Archive for মার্চ, 2011

চীনে জনপ্রিয় ব্লগার নিঁখোজ!

চীনের জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্লগার ও বিশ্লেষক ইয়াং হেনজুনকে গত রবিবার থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভিন্নমত প্রকাশের জন্য চীনা সরকার তাঁকে আটক করেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। খুব দ্রুত তাঁর অবস্থান সম্পর্কে সবাইকে জানানোর জন্য চীনা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

চীনা বংশোদ্ভূত ইয়াং হেনজুন বর্তমানে একজন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক। গত রবিবার তিনি গুয়ানংজু এয়ারপোর্ট থেকে তাঁর ব্লগ পরিচালককে ফোন করে জানান যে, তিনজন লোক তাঁকে অনুসরণ করছে। এরপর থেকেই তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চীনা কর্তৃপক্ষই তাঁকে আটক করেছে বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছেন হেনজুনের ঘনিষ্ঠরা।

হেনজুনের এই নিঁখোজ হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অ্যামনেস্টির এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সহ পরিচালক ক্যাথরিন বাবের। তিনি বলেছেন, ‘হেনজুনের উধাও হওয়ার ঘটনাটা খুবই উদ্বেগজনক। গত কয়েক মাসে শান্তিপূর্ণ সংস্কারবাদী অনেক রাজনৈতিক কর্মী এভাবে উধাও বা গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন।’

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিক্ষোভ-বিদ্রোহে অনুপ্রাণিত হয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে চীনের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা অনলাইনের মাধ্যমে ‘জেসমিন বিপ্লবে’র ডাক দিয়েছেন। তারপর থেকেই ইন্টারনেটের উপর নিয়ন্ত্রণ ও অনলাইন প্রতিরোধ কর্মীদের উপর হয়রানির ঘটনা আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে গেছে।

এক মাস বিনা বিচারে আটক রাখার পর গতকাল ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে তত্পরতা’ চালানোর অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে চীনের আরেক জনপ্রিয় ব্লগার রান উনফেইয়ের বিরুদ্ধে। এখনও কমপক্ষে ২০ জন আইনজীবী, ব্লগার, প্রতিরোধকর্মী আটক আছেন বিনা বিচারে। ব্লগার গু চুয়ান এদের মধ্যে অন্যতম। তাঁকে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছে প্রায় এক মাস ধরে। তাঁর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছে অ্যামনেস্টি।

চীনা ভিন্নমতাবলম্বীকে মুক্তির আহ্বান অ্যামনেস্টির

চীনের গণতন্ত্রপন্থী সংগঠক লিউ জিয়ানবিনকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার জন্য চীনা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। চীনা সরকারের সমালোচনা করে ভিন্নমতাবলম্বী লেখালেখি করার জন্য জিয়ানবিনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগে চীনের শিনচুয়ান প্রদেশের একটি কোর্ট জিয়ানবিনকে এই সাজা দেয়। ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক তত্পরতা চালানোর জন্য এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তাঁকে কারাবন্দী করা হলো।

১৯৮৯ সালে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য জিয়ানবিন আড়াই বছর কারাবন্দী ছিলেন। এরপর ১৯৯০ সালে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে তত্পরতা’ চালানোর দায়ে আবারও তাঁকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নয় বছর কারাবন্দী থাকার পর তিনি মুক্তি পান।

২০০৮ সালে শেষবারের মতো কারামুক্তির পর তিনি চীনে আইনি ও রাজনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে ‘চার্টার ০৮’ প্রস্তাবে সাক্ষর করেন। নোবেল বিজয়ী লিউ জিয়াওবোও এই সংস্কার প্রস্তাবটির সহ-লেখক। চীনা সরকারের দমননীতির সমালোচনা করে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে তিনি অনেক পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেছেন।

অ্যামনেস্টির এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সহ-পরিচালক ক্যাথেরিন বাবের বলেছেন, ‘শুধু লেখালেখি করার জন্য ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়াটা একটা আতঙ্কজনক ব্যাপার। এবং বিচারব্যবস্থার নামে একটা প্রহসনও বটে। লিউ জিয়ানবিন কোন অপরাধেই অপরাধী নন। তিনি বন্দী হতে পারেন শুধু নিজের বিবেকের কাছেই। তাঁকে খুব দ্রুত মুক্তি দেওয়া উচিত।’ তিনি জিয়ানবিনকে কারাবন্দী করার এই ঘটনাটাকে বর্ণনা করেছেন ‘কোন বার্তার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার বদলে বার্তাবাহককেই গুলি করে ফেলা’ হিসেবে।

লিবিয়ায় আটককৃত সাংবাদিকদের মুক্তির আহ্বান অ্যামনেস্টির

লিবিয়ায় আটককৃত আল জাজিরা টেলিভিশনের চার সাংবাদিককে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। চার সপ্তাহ আগে লিবিয়া ছেড়ে আসার সময় তিউনিসিয়া বর্ডারের কাছে জান্তান থেকে এই দুইজন সংবাদদাতা ও দুইজন ক্যামেরাম্যানকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহেই আল জাজিরার ক্যামেরাম্যান হাসান আল জাবের গুলিতে নিহত হয়েছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার পরিচালক ম্যালকম স্মার্ট বলেছেন, ‘এটা লিবিয়ায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হুমকির মুখে পড়ার সর্বশেষ উদাহরণ। ত্রিপোলিতে লিবিয়ান কতৃপক্ষের অবশ্যই এই সাংবাদিকদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদেরকে যে কোন রকম নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।’

এই দুইজন সংবাদদাতা হলেন আহমেদ ভাল ওয়ালদ এডিন (৩৪) ও তিউনিসিয়ার লুতফি আল মাসৌদি (৩৪)। ক্যামেরাম্যান দুজন হলেন নরওয়ের আমমার আল হামদান (৩৪) ও যুক্তরাজ্যের আমমার আল তালৌ। ধারণা করা হচ্ছে যে লুতফি আল মাসৌদিকে ত্রিপোলিতে আটক করা হয়েছে।

লিবিয়ায় বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকেই অনেক সাংবাদিক হুমকির মুখে রয়েছেন। দুই সপ্তাহ আগে বিবিসির তিনজন সাংবাদিককে আটক করে নির্যাতন করে গাদ্দাফির অনুসারীরা। যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ানের সাংবাদিক গেইথ আব্দুল আহাদকেও ১৫ দিন আটক রাখার পর গত সপ্তাহে মুক্তি দেওয়া হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তিন সাংবাদিককেও ছয়দিন আটক রাখার পর গতকাল মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

‘ইংল্যান্ডকে হারাতেই হবে’

মাত্র কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্নে একটা বড়সড় আঘাত দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শুধু আঘাত বললেও কম বলা হয়। দেশের যে কোন চরম ক্রান্তিকালিন পরিস্থিতির সঙ্গেই তুলনা দেওয়া যেতে পারে সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির। মাত্র ৫৮ রানেই অলআউটের লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। সমর্থকরা হতাশা চেপেও রাখতে পারেন নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিম বাসে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে কলঙ্কিত করে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রীড়া অঙ্গনের ভাবমুর্তি। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজই কিনা হয়ে গেল বাংলাদেশের পরম মিত্র! যে কোমার রোচ, সুলেমান বেনদের নির্মম আঘাতে বাংলাদেশ ধুলোয় লুটিয়েছিল, তারা আবারও তেমনভাবেই জ্বলে উঠুক, ক্রিস গেইল, কাইরন পোলার্ডরা ব্যাটে ঝড় তুলুক, এটাই এখন বাংলাদেশ সমর্থকদের একান্ত প্রার্থনা। ইংল্যান্ডকে যে হারাতেই হবে!

‘বি’ গ্রুপ থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার হিসাব-নিকাশটা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ইতিমধ্যেই পা রেখেছে শেষ আটের আঙ্গিনায়। ভারতেরও কোয়ার্টার ফাইনাল প্রায় নিশ্চিতই বলা যায়। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে বাংলাদেশ, উইন্ডিজ আর ইংল্যান্ডের মধ্যে। কাগজে-কলমে তিন দলেরই জোর সম্ভাবনা আছে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার। কিন্তু এত হিসাব-নিকাশের খাতা খুলে বসে থাকতে হবে না যদি আগামীকাল ইংল্যান্ডকে হারের স্বাদ দিতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। উপমহাদেশে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ থেকে একেবারেই শূণ্য-রিক্ত হাতে ফিরে যেতে হবে এ অঞ্চলের এককালীন শাসক ইংল্যান্ডকে। তারচেয়েও বড় কথা, নিশ্চিত হয়ে যাবে বাংলাদেশের পরবর্তী রাউন্ড। এরকম অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষ তো স্যামি, গেইল, ব্রাভোদের পেছনে দাঁড়াবেই।

ঢাকার এক হোটেল কর্মকর্তা এনামুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সমর্থন দেব। ইংল্যান্ডকে হারাতেই হবে।’ শুধু এনামুর রহমানই না, বাংলাদেশের ক্রিকেট পাগল কোটি কোটি মানুষের মুখে এখন একই কথা। ‘ইংল্যান্ডকে হারাতে হবে।’ অতি উত্সাহী দু-একজন তো বলছেন, ‘ইস, খেলাটা যদি বাংলাদেশে হতো, গলা ফাটিয়ে চিত্কার করেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জিতিয়ে দিতাম।’ একেবারে কিন্তু ফেলেও দেওয়া যায় না কথাটা। বাঙ্গালীর গলার জোরের পরিচয় কিন্তু ইংল্যান্ড কয়েকদিন আগে ভালোমতোই পেয়েছিল!

তবে সমর্থকদের ভাবনা যাই হোক, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিশ্চয়ই শুধু অপরের দিকে তাকিয়েই দিন পার করছেন না। ইতিমধ্যেই তাঁরা নিশ্চয়ই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের জন্য জোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২ উইকেটের অসাধারণ জয় দিয়ে নিজেদের সামর্থ্য তো ভালোমতোই প্রমাণ করেছেন সাকিব-তামিমরা। হল্যান্ডের বিপক্ষেও খেলেছেন অনেক পরিণত ক্রিকেট। কাজেই গত বিশ্বকাপের মতো এবারও প্রোটিয়া-বধের স্বপ্ন তো বাংলাদেশ দেখতেই পারে। অধিনায়ক সাকিব আল হাসান বলেছেন, ‘আমরা ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটার দিকে খুব আগ্রহভরে তাকিয়ে থাকব। এটা ঠিক। কিন্তু আমাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই গড়ে নিতে হবে। আসল কথা হলো, দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে হবে।’ বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভরসা আব্দুর রাজ্জাকও গলা মিলিয়েছেন অধিনায়কের সঙ্গে। বলেছেন, ‘দলের সবাই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটার দিকেই তাকিয়ে আছে। কেউই পয়েন্ট তালিকার জটিল হিসাব-নিকাশ নিয়ে ভাবছে না। আমরা পরের ম্যাচটা জিতেই কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে চাই।’

আগামীকালের ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলাটা বাংলাদেশের না হয়েও এক অর্থে বাংলাদেশেরই। গোটা খেলাটার উপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সম্ভাবনা। ১২ দিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল এদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে ক্ষুব্ধ ক্রিকেট পাগল সমর্থকদের হতাশার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখেছে। আতঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু তারপর “We are Sorry” লেখা প্ল্যাকার্ডগুলোও তো দেখেছে। আর এবার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণঢালা শুভকামনা আর ভালোবাসাও নিশ্চয়ই উইন্ডিজ ক্রিকেটাররা দেখছেন। ক্রিস গেইলরা কী এই ভালোবাসার প্রতিদান দেবেন না?

শফিউলের স্বপ্নযাত্রা

মাত্র দুই বছর আগেও হয়তো বাংলাদেশ জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়াটা একটা স্বপ্নই ছিল শফিউল ইসলামের কাছে। ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের জার্সি পরে পাড়ায় পাড়ায় ক্রিকেট খেলতেন আর স্বপ্ন দেখতেন, একদিন হয়তো সত্যিকারের জাতীয় দলের জার্সিটাই গায়ে উঠবে। সেই স্বপ্নটা আজ বাস্তব। এতটাই জলজ্যান্ত বাস্তব যে পুরো বাংলাদেশই শামিল হয়েছে তাঁর এ স্বপ্নযাত্রায়। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখিয়ে তিনি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের চোখেই পুরে দিয়েছেন রাশি রাশি স্বপ্ন।

বিশ্বকাপের শুরুটা অবশ্য খুব একটা ভালো হয়নি শফিউলের। ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটায় খুব বেশি কিছু আসলে করারও ছিল না তাঁর। শেবাগ, টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলিদের দুর্দমনীয় ব্যাটিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি বাংলাদেশের এ তরুণ পেসার। শেবাগের ক্যারিয়ার-সেরা ইনিংসের দিনে অসহায় হয়েই থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ৭ ওভার বল করে দিয়েছিলেন ৬৯ রান। ভারতীয় ইনিংসের শেষ বলে সান্ত্বনা হিসেবে পেয়েছিলেন ইউসুফ পাঠানের উইকেটটা। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে চমত্কারভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন শফিউল। আগে ব্যাট করে ২০৫ রানেই গুটিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ যখন হারের শঙ্কায় দুলছে, সেই মুহূর্তেই জ্বলে উঠলেন তিনি। শেষ পাঁচ ওভারে মাত্র ১১ রান দিয়ে তুলে নিলেন চারটি উইকেট। বাংলাদেশকে এনে দিলেন ২৭ রানের অসাধারণ এক জয়। পুরো দেশকে মাতালেন বিশ্বকাপ উন্মাদনায়।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরের ম্যাচটা নিয়ে বলার কিছুই নেই। পুরোটাই একটা দুঃস্বপ্ন হয়েই থেকে গেছে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে। সেই ম্যাচে তিনি বলও করেছিলেন মাত্র দুই ওভার।

চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবারও চলা শুরু করল শফিউলের স্বপ্নরথ। এবার তিনি নিজেকে চেনালেন নতুন করে। ইংল্যান্ডের ছুড়ে দেওয়া ২২৬ রান তাড়া করতে নেমে ১৬৯ রানেই ৮ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন দিশেহারা। অনেকেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন স্টেডিয়াম থেকে। হার নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন প্রায় সবাই। কিন্তু এবার ঝলসে উঠল শফিউলের ব্যাট। নবম উইকেট জুটিতে মাহমুদউল্লাহ সঙ্গে ৫৮ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে বাংলাদেশকে উপহার দিলেন এক মহাকাব্যিক জয়। খেললেন ২৪ বলে ২৪ রানের এক লড়াকু ইনিংস। ফিরিয়ে আনলেন গত বছর ব্রিস্টলে ইংল্যান্ড বধের স্মৃতি। জোরদার করলেন টাইগারদের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা।

আগের ম্যাচগুলোতেই নিজেকে অপরিহার্য হিসেবে প্রমাণ করার কাজটা ভালোভাবে করে ফেলেছিলেন শফিউল। কিন্তু তিনি থামলেন না এখানেই। গতকাল হল্যান্ডের বিপক্ষে দেখা গেল অন্য এক শফিউলকে। এতটাই পরিণত বোলিং করলেন যে কখনো কখনো মনে পড়ে গেল ম্যাকগ্রা-ডোনাল্ডদের নিখুঁত লাইন-লেংথের কথা। কোনো উইকেট না পেলেও হল্যান্ডকে মাত্র ১৬০ রানে বেঁধে ফেলার পেছনে তাঁর ১০টি ওভারের মূল্য কোনো অংশেই কম না। ৯.২ ওভার বল করে তিনি দিয়েছিলেন মাত্র ১৫ রান। ম্যাচ শেষে হল্যান্ড অধিনায়ক পিটার বোরেনকেও আলাদাভাবে স্বীকার করতে হয়েছে শফিউলের বোলিং নৈপুণ্যের কথা। বলেছেন, ‘শফিউল আজ খুবই চমত্কার বোলিং করেছে। কোনো খারাপ বল করেনি। আমরা রান বের করার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। আমরা আসলে অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। সে কোনো উইকেট পায়নি বটে, কিন্তু তার বেশ কয়েকটি উইকেটই প্রাপ্য ছিল।’

তবে শফিউলের এ দুর্দান্ত পারফরমেন্সের পর অনেকেরই আফসোস একটাই। সবগুলো ম্যাচে বাংলাদেশ তাঁর হাত ধরে জয় পেলেও কোনো ম্যাচেই ম্যাচ-সেরার পুরস্কারটা ওঠেনি এই পেসারের হাতে। শফিউল নিজে অবশ্য এতে কিছুই মনে করছেন না। গতকাল হল্যান্ডের বিপক্ষে ছয় উইকেটের জয়ের পর তিনি বলেছেন, ‘ঠিক আছে। এটা কোনো ব্যাপার না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা জিততে পেরেছি। ম্যাচ-সেরার পুরস্কারটা তো শুধুই একটা অলংকার।’

শফিউলের এ স্বপ্নযাত্রা অব্যাহত থাকুক, এটা বোধহয় শফিউলের চেয়েও এখন বাংলাদেশের মানুষই আরও বেশি করে চায়। ওয়েবসাইট।

ধোনির আফসোস

বিশ্বকাপের শুরু থেকেই অনেকের চোখ ছিল হরভজন সিংয়ের দিকে। উপমহাদেশের স্পিনারবান্ধব উইকেটে ভারতের শিরোপা জয়ের লক্ষ্য পূরণে এই অফস্পিনার একটা ভালো ভূমিকা পালন করতে পারবেন এমনটাই আশা করেছিলেন সবাই। কিন্তু প্রথম চার ম্যাচে সবাইকে হতাশই করেছিলেন ‘ভাজ্জি’। পেয়েছিলেন মাত্র ২ উইকেট। কিন্তু গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফিরেছিলেন পুরোনো রুপে। একটু খরুচে প্রমাণিত হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার তিন বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান হাশিম আমলা, ডি ভিলিয়ার্স ও জে পি ডুমিনির উইকেট তুলে নিয়ে জয়ের আশা জাগিয়েছিলেন ভারতীয় শিবিরে। কিন্তু শেষটা আশানরুপ হলো না হরভজনের। টেন্ডুলকারের অনবদ্য শতকের মতো বৃথা গেল তাঁর এই প্রত্যাবর্তনও।

শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে দুই উইকেটের জয় দিয়ে ভারতীয় শিবিরকে হতাশায় ডোবালেন প্লেসিস, পিটারসেনরা। হতাশাটা হয়তো হরভজনের আরেকটু বেশিই হতে পারে। শেষ ওভারে ধোনি যদি বলটা আশিস নেহরার হাতে না দিয়ে তাঁর হাতে দিতেন, তাহলে হয়তো শেষ হাসিটা তাঁরাই হাসতে পারতেন। কী হতে পারত, এ নিয়ে আলাপ করে অবশ্য এখন খুব বেশি লাভ নেই। কিন্তু শেষ ৬ বলে যখন ১৩ রান দরকার, সেসময় হরভজনকে বোলিংয়ে না এনে, নেহরাকে দিয়ে বল করানোর সিদ্ধান্তটা অনেককেই অবাক করেছে। সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে ভারতীয় অধিনায়ককে। ম্যাচ শেষে তাই আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না ধোনির। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ধোনির সাফাই, ‘শেষ ওভারের জন্য আশিসই উপযুক্ত ছিল। সে ভালো বোলিং করেছিল। আমি ভেবেছিলাম তাকে দিয়েই কাজ হবে। আমাকে এই সিদ্ধান্তের জন্য দোষারোপ করতে পারেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, পেসার দিয়েই আমাদের জয়ের কাজটা ভালোভাবে হবে।’

ধোনির আফসোস শুধু এই একটা জায়গাতেই না। ব্যাটিংয়েও তাঁর আস্থার প্রতিদান দিতে পারেন নি সতীর্থরা। শচীনের ৪৮তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি, শেবাগের ৭৩ ও গৌতম গম্ভীরের ৬৯ রানের লড়াকু ইনিংসের সুবাদে মাত্র ৪০ ওভারেই ভারতীয় স্কোরবোর্ডে যুক্ত হয়েছিল ২৬৮ রান। সবাই ভাবছিলেন ভারতের রান বুঝি ৩৫০ ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু শেষ ১০ ওভারে শুধু আসা-যাওয়াই করেছেন বাকি ব্যাটসম্যানরা। উইকেটের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে শুধু আফসোসই করতে হয়েছে ধোনিকে। ১০ বল বাকি থাকতে ২৯৬ রানেই গুটিয়ে যাওয়ার পর শুধু হতাশ হওয়া ছাড়া আক্ষরিক অর্থেই আর কিছুই করার ছিল না তাঁর। মাঠ ছেড়েছেন ১২ রানে অপরাজিত থেকে। শেষ তিন ওভারে মাত্র চার রানের বিনিময়ে পাঁচটি উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কারটা ঝুলিতে ভরেছেন ডেল স্টেইন। ভারতকে দিয়েছেন এবারের বিশ্বকাপের প্রথম পরাজয়ের স্বাদ।

ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের দুইটা বড় ম্যাচেই একেবারে শেষমুহূর্তে জয়বঞ্চিত হতে হয়েছে ভারতকে। গতকাল ম্যাচটা জিততে পারলে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিতই করে ফেলতে পারত ধোনি-বাহিনী। এই হারের ফলেও হয়তো শেষ আটে যাওয়া আটকাবে না স্বাগতিকদের। কিন্তু বড় দলগুলোর বিপক্ষে এই শেষ মুহূর্তের আফসোসগুলো নিয়ে সত্যিই ভাবতে হবে ধোনিকে। রয়টার্স

ফিরে আসুক ব্রিস্টলের স্মৃতি

বাঁচা-মরার লড়াইয়ে আজ চট্টগ্রামের জহুরুল হক স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গত ম্যাচের ভয়াবহ লজ্জার দুঃসহ স্মৃতি মুছে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়েই নিশ্চয়ই মাঠে নামবেন সাকিব-তামিমরা। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষও সেই প্রত্যাশা নিয়েই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ সাফল্যের পর এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিটের তকমা আাঁাটা ইংল্যান্ড এখনও পর্যন্ত খুব বেশি সুবিধা করে উঠতে পারে নি। ভারতের সঙ্গে টাই আর আয়ারল্যান্ডের কাছে হারের পর বেশ টলোমলো অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল স্ট্রাউস বাহিনী। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ খেলাটাতে তারা শেষপর্যন্ত হারতে হারতেও পেয়েছে ৬ রানের অবিশ্বাস্য জয়। তার উপর পিটারসেন আর স্টুয়ার্ট ব্রডের ইনজুরিতেও কিছুটা ছন্দপতন হতে পারে ইংল্যান্ড শিবিরে।

চট্টগ্রামের জহুরুল হক স্টেডিয়ামে এই বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচটা প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফ্লাডলাইটের আলোয়। দিবা-রাত্রির এই গুরুত্বপূর্ণ লড়াইটার ক্ষেত্রে টসে জিতে ব্যাট করতে পারাটা একটা বাড়তি সুবিধা আনতে পারে বলে ধারণা করছেন ক্রিকেট বোদ্ধারা। গতকাল দুপুরে অনুশীলনের সময় বেশ কিছুক্ষণ ধরে চট্টগ্রামের হালকা বাদামী এই উইকেটটা পর্যবেক্ষণ করেছেন ইংলিশ অধিনায়ক অ্যান্ডি স্ট্রাউস, বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ, গ্রান্ড ফ্লাওয়াররা। স্পিনাররা এই পিচে নিশ্চিতভাবেই একটা বড় ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করছেন অনেকে। সেক্ষেত্রে পিটারসেনের অফ স্পিনের অভাবটা কিছুটা টের পেতে পারেন স্ট্রাউস। আজ জিততে পারলেই কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটটা অনেকখানিই নিশ্চিত করে ফেলতে পারবে ইংলিশরা।

অন্যদিকে বাংলাদেশের লড়াইটা প্রত্যাবর্তনের। ভয়াবহ দুঃসময়ের ঘোর কাটিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। আজ নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে গত বছর ব্রিস্টলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ রানের সেই অসাধারণ জয়। সেই ম্যাচের জয়ের নায়ক মাশরাফি-বিন-মোর্তজাকে অবশ্য আজ মাঠে পাওয়া যাবে না। তবে এবারের ম্যাচটা কিন্তু হতে যাচ্ছে নিজেদের মাঠে। সাকিবরা পাশে পাবে বাংলাদেশের হাজার হাজার দর্শককে। এটাও নিশ্চয়ই বাড়তি শক্তি জোগাবে বাংলাদেশ শিবিরে।

আব্দুর রাজ্জাক, সাকিব আল হাসানের স্পিন আক্রমণ দিয়ে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের অল্প রানেই বেঁধে ফেলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। কিন্তু টাইগারদের প্রধান দুশ্চিন্তার জায়গা নড়বড়ে ব্যাটিং অর্ডার। প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ২৮৩ রানের বড় স্কোর গড়ে আশা জাগালেও পরের দুইটা ম্যাচে শুধু ভয়াবহ হতাশাই উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। কোচ জিমি সিডন্সও গতকাল অনুশীলনে আলাদাভাবে সময় দিয়েছেন ইমরুল কায়েস, জুনায়েদ সিদ্দিকীদের। আজ মিডলঅর্ডারে আশরাফুলের পরিবর্তে মাঠে নামতে পারেন মাহমুদুল্লাহ। সেক্ষেত্রে বোলার মাহমুদুল্লাহর থেকে ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহর উপরই প্রত্যাশাটা বেশি থাকবে বাংলাদেশ সমর্থকদের।

গত বছর ব্রিস্টলে ইংল্যান্ডকে হারিয়েই টেস্ট খেলুড়ে সবগুলো দেশকে পরাজয়ের স্বাদ দেওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল টাইগাররা। আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের অসময়ে আবারও সেই ব্রিস্টলের মধুর স্মৃতিটাই ফিরে আসুক— এই আশাতেই প্রহর গুনছে গোটা বাংলাদেশ।

আকমলের সর্বনাশা ভুল!

শোয়েব আকতার-আফ্রিদির হতাশ মুখগুলোই বলে দিচ্ছে কামরান আকমলের সর্বনাশা ভুলটার কথা।

পাকিস্তানের ১১০ রানের হারটার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কার? রস টেলরের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের নাকি কামরান আকমলের অবর্ণনীয় বাজে উইকেট কিপিংয়ের? শূণ্য ও চার রানের মাথায় টেলরের দুইটা অতি-সহজ ক্যাচ আকমল না ফেলে দিলে ম্যাচের পরিস্থিতিটা যে অন্যরকম হতো একথা হলফ করেই বলা যায়। পাকিস্তানি সমর্থকরা এখন হয়তো গালাগালি ছাড়া আকমলের নাম উচ্চারণই করতে পারবেন না। তবে খুব ভদ্র-বিনয়ী ভাষায় আকমলের গতকালের পারফরমেন্সটা বর্ণনা করেছেন ইয়ান চ্যাপেল, ‘আকমল উইকেটের পেছনে যে কীর্তিগুলো করেছে, সেটা ডন ব্রাডম্যানের মতো ব্যাটিং করেও পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব না।’

গতকাল ক্যান্ডিতে শুরুটা বেশ ভালোমতোই করেছিল পাকিস্তান। ১৩ ওভারের মধ্যেই মাত্র ৫৫ রানেই তুলে নিয়েছিল ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ও জেমি হাউয়ের উইকেট। কিন্তু ১৪তম ওভারটাতেই পাকিস্তানকে দুঃস্বপ্নের চাদরে মুড়ে দিলেন কামরান আকমল। শোয়েব আকতারের দ্বিতীয় বলে টেলরের ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে গেল আকমল আর স্লিপে দাঁড়ানো ইউনুসের মাঝখান দিয়ে। দুই বল পর এবার যেন টেলরকে জন্মদিনের উপহার দিলেন আকমল। ক্যাচটা ধরেও আবার ফেলে দিলেন মাটিতে। দুই দুইবার জীবন পেয়ে বার্থডেবয় রস টেলর হয়ে উঠলেন দুর্দমনীয়। খেললেন ১২৪ বলে ১৩১ রানের দানবীয় এক ইনিংস। শেষ চার ওভারে জ্যাকব ওরামকে সঙ্গে নিয়ে স্কোরবোর্ডে যোগ করলেন ৯৪ রান। ম্যাচ নিয়ে গেলেন পাকিস্তানের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

৩০৩ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে অবর্ণনীয় ভুলগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া তো দূরে থাক, কামরান আকমল পাকিস্তান সমর্থকদের আরো হতাশ করে সাজঘরে ফিরলেন মাত্র ৮ রান করে। পাকিস্তান হারল ১১০ রানের বিশাল ব্যবধানে। ম্যাচ শেষে এই বাজে পারফরমেন্সের জন্য কোন অজুহাতও খুঁজে পেলেন না আফ্রিদী। বললেন, ‘আমার কোন অজুহাত নেই। আমরা ভালো বল করতে পারি নি। ভালো ফিল্ডিংও করতে পারি নি।’

কামরান আকমলের এই ধরণের কীর্তি কিন্তু এবারই প্রথম না। গত বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিডনি টেস্টেও একই রকমের কাণ্ড করেছিলেন এই পাকিস্তানি উইকেট রক্ষক। সেবার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনবার ফেলেছিলেন মাইক হাসির ক্যাচ। সে ম্যাচেও ১৩৪ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়াকে ৩৬ রানের জয় এনে দিয়েছিলেন হাসি। সেই ম্যাচ শেষে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগও উঠেছিল আকমলের বিরুদ্ধে। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ক্রিকেটটা ভালোবেসেই খেলি। টাকার জন্য না। আমি অস্ট্রেলিয়াকে জেতানোর জন্য ক্যাচ ফেলি নি। এগুলো ঘটেই থাকে। ক্রিকেটে সব দিনই সমান যায় না।’ হ্যাঁ, আকমলের কথা ঠিকই। সব দিন সমান যায় না। তবে ভুলগুলো কী একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না কামরান আকমলের? আর তাঁর সর্বনাশা ভুলগুলোর মাশুল কিভাবে দিতে হয়, সেটাও নিশ্চয়ই খুব ভালোমতোই টের পাচ্ছেন তিনি।— দ্য টেলিগ্রাফ

আমরা এই আকালেও স্বপ্ন দেখি

আবারও আমার সেই বন্ধুর একটা উক্তি দিয়েই শুরু করি। ৫১ রানে ছয় উইকেট পড়ে যাওয়ার পর সে বলল, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যদি দুই দিন মাঠে ঘাম ঝড়িয়ে প্রাকটিস না করে, শুধু ঘরে বসে গত মাচটা জেতার পর মানুষের বাধভাঙ্গা উচ্ছাসের ভিডিওগুলো দেখত, তাহলেও তারা অন্তত ১৫০টা রান করত’।

তখনো পর্যন্ত চরম আশাবাদীরা বুক বেঁধেছিলেন ১৫০ না হোক, অন্তত তিন অঙ্কের কোটাটা ‘টাইগার’রা পার করতে পারবে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নদীটা পুরোপুরি পার না হতে পারলেও নাঈম, আশরাফুল, রাজ্জাকরা হয়তো তরীটা তীরের কিছুটা কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারবেন। আর তখনো তো উইকেটে আশরাফুল ছিলেন। তিনি যে আমাদের অনেক ভরসার প্রতীক! কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। তরীটা ডুবল। খুব বিশ্রীভাবেই ডুবল। আমাদের আশা-ভরসা, মান-সম্মান, আস্থা, গর্ব-অহঙ্কার সবকিছুরই সলীল সমাধি ঘটল ‘টাইগার’দের উইকেট বৃষ্টির তোড়ে। আর ধীরে ধীরে ঘনিয়ে এল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারতম দিন। ক্ষুব্ধ-বাকহীন বাংলাদেশের সমর্থকরা দিশেহারা হয়ে গেল। হতাশা প্রকাশের ভাষা না পেয়ে তারা কিছুটা বাড়াবাড়িই করে ফেলল। কয়েক জায়গায় ভাঙচুর-পোস্টার ছেড়া এগুলো না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু উইন্ডিজ ক্রিকেট বাসে ইট পাটকেল ছোড়াটা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য না। আমরা নিশ্চয়ই চাই না, আমাদের ক্রিকেট অঙ্গনটাও পাকিস্তানের মতো হয়ে যাক।

তবে এটাকে শুধুই উশৃঙ্খল কিছু মানুষের হঠকারি কার্যকলাপ বলে এককথায় নিন্দা প্রকাশ করে উড়িয়ে দেওয়াটাও বোধহয় উচিত হবে না। এই ক্ষোভের উত্স কী? এই প্রশ্নটাও সম্ভবত তোলার সময় এসেছে।

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা জয়ের পেছনে সাকিব-শফিউলদের ক্রীড়ানৈপুনের সাথে সাথে মিরপুরের গ্যালারিভর্তি দশকেরও যে একটা বিশাল ভূমিকা ছিল, এটা নিশ্চয়ই সবাই সমর্থন করবেন। এমনকি অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও তো ম্যাচ পরবতী সংবাদ সম্মেলনে সে কথা স্বীকার করেছিলেন। ও’ব্রায়েনদের একেকটা উইকেট পতনের পর যেন সাকিবদের পক্ষ থেকে সত্যিই হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মানুষ। সে ম্যাচেও কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং শেষে হার নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু তবুও শেষ পর্যন্ত তারা সাহস ধরে রেখেছিলেন। চিত্কার করে, প্রার্থনা করে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের।

কিন্তু গতকাল তো মানুষ ‘টাইগার’দের পেছনে দাড়ানোর কোন সময়ই পেল না। চিত্কার করে সাহস জোগানোর সুযোগই পেল না। সূয অস্ত না যেতেই শেষ হয়ে গেল দিবা-রাত্রির এই অতি গুরুত্বপূণ লড়াই। যে মানুষগুলো রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকিট জোগাড় করেছিল, বা অনেক আয়োজন করে খেলা দেখার পরিকল্পনা করেছিল, খেলা শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা যে কী পরিমাণ হতাশ হয়েছিলেন, সেই ভাষা বোঝার ক্ষমতা কী আমাদের আছে? বাংলাদেশের ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের বোধহয় সেই ভাষাটা অনুবাদ করা দরকার। প্রতি ম্যাচে মাঠে নামার আগে বোধহয় তাদের সবার আগে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কথা ভাবা দরকার। যাদের হাসি-কান্না একদম ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে সাকিব-তামিমদের ব্যাট-বলের সঙ্গে। যারা তামিমদের একটা চারের মার দেখে অবর্ণনীয় খুশিতে ভেঙ্গে পরে। আবার উইকেট পতনের সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ বাড়িয়ে ফেলে। আমাদের ‘টাইগার’রা কিন্তু সত্যিই আগামী ম্যাচগুলোর আগে এই প্রতিক্রিয়াগুলোর ভিডিও দেখে নিতে পারেন। কাজে লাগলেও লাগতে পারে।

কারণ এখনো তো আমাদের বিশ্বকাপটা শেষ হয়ে যায় নি। অনেকখানিই ফিকে হয়ে গেছে, এটা ঠিক। কিন্তু এখনো গ্রুপ পর্বের আরো তিনটা খেলা বাকিই থেকে গেছে। সাকিবরা নিশ্চয়ই এই লজ্জার তীব্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। এটাই প্রার্থনা। আর আশার কথা হলো এত ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তেও বাঙ্গালী তার রসবোধ হারায় নি। বাংলাদেশ মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর শাহবাগ মোড়ে দুইটা মেয়েকে খুব সেজেগুজে রিকশায় যেতে দেখে একজন বলে উঠল, ‘সামনে য্যায়েন না রে আপা, ‘টাইগার’রা খারায় আছে’! ঐ বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বিচারেও কী এটাকে ইভ টিজিং বলবেন? তারচে বরং আপাতত ঐ আপাদের জায়গায় আমরা স্ট্রাউস, গ্রায়েম স্মিথ বা পিটার বোরেনদের নাম বসিয়ে দিতে পারি। লজ্জায় নীল, শোকে পাথর ‘টাইগার’রা এবার ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠবে, এই আশা তো আমাদের থাকতেই পারে। আর সর্বনিম্ন রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার এত লজ্জা, এত কলঙ্ক, হতাশার পরও তো দেখলাম একজন বলছেন, ’সাকিব তোমরা এগিয়ে যাও। হারলেও তোমাদের সাথে আছি. জিতলেও সাথে আছি।’ সাকিব-তামিমরা শুনতে পাচ্ছেন তো?

‘সাবধান ভারত, আগামীতে তোমরাই!’

অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র লগনের কথা নিশ্চয় মনে আছে অনেকের। ছবিটির নায়ক আমির খানের নেতৃত্বে ক্রিকেটের মাঠে ব্যাট-বলের লড়াই দিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচার-শোষণের প্রতিশোধ নিয়েছিল ভারতের একটি গ্রামের অধিবাসীরা। রুপালি পর্দার মতো নাটকীয়তা না থাকলেও গত বুধবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আয়ারল্যান্ডের জয়টা কিন্তু কম রোমাঞ্চকর ছিল না। ভারতের মতো আয়ারল্যান্ডও দীর্ঘদিন ছিল ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। রূপকথার মতো জয়টা দিয়ে যেন তারা লগন ছবির মতোই তাদের সাবেক শাসকদের একটু চোখ রাঙিয়ে নিল। বুঝিয়ে দিল, এককালে তোমরা আমাদের অধীন করে রাখলেও, এখন আমরাও পারি তোমাদের দমিয়ে দিতে। পরের সবগুলো ম্যাচ হেরে দেশে ফিরলেও আইরিশ ক্রিকেটাররা যে নায়কোচিত সংবর্ধনা পাবেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, তাঁরা খুব ভালোমতো চপেটাঘাত করতে পেরেছে ইংলিশদের জাত্যাভিমানে। এক আইরিশ সমর্থক বলেছেন, ‘আমরা যদি বিশ্বকাপের বাকি সবগুলো ম্যাচে হেরেও যাই, তাতে কিছুই যায় আসে না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, আমরা হারাতে পেরেছি ইংলিশদের।’ শুধু এ একটা ম্যাচ দিয়েই আইরিশদের এবারের বিশ্বকাপ মিশন পুরোপুরি সফল বলে মন্তব্য করেছে অনেক সমর্থক। বাকি যা পাওয়া যাবে সেটা উপরি পাওনা। সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেকাংশে পূরণ হয়ে গেলেও পোর্টারফিল্ড, ও’ব্রায়েনরা হয়তো তাদের স্বপ্নের গণ্ডি আরও কিছুটা বাড়িয়ে নিয়েছেন ঐতিহাসিক এ জয়ের পর। আর যেভাবে তারা ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করেছে, তাতে সেই প্রত্যাশাটা খুব অন্যায্যও বলা যাবে না। বিশ্বকাপে আইরিশদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ ভারত। একটা দিক দিয়ে মানসিকভাবে খুব কাছাকাছি আছে ভারতীয় উপমহাদেশ ও আয়ারল্যান্ডের মানুষেরা। এ দুই অঞ্চলের মানুষই ইংল্যান্ডের অন্যায়-অন্যায্য বঞ্চনার শিকার হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। গত বুধবার বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামেও টের পাওয়া গেছে এ নৈকট্যটা। ও’ব্রায়েনের বাউন্ডারিগুলোর পর আইরিশদের সঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করতে দেখা গেছে ভারতীয়দেরও। খেলা শেষে এক আইরিশ সমর্থক ভারতীয়দের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘তারা খুবই ভালো, খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ।’ মানসিক দিক দিয়ে নৈকট্য থাকলেও মাঠে কিন্তু কেউই কাউকে ছাড় দেবে না। সেদিন কিন্তু এই চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামেই দুই দিকে থাকবে আয়ারল্যান্ডের ‘গ্রিন আর্মি’ আর ভারতীয় সমর্থকেরা। ইংল্যান্ড বধ করার পর এবার মহেন্দ্র সিং ধোনিদের দিকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন এক আইরিশ সমর্থক। ‘সাবধান ভারত, পরবর্তীকালে তোমরাই!’ সত্যিই কিন্তু সাবধান হতে হবে ধোনিদের। ক্রিকইনফো।