‘বাহ! ওস্তাদ… বাহ!’

'বাহ! ওস্তাদ... বাহ!'

ওস্তাদ জাকির হোসেন সন্ধ্যা। সত্যিই সন্ধ্যাটা ছিল জাকির হোসেনেরই। বিরক্তিকর ট্রাফিক জ্যামের না, দশটা পাঁচটা অফিসের পর ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ার না, দমবন্ধকরা মানুষের ভিড়ের না। সন্ধ্যাটা শুধুই জাকির হোসেনের। ওস্তাদ জাকির হোসেনের।

সবার জন্য না অবশ্য! বিশ্বখ্যাত তবলাশিল্পী জাকির হোসেনের সঙ্গে বিরল এই সন্ধ্যা কাটানোর সুযোগটা জুটেছিল ঢাকা শহরের খুবই ভাগ্যবান কিছু লোকের কপালে। সুযোগটা করে দিয়েছিল প্রথম আলো ও ট্রান্সকম গ্রুপ। স্বাধীনতার চার দশক পূর্তি উপলক্ষ্যে জাকির হোসেনের ‘কিংবদন্তীতূল্য পিতা ওস্তাদ আল্লারাখা খানকে’ সম্মান জানানোই ছিল এই অসাধারণ আয়োজনটির অন্যতম উদ্দেশ্য। ১৯৭১ সালে নিউ ইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে রবিশংকর, জজ হ্যারিসন, বব ডিলানদের সঙ্গে ওস্তাদ আল্লারাখা খানও ছিলেন অন্যতম প্রধান শিল্পী। তাঁর তবলার বোলেও সেদিন বেজে উঠেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-ধ্বনি। তাঁরই যোগ্য সন্তান জাকির হোসেনকে সম্মান জানানোটা যেন সেই ঋণ শোধ করারই একটা প্রচেষ্টা।

প্রাশ্চাত্যের কোন এক নামকড়া শিল্পী একবার ভারত সফরে এসে বলেছিলেন, ভারত তিনটা জিনিসের জন্য অনন্য। তাজমহল, লতা মুঙ্গেশকর এবং ওস্তাদ জাকির হোসেন। যথার্থই বলেছিলেন বোধহয়। কেন যথার্থ বলছি, সেটা হাতেকলমেই দেখিয়ে দিয়ে গেলেন বিশ্ব-সঙ্গীতের এই জীবন্ত কিংবদন্তী।

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ওস্তাদ জাকির হোসেন। করতালি, অভিনন্দনের পালা শেষ হলে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো প্রিয় বাদ্যযন্ত্রটির সামনে বসলেন। দর্শকদের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রথম কথাটি ছিল, ‘নমস্কার, কেমন আছেন?’ কিছুক্ষণ ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বললেন। এরপর আস্তে আস্তে পাঞ্জাবির হাতা গোটালেন… প্রস্তুতি নিতে থাকলেন হাতের আঙ্গুলগুলো দিয়ে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে দেওয়ার জন্য। দুইটা ঘন্টা সত্যিই উপস্থিত দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধই করে রাখলেন ওস্তাদজি। আঙ্গুলের জাদু দিয়ে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রের মিলনায়তনটিতে কখনো নামিয়ে আনলেন ঝড়-বৃষ্টি-মেঘের গর্জন, কখনো বা ট্রেনের ‘কু ঝিক ঝিক’ তালে তালে নিয়ে গেলেন দূর মায়াবী দেশে…।

অনেক সময় মনে হয়েছে, তিনি যেন কথা বলছেন ডুগি-তবলার টোকায়। শুধু মনে হওয়াই না, তবলার বোল দিয়ে যে কথা বলাও যায়, সেটা তো তিনি অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে এসে দেখিয়েও দিলেন। ‘ধা ধিন ধিন ধা’, ‘ধা তেরে কেটে তা’ দিয়ে যে কোন একটা কিছু বর্ণনা করা যায়, গল্প করা যায়, সেটা তো উপস্থিত দর্শকরা ভালোভাবেই টের পেয়েছেন। শুধু দুই ঘন্টার জন্য গুটিকয়েক মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখাই না, হয়তো ঐ তবলার তালে তালে আরো অনেক কিছু বলে গেছেন ওস্তাদ জাকির হোসেন। একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে চার দশক পার করেছি বলে আমাদের হয়তো অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিংবা হয়তো জানতে চেয়েছেন, ৪০ বছর পর আমরা স্বাধীনতা পাচ্ছি তো? ভালোভাবে বেঁচেবর্তে আছি তো?

  1. অনেকজনকেই দেখলাম তার সাথে ছবি!

  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: