক্তি মেনে নিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্পেনে পাড়ি জমান লিও। এরপর শারিরীকভাবে ও একজন ফুটবলার হিসেবে তিনি বেড়ে ওঠেন বার্সেলোনার ফুটবলার তৈরির কারখানা ‘লা মেসিয়া ইয়ুথ একাডেমিতে।’ মেসির উচ্চতা এখন ১৬৯ সে.মি.। আর ফুটবলার হিসেবে তিনি নিজেকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন, সেটা অবশ্য এখনই জানা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে ব্যতিক্রমীভাবে মেসি কখনই আর্জেন্টিনার কোন ক্লাবে খেলার সুযোগ পাননি। জাতীয় দলের হয়ে তিনি খেলেছেন ঠিকই, কিন্তু সেটার পরিমাণ খুবই কম। বছরে খুব বেশি হলে হয়ত ১০টা ম্যাচ। তারও অনেকগুলো আবার হয়েছে দেশের বাইরে। আর ১৮ বছর বয়সে ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে জায়গা করে নিলেও এখন পর্যন্ত নিজ দেশের হয়ে বড় কোন শিরোপা জয়ের স্বাদ পাননি এই ফুটবল জাদুকর। ২০০৮ সালে আর্জেন্টিনার অলিম্পিক সোনা জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, কিন্তু অলিম্পিক ফুটবলের সাফল্য খুব একটা মূল্য বহন করে না তাঁর দেশের মানুষের কাছে।

বিপরীতে, বার্সেলোনার জার্সি গায়ে মেসির চোখ ধাঁধানো সাফল্যের তালিকাটা যথার্থই সাক্ষী দেয় যে, কেন তাঁকে এসময়ের সেরা ফুটবলার বলে বিবেচনা করা হয়। ২০০৪ সালে বার্সার প্রথম একাদশে জায়গা করে নেওয়ার পর তিনি ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতেছেন তিনবার। স্প্যানিশ লিগের শিরোপা জিতেছেন পাঁচবার। এছাড়াও তাঁর ঝুলিতে আছে দুইটা উয়েফা সুপার কাপ ও দুইটা ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা। ইউরোপের অন্য কোন ক্লাবই এই সময়ের মধ্যে এতগুলো সাফল্যের দেখা পায়নি।

২০১০ সালের শেষ ফুটবল বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের আটজন খেলোয়াড়ই খেলেন বার্সেলোনায়। এ থেকে স্প্যানিশ এই ক্লাবটির শক্তিমত্তা সম্পর্কে ভালোই আঁঁচ করা যায়। তবে বার্সেলোনার এত এত শিরোপা জয়ের পেছরে মেসির যে খুবই অগ্রণী ভূমিকা আছে, এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে আর্জেন্টাইন এই স্ট্রাইকারের গোল করা ও করানোর পরিসংখ্যান দেখলে। বার্সার জার্সি গায়ে ২৯৫টি ম্যাচ খেলে মেসি গোল করেছেন ২১২টা। ম্যাচপ্রতি গোল গড় ০.৭২। যেখানে ফুটবল বিশ্বে কারও গড় ০.৫০ হলেই সেটাকে অসাধারণ বলে বিবেচনা করা হয়। বার্সেলোনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের পর্তুগিজ স্ট্রাইকার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ২৩৭ গোল করেছেন ৪১১টি ম্যাচ খেলে। গোল গড় ০.৫৮। গোল করার এ ধরণের ক্ষমতার পাশাপাশি আরও একটা জিনিস মেসিকে অনন্য করে তুলেছে। সেটা হলো: গোল করাতেও তিনি সমান পারদর্শী। তাঁর অসাধারণ পাসিং দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে ২৯৫ ম্যাচে অন্যদের দিয়ে ৭৬টি গোল করিয়েছেন লিওনেল মেসি। আর এই সবকিছুর বাইরেও প্রায় প্রতি ম্যাচেই তিনি এমন এমন কিছু বিস্ময়কর ফুটবল প্রতিভার প্রমাণ দেন যে, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হয় ফুটবলপ্রেমীদের। ইংল্যান্ডের সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকারের ভাষায়, ‘আমি মেসির দিকে তাকিয়ে থাকি, আর দেখি যে, প্রতি ম্যাচেই সে অন্তত তিন-চারটা এমন কাজ করে যেগুলো আমি আমার পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারেও কখনও দেখিনি।’

কিন্তু এই একই মানুষটাই প্রায় নিস্প্রভ হয়ে থাকেন আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে। এখন পর্যন্ত নিজ দেশের পক্ষে ৫২টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন মাত্র ১৫টি। ম্যাচপ্রতি গোল গড় মাত্র ০.২৯। ফুটবল বোদ্ধারা মেসির এই ব্যর্থতার নেপথ্য কারণ হিসেবে অনেক ব্যাখ্যাই দাঁড় করিয়েছেন। অনেকেরই অভিমত, বার্সেলোনায় মেসি যেরকম স্বাধীনভাবে খেলতে পারেন, সেরকম খেলার সুযোগটা তিনি পাননা সাদা-আকাশী জার্সি গায়ে। তবে এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আর্জেন্টাইন ফুটবল সমর্থকদের কাছে অর্থহীন। বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পারফরমেন্সের আকাশ-পাতাল পার্থক্যটাই সবার নজরে আসে। আর এ থেকে অনেকে এমন সিদ্ধান্তও দাঁড় করিয়েছেন যে, তিনি দেশের চেয়ে ক্লাবকেই বেশি প্রাধান্য দেন। দেশের হয়ে হয়ত তিনি নিজের সেরাটা খেলেন না! সমর্থকদের এরুপ বিরুপ মন্তব্যই না, নিজ দেশের মাটিতে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের দুয়োধ্বনিও শুনতে হয়েছে এসময়ের সেরা ফুটবলারকে। গত বছরের জুলাইয়ে মেসির নিজ প্রদেশে আর্জেন্টিনা যখন কলম্বিয়ার সঙ্গে ড্র করে মাঠ ছেড়েছিল, তখন সমর্থকরা মেসিকে বিদ্রুপ করে ‘ম্যারাডোনা, ম্যারাডোনা’ বলে ডেকেছিল। সেই ম্যাচের কয়েকদিন আগেই মেসি বার্সার হয়ে স্প্যানিশ লিগ ও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতেছিলেন। সমর্থকরা তাই তাঁর উদ্দেশ্যে ‘মার্সেনারি! কাতালোনিয়ান!’ বলতেও ছাড়েনি।

কিন্তু মেসির যে নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসায় কোন ঘাটতি নেই, সেটা তিনি নিজেও অনেকবারই বলেছেন। এবং তা বেশ ভালোমতোই বোঝা যায় তাঁর আশেপাশের মানুষদের বিবরণী থেকে। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জেনারেল ম্যানেজার ও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের কোচ কার্লোস বিলার্দো মেসির এরকম একটা ব্যর্থ ম্যাচের কথা স্মরণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ম্যাচশেষে মেসি সাজঘরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল। সে শুধু কেঁদেই যাচ্ছিল, কেঁদেই যাচ্ছিল। আরেক স্ট্রাইকার ডিয়েগো মিলিতো আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কী করা উচিত্? তখন আমি বলেছিলাম, ওকে আরও কাঁদতে দাও। মেসি আর্জেন্টিনাকে এই পরিমাণে ভালোবাসে।’

আর্জেন্টিনার ফুটবল সমর্থকদের মন জয় করার জন্য মেসিকে কী করতে হবে, তা সবাই জানে। জয় করতে হবে বিশ্বকাপ শিরোপাটা। গতবার মেসিই ছিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ মিশনের প্রধান কাণ্ডারী। কিন্তু সেখানে সফলতা পাননি তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানীর কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে বিদায় নেওয়ার আগে পাঁচ ম্যাচে একটিও গোল করতে পারেননি লিওনেল মেসি। এখন অপেক্ষা ২০১৪ সালের পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের মাটিতে মেসি যদি আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জয়ের আনন্দে মাতাতে পারেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ-অনুযোগ নিশ্চিতভাবেই দূর হয়ে যাবে। আর্জেন্টাইন সমর্থকরা হয়তো ম্যারাডোনার মতো তাঁকেও ডাকবে ‘ফুটবল ঈশ্বর’ বলে। আর না পারলে হয়ত আরও অনেকদিন স্বদেশীদের ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণায় পুড়তে হবে লিওনেল মেসিকে।— টাইম ম্যাগাজিন অবলম্বনে

  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: