আশরাফুল নাকি আশার-ফুল?

‘তোমার উপর আমার বিরক্তির মাত্রাটা চরমে উঠল, যখন দেখলাম আশরাফুল রাজু ভাস্কর্যে আউট হয়েও টিএসসির সামনে ব্যাট করছে।’- বাংলাদেশের ব্যাটিং শেষে আমার এক বন্ধু মাথার চুল ছিড়তে ছিড়তে কাকে যেন এ কথাটা বলেছিল।

শাহবাগ এলাকায় খেলা দেখার অভিজ্ঞতা নাই, এমন অনেকেরই হয়তো কথাটা বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। আসল ব্যাপারটা হলো, গোটা শাহবাগ এলাকায় যে তিন-চারটা বড় স্ক্রিনে খেলা চলে, সেগুলোর সম্প্রচারে ১৫ বা ২০ সেকেন্ডের কমবেশি হয়। ফলে একজায়গায় আশরাফুলের আউটটা একটু আগে দেখা গেছে, কোথাও একটু পরে দেখা গেছে। যাই হোক, একটু আগে-পরে হলেও আশরাফুল কিন্তু সত্যিই গতকাল গোটা বাংলাদেশকে হতাশার মহাসমুদ্রে ডুবিয়ে সাজঘরে ফিরেছিলেন মাত্র এক রান করে। এ হতাশা অবর্ণনীয়। সেই সময়টা ছিল দুঃখ-রাগ-ক্ষোভ-হতাশা মিলে তৈরি হওয়া একটা ভয়ানক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। স্কোরবোর্ডে মাত্র ১৫১ রান। আশরাফুল ফিরে গেলেন ছয় নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে। হতাশায় বেচাবিক্রি বাদ দিয়েছিলেন চায়ের দোকানদাররা। রাগে-ক্ষোভে আশরাফুলের কুশপুত্তুলিকা পোড়ানোর পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন সমর্থকরা। আর অবর্ণনীয় গালাগালির কথা তো বাদই দিলাম।

কেন? কেন আলাদা করে শুধু আশরাফুলের উপরই রাগ বাংলাদেশের মানুষের? এক ম্যাচে না হয় খেলতে পারেন নি। কী হয়েছে তাতে? কিন্তু কাহিনীর শুরুটা তো শুধু এই একদিনেই হয় নি। এই রাগ-ক্ষোভ-হতাশার এক লম্বা ইতিহাস আছে।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠানের যে উত্তাপ-উত্তেজনা, তার সঙ্গে প্রায় হাতে হাত ধরে হেটেছে আশরাফুল বিতর্ক। বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এই ব্যাটসমানটিকে দলে নেওয়া হবে, কি হবে না, সেই বিতর্ক। ব্যাট হাতে মাঠে নামলে যে রান করতে হয়, দীর্ঘদিন ধরে সেটাই যেন ভুলে গিয়েছিলেন আশরাফুল। তাই বিশ্বকাপ কাউন্টডাউন শুরু হওয়ার পর থেকেই উঠে গেল সেই মোক্ষম প্রশ্ন। কী হবে আশরাফুলের বিশ্বকাপ ভাগ্য? শেষমুহূর্তে এই প্রশ্নেই নড়েচড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গন।

শুরুর দিকে নির্বাচকদের দলে জায়গা হয়েছিল আশরাফুলের। কিন্তু বিসিবির টেকনিক্যাল কমিটির নাকি সেই দল পছন্দ হচ্ছিল না। তারা নাকি দলে আশরাফুলের জায়গায় অলোক কাপালিকে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। নিবাচক কমিটির সদস্যরাও নাকি বদলে যাবে, এমন রিপোর্টও হয়েছে প্রথম আলোতে আর সেদিনই নিবাচকদের উপর টেকনিক্যাল কমিটির এই হস্তক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একটা অগ্নিঝরা মন্তব্য প্রতিবেদন লিখলেন প্রথম আলোর ক্রীড়া-সম্পাদক উত্পল শুভ্র। ‘যাঁদের কাজ তাঁদেরই করতে দিন’- শিরোনামে। সেদিনই বিকেলবেলা ঘোষিত হলো বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল। প্রায় ছেড়ে দেওয়া একটা ট্রেনে শেষমুহূতে জায়গা পেলেন আশরাফুল।

সেসময়ই বিসিবির এই সিদ্ধান্ত খুশিমনে মেনে নিতে পারেন নি বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটপাগল মানুষ। আবার ‘ঠিক আছে মাঠে দেখা যাবে’ বলে মেনে নিয়েছিলেন অনেকে। এখানেই শেষ নয়। এরপর খবর পাওয়া গেল অনুশীলনে নাকি তার প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন কোচ জিমি সিডন্স। আবার আরেকপ্রস্থ পত্রিকার শিরোনাম হলেন আশরাফুল। অবশেষে সব ঝক্কি-ঝামেলা শেষে মাঠে গড়ালো খেলা। ভারতের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচটা তিনি মাঠের বাইরে থেকেই দেখলেন। আর আজকের অবস্থা তো আগেই বলা হয়েছে। ফলে প্রায় সবাই বললেন, ‘আগেই বলেছিলাম ওকে দলে নেওয়াটা ঠিক হয়নি’। আর যারা আশরাফুলের অভিজ্ঞতা-সম্ভবনার উপর একটু ভরসা করেছিলেন, তারা হলেন চরম বিরক্ত, যারপরনাই হতাশ।

আশরাফুল কি ব্যাট হাতে নামার সময় একটুও ভেবেছিলেন যে, তাকে দলে জায়গা দেওয়া হয়েছে মাহমুদুল্লাহকে সরিয়ে? আগের ম্যাচে মাহমুদুল্লাহ যে ৬টি রান করেছিলেন, সেই অঙ্কটা অন্তত তার ছোয়া উচিত্? সেই ছয়টা রানই যে গতকালের ম্যাচের জন্য ছিল অনেক কিছু…।

ফিল্ডিং করতে মাঠে নামার সময় হয়তো এসব চিন্তাই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল আশরাফুলকে। তাই হয়তো বল হাতে দুইটা উইকেট নিয়ে কিছুটা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বাংলাদেশের ২৭ রানের ঘামঝড়ানো জয়ের জন্য কিন্তু এটা যথেষ্ট ছিল না। আশরাফুল ধন্যবাদ দিতে পারেন শাফিউল ইসলামকে। স্বপ্নের মতো এক স্পেল (৬-১-১০-৪) দিয়ে বাংলাদেশকে রোমাঞ্চকর এক জয় এনে দিয়েছেন এই পেসার। এছাড়া হয়তো নিজেকে প্রতীকীভাবে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারতেন না জনাব মো. আশরাফুল। আমাদের ক্ষুব্ধ সমর্থকরা আরো কতো কী করতে পারতেন আমরা অনুমান করে নিতে পারি।

সেদিকে শেষপযন্ত যেতে হয়নি, বাংলাদেশের বণিল বিশ্বকাপটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় নি এটাই অবশ্য এখন সবচেয়ে বড় ব্যাপার। তবে আশরাফুল বিতর্কটা কিন্তু আবার নতুন করে জাগিয়ে তুললেন আশরাফুল নিজেই। আমরা কিন্তু বোলার আশরাফুলকে চিনি না। আমরা চিনি ব্যাটসম্যান আশরাফুলকে। যার অসাধারণ ব্যাটিং নৈপুন্যে আমরা একদা হারিয়েছিলাম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে। গতকালের ম্যাচে সেই ব্যাটসম্যান আশরাফুলের পারফরমেন্স সম্পর্কে আমার ঐ বন্ধুর মন্তব্য দিয়েই শেষ করি। ‘আরে, আশরাফুল কী ‘ডাক’ মারার মতো ব্যাটসম্যান নাকি? ১ রান করছে মিয়া!’ আশরাফুল আর আশরাফুল-ভক্তরা কী এটাকেই সান্তনা ধরে নেবেন?

  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: