মালিঙ্গা ম্যাজিক

২০০৭ বিশ্বকাপটা অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কার। বৃষ্টিবিঘ্নিত ফাইনালে টুর্নামেন্ট আয়োজকদের নানারকম সিদ্ধান্তহীনতা, আইন-কানুনের জটিল মারপ্যাঁচের ফলে শেষপর্যন্ত শিরোপাটা উঠেছিল রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার হাতে। তবে এই বিশ্বকাপটা বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছিলেন শ্রীলঙ্কার ফাস্ট বোলার লাথিস মালিঙ্গা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সুপার এইটের একটি ম্যাচে সোনালী চুলের এই পেসার বিশ্বকাপ ইতিহাসের পঞ্চম বোলার হিসেবে হ্যাট্রিক করেছিলেন। শুধু হ্যাট্রিক বললেই এর মাহাত্মটা ঠিকমতো বোঝানো যাবে না। আসলে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে তিনি নিয়েছিলেন টানা চার বলে চার উইকেট।

২০০৭ বিশ্বকাপের ২৬ তম ম্যাচ ছিল সেটি। গায়ানার বোলিং সহায়ক উইকেটে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে। শুরু থেকেই শন পোলক, মাখায়া এনটিনি, চার্ল ল্যানজেভেল্টের দুর্ধর্ষ বোলিংয়ের সামনে চাপের মুখে পড়ে যান শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানরা। ল্যানজেভেল্ট মাত্র ৩৯ রানের বিনিময়ে নিয়েছিলেন পাঁচ উইকেট। তিন বল বাকি থাকতেই শ্রীলঙ্কার ইনিংস গুটিয়ে গিয়েছিল ২০৯ রানে।

২১০ রানের টার্গেটটা খুব বেশি কঠিন ছিল না গিবস, ডি ভিলিয়ার্স, ক্যালিস, স্মিথদের নিয়ে সাজানো ব্যাটিং লাইন আপের জন্য। মুরালিধরন, মালিঙ্গা, ভাসদের বোলিংয়ের সামনে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করলেও ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন জয়ের দিকে। ৪৪ ওভার শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেটে ২০০ রান। জয়ের জন্য তখন দরকার মাত্র ১০ রান। হাতে আছে আরো পাঁচ উইকেট। এমন ম্যাচ হারার কথা বা হারার সম্ভবনা তৈরি হওয়ার কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবে না। কিন্তু সেদিন মালিঙ্গা ম্যাজিকে নড়েচড়ে বসেছিল গায়ানার প্রোভিডেন্স স্টেডিয়ামের দর্শকরা।

৪৫ তম ওভারে দ্বিতীয় স্পেলে বল করতে আসলেন মালিঙ্গা। প্রথম চার বলেই একটা চারসহ মোট ছয় রান নিয়ে জয়টাকে একেবারেই হাতের মুঠোয় নিয়ে আসলেন শন পোলক। তখনও কেউ কল্পনাও করতে পারেন নি যে, এরপর কী জাদু দেখাতে যাচ্ছেন শ্রীলঙ্কান এই ফাস্ট বোলার। পঞ্চম বলটাতে উপড়ে গেল শন পোলকের লেগ স্ট্যাম্প। এবার উইকেটে আসলেন নতুন ব্যাটসম্যান অ্যান্ড্রু হল। মালিঙ্গার ইয়র্কারটা ঠিকমতো খেলতে পারলেন না তিনি। ধরা পরলেন কাভারে দাঁড়ানো উপল থারাঙ্গার হাতে। দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর তখন ৭ উইকেটে ২০৬ রান। জয়ের জন্য দরকার ৩০ বলে মাত্র ৪ রান। চামিন্ডা ভাসের পরের ওভারে মাত্র এক রানই নিতে পেরেছিলেন জ্যাক ক্যালিস।

৪৭ তম ওভারের প্রথম বলেই জ্যাক ক্যালিসকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করলেন মালিঙ্গা। বিশ্বকাপ ইতিহাসের পঞ্চম বোলার হিসেবে গড়লেন হ্যাট্রিক করার বিরল কীর্তি। কিন্তু এখানেই থেমে থাকল না মালিঙ্গার গ্রেনেডসদৃশ বলগুলো। পরের বলে তিনি চমত্কার এক ইয়র্কারে উড়িয়ে দিলেন মাখায়া এনটিনির স্ট্যাম্প। পর পর চার বলে চার উইকেট। জয়ের জন্য তখনও দুই রান দরকার প্রোটিয়াদের। মালিঙ্গার দুর্ধর্ষ বোলিংয়ে জয়সূচক সেই দুইটা রানই যেন তখন মনে হচ্ছিল অনেক দূরের ব্যাপার। মালিঙ্গার পরের চার বলে আর কোন রান নিতে পারলেন না দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ দুই ব্যাটসম্যান, পিটারসন ও ল্যানজেভেল্ট। ভাসের ৪৮তম ওভারটাও মেইডেন। জয়ের জন্য তখনও দরকার সেই দুই রান। আবার বল হাতে দৌড় শুরু করলেন মালিঙ্গা। প্রথম বলটাতে ব্যাটই ছোঁয়াতে পারলেন না পিটারসন। দ্বিতীয় বলে ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল চলে গেল থার্ড ম্যান দিয়ে সীমানার বাইরে। চার।

এক উইকেটের ঘাম ঝড়ানো জয় পেল দক্ষিণ আফ্রিকা। শ্রীলঙ্কা শেষপর্যন্ত ম্যাচটা জিততে না পারলেও মালিঙ্গা একটা নির্জীব ম্যাচে যেভাবে প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন তা এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে।

  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: