ফ্লাওয়ার-ওলোঙ্গার অভিনব প্রতিবাদ

ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতির আওতার বাইরে রাখার আকাঙ্ক্ষাটা বোধহয় সবাই কমবেশি লালন করেন। আর বিশ্বকাপের মতো আসরে তো এই চাওয়ার পরিমাণটা অনেক বেশিই থাকে। কিন্তু এই বিশ্বকাপের আসরেই ইতিবাচক রাজনৈতিক তত্পরতা চালিয়ে একটা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও হেনরি ওলোঙ্গা।

সময়টা ২০০৩ সাল। জিম্বাবুয়েতে তখন চলছে মুগাবের একদলীয় শাসন। মানবাধিকার হরণ, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি ইস্যুতে চলছিল নিরন্তর বিতর্ক। একঘরে হয়ে যেতে বসেছিল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট অঙ্গনও। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক একমাস আগে ইংল্যান্ড বাতিল করেছিল তাদের জিম্বাবুয়ে সফর। ইংল্যান্ড এই সফর বাতিলের পেছনে নিরাপত্তার অজুহাত দেখালেও নীতিগত বিষয়ে জিম্বাবুয়ের স্বৈরশাসনের সঙ্গে একমত হতে না পারাই ছিল এর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বকাপ শুরুর আগ দিয়েও জিম্বাবুয়ের শাসকগোষ্ঠী কিছুটা ভয়ে ছিল যে, বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের ম্যাচগুলোতে হয়তো গ্যালারি থেকে এই স্বৈরশাসনের প্রতিবাদ জানানো হতে পারে। এমন ভয়ের কিছুটা যৌক্তিক কারণও ছিল। কারণ এক বছর আগে বুলাওয়েতে একটা ম্যাচে এরকম প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন এক বিক্ষোভকারী। যাই হোক, শেষপর্যন্ত সবাই ক্রিকেটের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়ায় কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন জিম্বাবুয়ের শাসকরা।

কিন্তু জিম্বাবুয়ের শাসকগোষ্ঠীকে খুব বেশি সময় স্বস্তিতে থাকতে দেন নি অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও হেনরি ওলোঙ্গা। নামিবিয়ার বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের প্রথম ম্যাচের আগে তাঁরা সাংবাদিকদের কাছে একটা লিখিত বিবৃতিতে জানালেন যে, ‘জিম্বাবুয়েতে গণতন্ত্র-হরণের শোকে’ তাঁরা হাতে কালো বাহুবন্ধনী বেঁধে মাঠে নামবেন। ফ্লাওয়ার ও ওলোঙ্গা বেশ ভালোমতোই জানতেন যে, এই প্রতিবাদ করার সাহস দেখানোর জন্য তাঁদের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের অবসান ঘটতে পারে। এমনকি তাদেরকে দেশ থেকেও বের করে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু তারপরও তাঁরা তাদের এই অভিনব প্রতিবাদের মাধ্যমে জিম্বাবুয়ের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটা বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান নি। সেই সঙ্গে অন্য কেউ যেন বিপদে না পড়ে, সেজন্য তারা খুব ভালোমতোই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই কালো বাহুবন্ধনী ধারণের সিদ্ধান্তটা তাঁদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এমনকি তাঁরা যে এই কাজটা করতে যাচ্ছেন সেটা সতীর্থদেরও অনেকে জানতেন না।

খেলার শুরুতে সাংবাদিকদেরকে এই প্রতিবাদ সম্পর্কে জানানো হলেও খেলার ২২ তম ওভার পর্যন্ত আর কারোরই এ ব্যাপারে কোন ধারণাই ছিল না। ২৩তম ওভারে ব্যাট হাতে মাঠে নামলেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। দেখা গেল সত্যিই তিনি মাঠে নেমেছেন কালো একটা বাহুবন্ধনী বেঁধে। এরপর ক্যামেরার চোখ খুঁজে নিল ওলোঙ্গাকেও। হারারে স্টেডিয়ামের ব্যালকনিতে দাঁড়ানো ওলোঙ্গার হাতেও দেখা গেল একই ধরণের জিনিস। তাদের হাতের ঐ কালো ব্যান্ডগুলো সেদিন জ্বল জ্বল করে জানিয়ে দিয়েছিল জিম্বাবুয়েতে গণতন্ত্র হরণের করুণ কাহিনী।

পরবর্তী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বোধহয় কিছুটা আঁঁচ করতে পারছেন সবাই। যথারীতি জিম্বাবুয়ের শাসকগোষ্ঠী মরীয়া হয়ে ওঠে ভিন্নমত প্রকাশের এই অভিনব উপায়টা বন্ধ করার জন্য। তাঁরা আইসিসির কাছে দাবি জানায় ফ্লাওয়ার ও ওলোঙ্গার এই কর্মকাণ্ড অবৈধ ঘোষণা করার জন্য। আইসিসি তাদের এই ডাকে পুরোপুরি সাড়া দেয় নি। তারা শুধু প্রতিবাদী দুই ক্রিকেটারের কাছে অনুরোধ করেছিল যেন পরবর্তীতে তারা আর এ ধরণের কিছু না করে। বাকিটা তারা ছেড়ে দিয়েছিল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট বোর্ডের কাছে। কিন্তু আইসিসির অনুরোধে কান দেন নি ফ্লাওয়ার-ওলোঙ্গা। তারা পরবর্তীতেও কালো বাহুবন্ধনী বেঁধেই মাঠে নামার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। হেনরি ওলোঙ্গা খুব পরিস্কারভাবেই জানিয়েছিলেন, ‘তারা যদি আমাকে দল থেকে বের করে দিতে চায় তো দিতে পারে। আমার কিছু যায় আসে না।’ স্বৈরতন্ত্রের চরিত্র সম্পর্কে তাঁর অনুমানটা সঠিকই ছিল। পরবর্তী ম্যাচ থেকেই বহিস্কার করা হয় ওলোঙ্গাকে। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারকেও বহিস্কার করার কথা উঠতেই বেঁকে বসেন দলের বাকি খেলোয়াড়রা। সবার খেলা বর্জনের হুমকির মুখে শেষপর্যন্ত দলে রাখতেই হয় ফ্লাওয়ারকে।

যে উদ্দেশ্যে এতখানি ঝুঁকি নিয়ে ফ্লাওয়ার আর ওলোঙ্গা এই প্রতিবাদ করার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন, তা কিন্তু অনেকখানিই সফল হয়েছিল। তাঁরা তাদের এই একান্ত ব্যক্তিগত এই উদ্যোগটা ছড়িয়ে পড়েছিল দর্শকদের মাঝেও। জিম্বাবুয়ের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে এই কালো বাহুবন্ধনী পড়ে আসতে দেখা গিয়েছিল অনেক দর্শককেই।

  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: