Archive for ফেব্রুয়ারি 11th, 2011

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ইয়েলোস্টোন আগ্নেয়গিরি

২০১২ সিনেমায় দেখানো এই দৃশ্য বাস্তবেও তৈরি হওয়ার মতো অনেক উপাদান ইয়েলোস্টোন পার্কের সুপ্ত অতিকায় আগ্নেয়গিরিতে আছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: ওয়েবসাইট

বিশ্ব মোড়ল, পরাক্রমশালী ও মহাশক্তিধর—আরও কত উপাধি যুক্তরাষ্ট্রের! তাবত দুনিয়ায় আধিপত্যকারী এই দেশটির জন্য এক ভয়ংকর বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। আগ্নেয়গিরির প্রচণ্ড অগ্ন্যুত্পাতে কোনো একসময় তাদের সুখের রাজ্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।
এটা কোনো জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বিজ্ঞানীদের তথ্য-প্রমাণনির্ভর যুক্তি। একদল মার্কিন বিজ্ঞানী ও আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ বলছেন, আমেরিকার ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের অতিকায় আগ্নেয়গিরিটি ধীরে ধীরে তার পেট থেকে লাভা উদিগরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আগ্নেয়গিরিটির পাথরমিশ্রিত গলিত লাভাগুলো দীর্ঘদিন সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও ২০০৪ সাল থেকে সেটা রেকর্ড হারে জেগে উঠছে। রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত তিন বছরে আগ্নেয়গিরির লাভাস্তর তিন ইঞ্চি করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েলোস্টোন আগ্নেয়গিরির লাভা উদিগরণে দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। জ্বলন্ত লাভা ছড়িয়ে পড়বে আকাশজুড়ে। বিষাক্ত ছাইয়ের ১০ ফুট পুরু আস্তরণ তৈরি হবে আশপাশের প্রায় এক হাজার মাইলজুড়ে। কোটি কোটি মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হবে। ভেঙে পড়তে পারে বিমান চলাচলের ব্যবস্থা।
ইয়েলোস্টোন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাতের ভয়াবহতা সাম্প্রতিক আইসল্যান্ড আগ্নেয়গিরি উদিগরণকেও বহুগুণে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি ১৯৮০ সালে মাউন্ট হেলেনস আগ্নেয়গিরির উদিগরণ থেকেও হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী হবে ইয়োলোস্টোন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ।
মানুষের ইতিহাসে ছয় লাখ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত না থাকায় এ মুহূর্তে তাঁরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।
উথাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইয়েলোস্টোন আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ বব স্মিথ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘আগ্নেয়গিরির লাভাস্তর ওপরে ওঠার ঘটনা খুবই আশঙ্কাজনক। প্রথম দিকে আমরা শুধু এটা থেকে উদিগরণ ঘটতে পারে কি না সেদিকেই নজর রাখছিলাম। একসময় আমরা দেখলাম, গলিত লাভাটা ১০ কিলোমিটার নিচে আছে। সে জন্য আমরা অত বেশি চিন্তিত ছিলাম না। কিন্তু গলিত লাভার এই স্তরটা যদি দুই বা তিন কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে, তাহলে সেটা আমাদের জন্য বড় ধরনের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক রবার্ট স্মিথ সম্প্রতি এই আগ্নেয়গিরি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ স্তরের পুরোটাই গলিত পাথর দিয়ে ভর্তি। কিন্তু আমাদের কোনো ধারণা নেই যে কবে বা কখন এই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত ঘটতে পারে অথবা গলিত পাথরগুলোর চঞ্চলতা স্থিমিত হয়ে আগ্নেয়গিরিটা আবার ঘুমিয়ে পড়তে পারে।—ডেইলি মেইল অনলাইন।

অবিশ্বাস্য এক জয়!

অবিশ্বাস্য এক জয় উদযাপন করছেন জিম্বাবুয়ের ইতিহাস গড়া ক্রিকেটাররা।

‘তোমাদের মতো আনাড়িদের সঙ্গে খেলার এটাই সমস্যা। তোমরা জানো না, কীভাবে সিঙ্গেল নিয়ে ধীরে ধীরে খেলতে হয়, বিরতির পরে আমাদের পেশাদার ব্যাটসম্যানদের খেলাটা দেখো। তারা শুধু ফাঁকায় বল ফেলবে, এক-দুই করে রান নেবে। আর খেলাটা জিতে নেবে খুবই সহজে।’ ১৯৯২ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক ডেভ হজসনের উদ্দেশে খুবই অবজ্ঞাভরে এ কথাগুলো বলেছিলেন সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার জিওফ্রে বয়কট। সময়টা ছিল সেমিফাইনালের আগে গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচের মধ্যাহ্ন বিরতিতে। বলাটাও যৌক্তিক! কারণ সেই ম্যাচে সেবারের ফাইনালিস্ট ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘চুনোপুঁটি’ জিম্বাবুয়ে গুটিয়ে গিয়েছিল মাত্র ১৩৪ রানে। কিন্তু কারোরই তো এটা কল্পনাতেই আসেনি যে, শেষ পর্যন্ত কী নিদারুণভাবে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছে এই দম্ভ।

১৯৯২ সালের অন্যতম ফেভারিট ছিল ইংল্যান্ড। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটার আগে শেষ ছয়টি ম্যাচের পাঁচটিতেই তারা জিতেছিল দুর্দান্ত দাপট দেখিয়ে। অন্যদিকে তখনো টেস্ট পরিবারের বাইরের দেশ জিম্বাবুয়ে সবকটিতেই হেরেছিল খুব শোচনীয়ভাবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাই অন্য কিছু ঘটবে এটা ভাবার মতো কোনো পরিস্থিতিই ছিল না। কিন্তু এই চুনোপুঁটি জিম্বাবুয়েই সেদিন প্রমাণ করেছিল, ক্রিকেট একটা অনিশ্চয়তার খেলা। এখানে অনেক কিছু অনুমান করা গেলেও শেষ পর্যন্ত ফলাফল কী দাঁড়াবে, সেটা কিছুতেই বলা যায় না।

১৮ মার্চ। ল্যাভিংটন স্পোর্টস ওভাল স্টেডিয়ামে টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ইংলিশ অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ। ব্যাট করতে নেমে ইয়ান বোথাম, রিচার্ড ইলিংওর্থদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে শুরুতেই চাপের মুখে পড়ে যান জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানরা। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পতনের মধ্য দিয়ে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ৭৭ রান। অনেকক্ষণ লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ২৯ রান করে সাজঘরে ফিরে যান অধিনায়ক ডেভ হজসন। ২৯ রানের এই ‘ক্ষুদ্র’ ইনিংসটা তিনি খেলেছিলেন ৭২ বলে। আর এটাই ছিল জিম্বাবুয়ের পক্ষে সর্বোচ্চ রান। শেষ পর্যন্ত অষ্টম উইকেটে বুচার্ট আর ব্রান্ডেসের ৩১ রানের জুটিটা জিম্বাবুয়েকে এনে দেয় ১৩৪ রানের ‘লড়িয়ে’ সংগ্রহ!

ভয়াবহ এই ব্যাটিং বিপর্যয়ের পর জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটাররা বোধহয় আরও একটা শোচনীয় হার বরণ করে নেওয়ারই প্রহর গুনতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু মধ্যাহ্ন বিরতিতে বয়কটের কাছ থেকে অবজ্ঞাসূচক ‘উপদেশবাণী’ শুনে কিছুটা যেন রোখ চেপে গিয়েছিল হজসনের। জেতার জন্য মাঠে নামবেন, এতটা হয়তো কল্পনা করতে পারেননি। কিন্তু কিছু একটা যে করে দেখাতে হবে, সে ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মধ্যাহ্ন বিরতি শেষে মাঠে নামার আগে সতীর্থদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘মাঠে প্রায় আট হাজার দর্শক খেলা দেখতে এসেছে। আর তারা এখনো কিছু আনন্দময়-উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দেখতে চায়। আর আমরা শুধু একটা উপায়েই তাদের এই বিনোদনটা দিতে পারি। আমাদের চেষ্টা করতে হবে খেলাটা যতদূর সম্ভব চালিয়ে যাওয়ার।’

হজসনের এই কথা বোধহয় সত্যিই অনুপ্রাণিত করেছিল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটারদের। বিশেষত ব্রান্ডেসকে। জিম্বাবুয়ের এই ফাস্ট বোলারের দুর্দান্ত বোলিংয়ের মুখে খুব দ্রুতই খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ ইনিংসের প্রথম বলেই ফিরেছিলেন সাজঘরে। এরপর একে একে ব্রান্ডেসের শিকারে পরিণত হন অ্যালান ল্যাম্ব, রবিন স্মিথ ও গ্রায়েম হিক। ১০ ওভার বল করে মাত্র ২১ রান দিয়েই তিনি নিয়েছিলেন এই চারটি উইকেট। মাত্র ৪৩ রানেই পাঁচটি উইকেট তুলে নিয়ে অবিশ্বাস্য কিছু করার আশা জেগে উঠতে শুরু করেছিল জিম্বাবুইয়ান শিবিরে। কিন্তু ষষ্ঠ উইকেটে ৫২ রানের পার্টনারশিপ গড়ে সেই স্বপ্ন-পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অ্যালেক স্টুয়ার্ট ও নেইল ফেয়ারব্রাদার।

৯৫ রানের মাথায় স্টুয়ার্টকে সাজঘরে ফিরিয়ে আবারও আশার সঞ্চার করেন ওমর শাহ। এরপর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিল ডিফ্রেইটাস আর ফেয়ারব্রাদারের উইকেট তুলে নিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করার পথে জিম্বাবুয়েকে আরও একধাপ এগিয়ে নেন ইয়ান বুচার্ট। ভাগ্যদেবীও সেদিন পুরোপুরিই ছিল জিম্বাবুয়ের দিকে। কারণ নবম উইকেটে আবার ১৬ রানের জুটি গড়ে ম্যাচটা জেতার কিছুটা এগিয়ে যেতেই রানআউটের ফাঁদে পড়েন ইলিংওর্থ। ইংলিশদের স্কোর দাঁড়ায় ৯ উইকেটে ১২৪ রান। শেষ ওভারে দরকার নয় রান। আর অবিশ্বাস্য এক জয় উদ্যাপনের জন্য জিম্বাবুয়ের দরকার এক উইকেট। বল হাতে দৌড় শুরু করার আগে জিম্বাবুয়ান পেসার ম্যালকম জারভিসকে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন অধিনায়ক হজসন। ‘কোনো কিছু না ভেবে শুধু ঠিক লাইন-লেন্থে বল করে যাও।’ অধিনায়কের কথা রেখেছিলেন জারভিস। প্রথম বলেই বাজিমাত। ইংল্যান্ডের শেষ ব্যাটসম্যান গ্লাডস্টোন স্মল ধরা পড়লেন অ্যান্ডি পাইক্রফটের হাতে। জিম্বাবুয়ে পেল ৯ রানের ইতিহাস গড়া, অবিশ্বাস্য, কল্পনাতীত এক জয়। আর শেষ পর্যন্ত এই জয়টাই খুলে দিয়েছিল তাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার দ্বার।

একটা কথা জানতে ইচ্ছা হতেই পারে। ম্যাচ শেষে জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক ডেভ হজসন কি কৃতজ্ঞতাবশত ‘মহান পথপ্রদর্শক’ জিওফ্রে বয়কটের সঙ্গে আর দেখা করেননি? আসলে হজসন সেই সুযোগটাই পাননি। কারণ খেলা শেষ হতেই বিড়ালের মতো নিঃশব্দে স্টেডিয়াম ছেড়েছিলেন সাবেক এই ইংলিশ ক্রিকেটার!

বিশ্বকাপের ‘অন্ধকার’ ফাইনাল

এরকম অন্ধকারের মধ্যেই খেলা হয়েছিল ২০০৭ বিশ্বকাপের শেষ তিন ওভার

‘একটা সামান্য বৈদ্যুতিক বাতি বদলাতেও আইসিসির অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তার একটা কমিটি লাগে। কমিটি কাজ শুরু করার পর নানাবিধ আলাপ-আলোচনা, মতবিনিময় শুরু করবে। প্রত্যেকেই নিজের ‘মহামুল্যবান’, ‘অভিজ্ঞ’ মতামত দিবে। কিন্তু কেউই বাতি বদলানোর নির্দেশিকাটা পড়ে দেখবে না। এবং মজার ব্যাপার হলো শেষপর্যন্ত সামান্য ঐ বাতিটা বদলাতে গিয়ে তারা শর্ট সার্কিট করে পুরো বাড়িতেই অন্ধকার নামিয়ে আনবে।’ আইসিসি কর্মকর্তাদের কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে এই রসিকতাটা করেছিলেন ক্রিকইনফোর সম্পাদক অ্যান্ড্রু মিলার। রসিকতাটা শুনতে যতোই হালকা লাগুক, ২০০৭ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটায় সত্যিই আইসিসি কর্মকর্তাদের এধরণের আচরণের পরিচয় পেয়েছিল সবাই। সত্যি সত্যিই ক্রিকেট বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল আয়োজকদের চরম অব্যবস্থাপনায়। বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো একটা ম্যাচে সেদিন আক্ষরিক অর্থেই অন্ধকার নামিয়ে এনেছিলেন আইসিসি কর্মকর্তারা।

২৮ এপ্রিল। বারবাডোসের কেনসিংটন স্টেডিয়াম সকাল থেকেই ছিল মেঘাচ্ছন্ন। দুই অধিনায়ক টস করতে মাঠে নামার আগেই কয়েক দফায় হানা দিয়েছে বৃষ্টি। টসটা কোনমতে করে ফেলা গেলেও আবার শুরু হয় বৃষ্টির উত্পাত। বারবার করে পেছানো হতে থাকলো খেলা শুরুর সময়। শেষপর্যন্ত খেলার দৈর্ঘ্য কমিয়ে ফেলা হয় ১২ ওভার। তাছাড়া কিছুক্ষণ পর যে আবার বৃষ্টি শুরু হতে পারে এ ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিতই ছিলেন আবহাওয়াবিদরা। এত এত বিপত্তি সত্তেও বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো একটা ম্যাচ এভাবে বৃষ্টির হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে কেন এ নিয়ে সেসময়ই প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকে।

যাই হোক, শেষপর্যন্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ওভারের (৩৮) ফাইনালটা খেলতে মাঠে নামলেন শ্রীলঙ্কা-অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররা। টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে থাকলেন দুই অসি ওপেনার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট আর ম্যাথু হেইডেন। গিলক্রিস্ট খেললেন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংসটি। ১৩টি চার আর ৮টি ছয়ে সাজানো ১৪৯ রানের ইনিংসটি তিনি খেলেছিলেন মাত্র ১০৪ বলে। গিলক্রিস্টের এই ঝড়ো ইনিংসটির উপর ভর করে নির্ধারিত ৩৮ ওভারে ২৮১ রানের বড় সংগ্রহ গড়ে অস্ট্রেলিয়া।

২৮২ রানের টার্গেট নিয়ে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বিপদে পড়ে শ্রীলঙ্কা। তৃতীয় ওভারেই ব্রাকেনের শিকারে পরিণত হয়ে ফিরে যান উপল থারাঙ্গা। কিন্তু দ্বিতীয় উইকেটে ১১৬ রানের জুটি গড়ে সেই ধাক্কা সামলে ভালো অবস্থান তৈরি করেন জয়সুরিয়া আর সাঙ্গাকারা। কিন্তু শেষপর্যন্ত শ্রীলঙ্কা ২৮২ রান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে কিনা এই হিসাব করা বাদ দিলেন ধারাভাষ্যকাররা। সবাই হিসাব করতে লাগলেন এই মুহূর্তেই খেলা বন্ধ হয়ে গেলে জেতার জন্য শ্রীলঙ্কার স্কোর কত থাকা উচিত্। কারণ সেদিন কেনসিংটনের আকাশে সবসময়ই ছিল মেঘের আনাগোনা। সর্বোপরি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা। সেই আশঙ্কাটাই সত্যি হয়ে দেখা দিল শ্রীলঙ্কান ইনিংসের ২৫তম ওভারে। লঙ্কানদের সংগ্রহ তখন ৩ উইকেটে ১৪৯ রান। বৃষ্টির মধ্যেই দুই/তিন বল খেলা চলার পর আবার মাঠ ছাড়লেন সবাই। বেশ কিছু সময় বন্ধ থাকার পর আবার খেলা গড়ালো মাঠে। ততক্ষণে দর্শকদের দুয়োধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে শুরু করেছে কেনসিংটন স্টেডিয়াম। কেউই কোন ধারণা করতে পারছিলেন না যে শেষপর্যন্ত কী হতে যাচ্ছে ম্যাচের পরিণতি। খেলা কি এখানেই শেষ করে দেওয়া হবে নাকি ওভার কমিয়ে নতুন টার্গেট নির্ধারণ করা হবে। অনেক ধরণের বিভ্রান্তি ছড়ানোর পর অবশেষে নতুন টার্গেট নির্ধারিত হলো ৩৬ ওভারে ২৬৯ রান। আবারও ‘অসম্ভবের’ পিছে ছুটতে লাগলেন লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা। মূল বিপত্তিটা বাধল ৩৩তম ওভার শেষে। এমন অন্ধকার ঘনিয়ে আসল যে, ঠিকমতো বল দেখতে পাওয়াও কঠিন হয়ে গেল। সাধারণত এমন পরিবেশকে আমরা রাত বলেই চিহ্নিত করি। খেলা চালানো হবে নাকি এখানেই বন্ধ করে দিয়ে আগামীকাল রিজার্ভ ডেতে নতুন করে শুরু হবে, এ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে লাগলেন আম্পায়াররা। লজ্জিত-বিব্রত স্টিভ বাকনার সব সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিলেন আলিম ডারের উপর। ওদিকে ডার্কওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে জয় নিশ্চিত জেনে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ উদযাপনও শুরু করে দিয়েছেন রিকি পন্টিংরা। বেশ কিছুক্ষণ পর আবারও বাকি তিন ওভার খেলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন ম্যাচ রেফারি ও আইসিসি কর্তৃপক্ষ। আলো-আঁঁধারির এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে আন্দাজের উপর ব্যাট করতে লাগলেন লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা। আয়োজকরা যে কোন উপায়ে আজকেই খেলার ফল নির্ধারণ করবে, এটা জানার পর কোনমতে শেষ তিন ওভার ব্যাট করে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করতে হল শ্রীলঙ্কাকে। অস্ট্রেলিয়া পেল ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে ৪৩ রানের জয়। পন্টিং বাহিনী নিল টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ।

২০০৭ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার শিরোপা জয়ের সামর্থ্য নিয়ে কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। নিঃসন্দেহে তারা ছিল সেবারের প্রধান ফেভারিট এবং শিরোপার যোগ্য দাবিদার। কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটা যেভাবে শেষ হলো, এটা বোধহয় কারোরই কাঙ্খিত ছিল না। আইসিসিও পরবর্তীতে তাদের এই লজ্জাজনক অধ্যায়টার কথা স্বীকার করে নিয়েছিল। নিষিদ্ধ করেছিল সেদিনের ম্যাচ পরিচালনাকারী পাঁচ কর্মকর্তাকে। এই তালিকায় ছিলেন মাঠের দুই আম্পায়ার আলিম ডার ও স্টিভ বাকনার, রিজার্ভ আম্পায়ার রুডি কোয়ার্টজেন ও বিলি বাউডেন। এবং অবশ্যই ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো।

৮৩ বিশ্বকাপ: অঘটনের নেপথ্যে

প্রতিটি বিশ্বকাপেই একটা দুইটা অঘটন ঘটেই থাকে। ৯৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৭৩ রানে হারিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিল কেনিয়া। ৯৯ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়ে হইচই ফেলেছিল বাংলাদেশ। ৮৩ সালে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়াকে ১৩ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনটার জন্ম দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। আসলে ৮৩ বিশ্বকাপের শুধু ঐ একটা ম্যাচ না, পুরো বিশ্বকাপটাকেই বলা যায় একটা অঘটন। ভারতের বিশ্বকাপ জয়টাই আসলে একটা বড় অঘটন। আর এই অঘটনটাই বদলে দিয়েছিল পুরো ক্রিকেট বিশ্বের মানচিত্র। তৈরি করেছিল ক্রিকেটের সুপার পাওয়ার হিসেবে ভারতের আত্মপ্রকাশের পাটাতন। ভারতের এই পটপরিবর্তনের নেপথ্যে ভালোভাবে নজর দিলে এটা বলাই যায় যে, ৮৩ বিশ্বকাপে কপিল দেবের ১৭৫ রানের মহাকাব্যিক সেই ইনিংসটার হাত ধরেই উন্মোচিত হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন দিগন্ত।

বিশ্বকাপের প্রথম দুইটি আসরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের দুর্দান্ত দাপটের কাছে একেবারেই পাত্তা পায় নি ভারত। দ্বিতীয় বিশ্বকাপেও একই অবস্থা। বিশ্বকাপের দুই আসর মিলিয়ে ভারত খেলতে পেরেছিল মাত্র ছয়টি ম্যাচ। জিতেছিল মাত্র একটিতে। পূর্ব আফ্রিকার বিপক্ষে। এইরকম অবস্থায় তৃতীয় বিশ্বকাপে কপিল দেবের নেতৃত্বে ভারতের ইতিহাস গড়া ক্রিকেটাররা যখন ইংল্যান্ডে পৌঁছালেন, তখন কেউই তাদের কোন গোনায় আনেন নি। কিন্তু এবার যে ক্রিকেট দুনিয়ায় উইন্ডিজ আধিপত্যের অবসান ঘটাতেই ভারতের আবির্ভাব সেটা তারা বুঝিয়ে দিল প্রথম ম্যাচেই। ক্লাইভ লয়েড, ভিভ রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনীজরা ধরাশায়ী হলো ৩৪ রানের ব্যবধানে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচটাতেও পাঁচ উইকেটের সহজ জয় পেল ভারত। কিন্তু তারপর অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টানা দুইটি ম্যাচে শোচনীয়ভাবে হেরে বসল কপিল-বাহিনী। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নিজেদের পঞ্চম ম্যাচটাতে হারলে হয়তো টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে যেত তারা। সেই ম্যাচের শুরুটাও ভারত যেভাবে করেছিল, তাতে হারটাই তাদের অবধারিত নিয়তি বলে ধরে নিয়েছিল সবাই। কিন্তু অকল্পনীয়ভাবে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন কপিল দেব। খেলেছিলেন হার না মানা ১৭৫ রানের অসাধারণ একটি অধিনায়কোচিত ইনিংস।

৮৩ বিশ্বকাপের ২০তম ম্যাচ ছিল সেটি। টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যায় ভারত। স্কোরবোর্ডে মাত্র ১৭ রান জমা হতেই একে একে ফিরে যান গাভাস্কার, শ্রীকান্ত, অমরনাথ, সন্দীপ পাতিল ও ইয়াসপাল শর্মা। মাথার উপর আকাশসম চাপ নিয়ে ব্যাট হাতে মাঠে নামেন কপিল দেব। ষষ্ঠ উইকেটে রজার বিনিকে নিয়ে যোগ করলেন ৬০ রান। কিন্তু ৭৭ রানের মাথায় বিনি আর রবি শাস্ত্রী দুজনই সাজঘরে ফিরলে আবারও হতাশায় ডুবে যায় ভারতীয় শিবির। কিন্তু হার মানবেন না, এমন একটা পণ করেই যেন মাঠে নেমেছিলেন কপিল দেব। একাই তাণ্ডব চালিয়ে যেতে থাকলেন জিম্বাবুয়ের বোলারদের উপর। অষ্টম উইকেট জুটিতে মদনলালকে নিয়ে যোগ করলেন ৬২ রান। দলীয় ১৪০ রানের মাথায় মদনলালও বিদায় নেওয়ার পর ভারত ২০০ রানের কোটা ছুঁতে পারবে কিনা তা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করতে লাগলেন অনেকে। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে নবম উইকেটে কপিল দেব আর সৈয়দ কিরমানি যোগ করলেন ১২৬ রান। স্কোরবোর্ডে ভারতের রানের পাশে লেখা হল ২৬৬। ১৬টি চার ও ৬টি ছয়ে সাজানো ১৭৫ রানের ইনিংসটা কপিল খেলেছিলেন মাত্র ১৩৮ বলে। ভারতের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করেছিলেন কিরমানি। ২৪!

শুধু ব্যাট হাতেই না, বল হাতেও সেদিন জ্বলে উঠেছিলেন কপিল দেব। উইকেট পেয়েছিলেন শুধু একটি। কিন্তু তাঁর কৃপণ বোলিং ভারতের জয়ের পথে বড় একটা অবদান রেখেছিল। ১১ ওভার বল করে তিনি দিয়েছিলেন মাত্র ৩২ রান। ম্যাচটা ভারত জিতেছিল ৩১ রানে। এই অকল্পনীয় জয়টা ভারতকে এতটাই অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল যে, পরের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে তারা হারিয়েছিল ১১৮ রানের বিশাল ব্যবধানে। পরের ইতিহাসটা তো সবারই জানা। ফাইনালে মহাশক্তিধর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ম্যাচটার পর লর্ডসের ব্যালকনিতে আগের দুই বিশ্বকাপের মতো ক্লাইভ লয়েডকে না, দেখা গিয়েছিল হাস্যোজ্জ্বল কপিল দেবকে।

ভারত-অস্ট্রেলিয়া মহারণ

একদিনের ক্রিকেটের অনেক শ্বাসরুদ্ধকর, প্রতিদ্বন্দীতাপূর্ণ ম্যাচের জন্ম হয়েছে বিশ্বকাপের আসরে। ৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার সেই টাই ম্যাচটার কথা তো অনেকেই এখনো ভুলতে পারেন নি। তবে সবচেয়ে কম রানের ব্যবধানে ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে এমন ম্যাচগুলোর মধ্যে বিশ্বকাপের রেকর্ডবুকের পাতায় সবার উপরে স্থান করে নিয়েছে দুইটি ম্যাচ। ৮৭ বিশ্বকাপের তৃতীয় ম্যাচ ও ৯২ বিশ্বকাপের ১২তম ম্যাচ। পরপর দুইটি বিশ্বকাপের এই ম্যাচ দুটিতে পাওয়া যাবে প্রচুর মিল। দুবারই প্রতিপক্ষ ভারত-অস্ট্রেলিয়া। প্রচণ্ড উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচদুটিতে শেষ হাসি হেসেছে অস্ট্রেলিয়া। দুটি ম্যাচেই জয়-পরাজয়ের ব্যবধান মাত্র এক রান।

৮৭ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দুই দল বিবেচনা করা হয়েছিল ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে। আগেরবারের শিরোপাজয়ী হিসেবে স্বাগতিক ভারতকে শিরোপার দৌড়ে কিছুটা এগিয়ে রেখেছিলেন অনেকেই। অন্যদিকে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের স্থায়ী আসন দখলের কথা জানান দিতে শুরু করেছিল অস্ট্রেলিয়া। সব মিলিয়ে ৮৭ বিশ্বকাপের শুরুতেই তৃতীয় ম্যাচটার দিকে নজর ছিল সবারই। আর এই দর্শকদের একেবারেই হতাশ করেন নি দুই দলের ক্রিকেটাররা।

মাদ্রাজের চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভারতীয় অধিনায়ক কপিল দেব। কিন্তু দুই অসি ওপেনার ডেভিড বুন আর জিওফ মার্শের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে সেই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে পারেন নি কপিল দেবরা। উদ্বোধনী জুটিতেই তাঁরা সংগ্রহ করেন ১১০ রান। ডেভিড বুন ৪৯ রান করে শাস্ত্রীর বলে এলবিডব্লিউ’র ফাঁদে পড়লেও জিওফ মার্শ পৌঁছে যান শতকের দোরগোড়ায়। সাজঘরে ফেরার আগপর্যন্ত তিনি খেলেন ১১০ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। সঙ্গে ডিন জোনসের ৩৫ বলে ৩৯ ও তরুণ স্টিভ ওয়াহ’র ১৭ বলে ১৯ রানের ইনিংস দুটির সুবাদে নির্ধারিত ৫০ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৭০ রান।

২৭১ রানের টার্গেটটা সেসময়ের প্রেক্ষিতে বেশ শক্ত টার্গেটই বলা চলে। তারপরও ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন লক্ষ্যের দিকে। যে সুনীল গাভাস্কার প্রথম বিশ্বকাপে ১৭৬ বলে ৩৬ রানের ইনিংস খেলে বিরক্তি উত্পাদন করেছিলেন, সেই গাভাস্কার এই ম্যাচে করলেন ৩৭। তাও মাত্র ৩২ বলে! আরেক ওপেনার ক্রিস শ্রীশান্ত খেললেন ৭০ রানের একটি ঝলমলে ইনিংস। তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে চারটি চার ও পাঁচটি ছয় দিয়ে সাজানো সর্বোচ্চ ৭৩ রানের ঝড়ো একটি ইনিংস খেলেন নবজাত্ সিং সিধু । শুরুর দিকের এই তিন ব্যাটসম্যান ভারতের জয়ের রাস্তাটা অনেকখানি পরিস্কার করে দিয়েছিল। কিন্তু এরপরই জ্বলে উঠলেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সফল ফাস্ট বোলার ক্রেইগ ম্যাকডারমট। খুব অল্প সময়ের মধ্যে একে একে ফিরিয়ে দিলেন সিধু, আজহারউদ্দিন, দিলিপ ভেনসাঙ্কার ও রবি শাস্ত্রীকে। দুই উইকেটে ২০৬ রান থেকে মুহূর্তে মধ্যে ভারতের স্কোর দাঁড়ালো ৬ উইকেটে ২৪৬ রান। এরপর যেন ভাগ্যদেবীও মুখ ফিরিয়ে নিলেন ভারতের উপর থেকে। খুবই দুঃখজনকভাবে রানআউট হয়ে ফিরে গেলেন রজার বিনি আর মনোজ প্রভাকর। শেষ ওভারের শেষ দুই বলে জয়ের জন্য দরকার ছিল মাত্র দুই রান। ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছিলেন ভারতের শেষ ব্যাটসম্যান মহিন্দর সিং। বল হাতে স্টিভ ওয়াহ। পঞ্চম বলটাতেই মহিন্দর সিংকে বোল্ড করে জয় ছিনিয়ে নিলেন তরুন ওয়াহ।

৯২ বিশ্বকাপের ম্যাচটাতেও ভাগ্য সহায় হয় নি ভারতের। সেই ম্যাচে রান আউটের শিকার হয়েছিলেন চারজন ভারতীয় ব্যাটসম্যান। বৃষ্টির কারণে তত্কালিন বৃষ্টি-আইনও গিয়েছিল ভারতের বিপক্ষে। সব মিলিয়ে আগের বিশ্বকাপের সেই স্মৃতিই যেন নতুন করে ফিরে এসেছিল এই বিশ্বকাপেও। এবারও প্রথমে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। তবে সেই ম্যাচের মতো এবার আর খুব বেশি দাপটের সঙ্গে ব্যাট চালাতে পারেন নি অসি ব্যাটসম্যানরা। ডেভিড জোনসের ৯০, ডেভিড বুনের ৪৩ ও শেষদিকে স্টিভ ওয়াহ, টম মুডির ২৯ ও ২৫ রানের ইনিংসগুলির সুবাদে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ২৩৬ রান তোলে অস্ট্রেলিয়া।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে ছোট ছোট পার্টনারশিপে বেশ ভালোই রান সংগ্রহ করছিলেন আজহারউদ্দিন, রবি শাস্ত্রি, কপিল দেবরা। কিন্তু বাধ সাধে বৃষ্টি ১৭ তম ওভারে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর তিন ওভার কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারতের নতুন টার্গেট দাঁড়ায় ৪৭ ওভারে ২৩৬। আজহারউদ্দিনের ১০২ বলে ৯৩ রান আর সঞ্জয় মাঞ্জেরেকারের ৪২ বলে ৪৭ রানের ইনিংস দুটো অনেক আশা জাগিয়েছিল ভারতীয় শিবিরে। কিন্তু দুজনকেই বিদায় নিতে হয় রানআউটের ফাঁদে পড়ে। শেষ ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল ১৩ রান। কিরন মোরে প্রথম দুই বলে চার হাঁকিয়ে বোল্ড হয়ে যান টম মুডির বলে। টার্গেট দাঁড়ায় তিন বলে পাঁচ রান। তাড়াহুড়ো করে রান নিতে গিয়ে শেষ দুই ব্যাটসম্যান মনোজ প্রভাকর ও ভেঙ্কটপতি রাজু, দুজনই পড়েন রানআউটের ফাঁদে। স্কোরবোর্ডে যোগ হয় তিন রান। আবারও ভারতের পরাজয়ের ব্যবধান মাত্র ১ রান।

গিবসের ‘ছয়’ ছক্কা

২০০৭ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছিল বেশ কয়েকটি নতুন দেশ। স্কটল্যান্ড, বারমুডা, আয়ারল্যান্ড। একেবারেই নবাগত এই দলগুলোকে বিশ্বকাপের আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য আইসিসির সমালোচনাও করেছিলেন কেউ কেউ। অনেকেই মত দিয়েছিলেন যে, এতে বিশ্বকাপে মতো একটা বড় আসরের চরিত্র নষ্ট হবে। অনেক ম্যাচই অগুরুত্বপূর্ণ-একতরফা রুপ ধারণ করবে। টুর্নামেন্ট কিছুদিন গড়াতেই সমালোচকরা তাঁদের কথার পিঠে মোক্ষম যুক্তিও পেয়ে গেলেন।

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচেই স্কটল্যান্ড ২০৩ রানে হেরে গেল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। পরের দিনই শ্রীলঙ্কা, বারমুডাকে হারাল আরো বড় ব্যবধানে। ২৪৩ রানে। আর এই ধরণের ম্যাচগুলো দেখার পর পরেরদিন অনেকেই আর আগ্রহ বোধ করেন নি হল্যান্ড-দক্ষিন আফ্রিকা মধ্যকার বিশ্বকাপের সপ্তম ম্যাচটির প্রতি। তবে যারা ‘একতরফা ম্যাচ খুব বিরক্তিকর বা দেখতে ভালো লাগে না’ জাতীয় মন্তব্য করে এই খেলাটা দেখতে বসেন নি, তারা পরে খুব ভালোমতোই টের পেয়েছিলেন যে, সব একতরফা ম্যাচই বিরক্তিকর হয় না। কিছু কিছু সময় একতরফা ম্যাচগুলো থেকেও পাওয়া যায় প্রচণ্ড উত্তেজনার উত্তাপ।

১৬ মার্চ এরকমই একটা ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল হল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচ শুরুর আগেই শুরু হয়েছিল বৃষ্টির উত্পাত। একে তো আগে থেকেই একতরফা ম্যাচ ভেবে অনেকেই খুব বেশি আগ্রহ দেখান নি। তার উপর খেলার শুরুতেই এ ধরণের প্রতিবন্ধকতার ফলে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন ম্যাচটা থেকে। কেউ তখন ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেন নি যে, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ইতিহাস গড়া এক খেলা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন তারা। সেদিন দক্ষিণ আফ্রিকান ইনিংসের ২৯তম ওভারে রচিত হয়েছিল এক অনন্য রেকর্ড। একদিনের ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো ছয় বলে ছয় ছক্কা মারার বিরল কীর্তি গড়েছিলেন হারশেল গিবস।

বৃষ্টির কারণে খেলার দৈর্ঘ্য কমিয়ে আনা হয়েছেল ৪০ ওভারে। ভেজা উইকেটের ফায়দা তুলতে টসে জিতে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নেদারল্যান্ড অধিনায়ক লুক ভন ট্রস্ট। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে স্কোরবোর্ডে কোন রান যোগ না হতেই এ বি ডি ভিলিয়ার্স ধরলেন সাজঘরের রাস্তা। আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল নেদারল্যান্ড শিবিরে। তখনও কেউ অনুমানই করতে পারেন নি যে, এই ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্তটা আসলে কী সর্বনাশটা ডেকে এনেছে নেদারল্যান্ড বোলারদের ভাগ্যে।

দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ১৯ ওভারে ১১৪ রান তুলেছিলেন গ্রায়েম স্মিথ ও জ্যাক ক্যালিস। স্মিথ ৫৯ বলে ৬৭ রানের ইনিংস খেলে ফিরে যাওয়ার পর ইতিহাস গড়া ইনিংস খেলতে উইকেটে এসে দাঁড়ালেন হারশেল গিবস। ম্যাচ শুরুর আগের বৃষ্টির মতো তিনিও ব্যাট হাতে ঝড়াতে শুরু করলেন বাউন্ডারির বৃষ্টি। নেদারল্যান্ড বোলারদের রীতিমতো নাভিশ্বাস তুলে দিলেন তাঁর স্বভাবসুলভ মারকুটে ব্যাটিং দিয়ে।

ইতিহাস গড়া ২৯ তম ওভারটাতে বল করতে আসলেন লেগস্পিনার ডান ভন বাঙ্গ। প্রথম বলটায় উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে লঙ অন দিয়ে উড়িয়ে মারলেন গিবস। ছয়। দ্বিতীয় বলটায় গিবস আবারও ব্যাট চালালেন একই ভঙ্গিতে। এবার বলটা সীমানার বাইরে পড়ল লঙ অফ দিয়ে। তৃতীয় বলে আবারও ঐ লঙ অফ দিয়েই বল সীমানার বাইরে পাঠিয়ে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন গিবস। এই ৫০ রান এসেছিল মাত্র ৩৬ বলে। এরপর কিছুক্ষণ যেন জিরিয়ে নিলেন ডানহাতি এই মারকুটে ব্যাটসম্যান। যেন প্রস্তুত হয়ে নিলেন পরবর্তী তিনটি বলের জন্য। চতুর্থ বল সীমানার বাইরে পাঠালেন ডিপ মিডউইকেট দিয়ে। পঞ্চম বলটা বুলেট গতিতে আছড়ে ফেললেন লঙ অফের উপর দিয়ে। আবারও প্রসারিত হলো আম্পায়ার মার্ক বেনসনের হাত। ছয়! ষষ্ঠ বলটা আবারও ডিপ মিডউইকেট দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠিয়েই গড়ে ফেললেন ইতিহাস। পা রাখলেন একদিনের ক্রিকেটের এমন এক অঞ্চলে যেখানে এতদিন অন্য কেউ যেতে পারেন নি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তো বটেই, সর্বোপরি একদিনের ক্রিকেটেও স্মরণীয় হয়ে থাকল ভন বাঙ্গের সেই ওভারটা। ৪ ওভার বল করে সেদিন তিনি দিয়েছিলেন ৫৬ রান। তবে মজার ব্যাপার হলো বিশাল এই ‘কীর্তি’ গড়ার পরও তিনিই কিন্তু সবচেয়ে খরুচে বোলার ছিলেন না। চার ওভার বল করে সর্বোচ্চ ৫৯ রান দিয়েছিলেন খোদ নেদারল্যান্ড অধিনায়ক লুক ভন ট্রস্ট।

সাতটি ছয় ও চারটি চার দিয়ে সাজানো ৭২ রানের ইনিংসটি খেলতে গিবসের লেগেছিল মাত্র ৪০ বল। আর নির্ধারিত ৪০ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোরবোর্ডে যোগ হয়েছিল ৩৫৩ রান। ম্যাচটি নেদারল্যান্ড হেরেছিল ২২১ রানে।

মালিঙ্গা ম্যাজিক

২০০৭ বিশ্বকাপটা অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কার। বৃষ্টিবিঘ্নিত ফাইনালে টুর্নামেন্ট আয়োজকদের নানারকম সিদ্ধান্তহীনতা, আইন-কানুনের জটিল মারপ্যাঁচের ফলে শেষপর্যন্ত শিরোপাটা উঠেছিল রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার হাতে। তবে এই বিশ্বকাপটা বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছিলেন শ্রীলঙ্কার ফাস্ট বোলার লাথিস মালিঙ্গা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সুপার এইটের একটি ম্যাচে সোনালী চুলের এই পেসার বিশ্বকাপ ইতিহাসের পঞ্চম বোলার হিসেবে হ্যাট্রিক করেছিলেন। শুধু হ্যাট্রিক বললেই এর মাহাত্মটা ঠিকমতো বোঝানো যাবে না। আসলে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে তিনি নিয়েছিলেন টানা চার বলে চার উইকেট।

২০০৭ বিশ্বকাপের ২৬ তম ম্যাচ ছিল সেটি। গায়ানার বোলিং সহায়ক উইকেটে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে। শুরু থেকেই শন পোলক, মাখায়া এনটিনি, চার্ল ল্যানজেভেল্টের দুর্ধর্ষ বোলিংয়ের সামনে চাপের মুখে পড়ে যান শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানরা। ল্যানজেভেল্ট মাত্র ৩৯ রানের বিনিময়ে নিয়েছিলেন পাঁচ উইকেট। তিন বল বাকি থাকতেই শ্রীলঙ্কার ইনিংস গুটিয়ে গিয়েছিল ২০৯ রানে।

২১০ রানের টার্গেটটা খুব বেশি কঠিন ছিল না গিবস, ডি ভিলিয়ার্স, ক্যালিস, স্মিথদের নিয়ে সাজানো ব্যাটিং লাইন আপের জন্য। মুরালিধরন, মালিঙ্গা, ভাসদের বোলিংয়ের সামনে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করলেও ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন জয়ের দিকে। ৪৪ ওভার শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেটে ২০০ রান। জয়ের জন্য তখন দরকার মাত্র ১০ রান। হাতে আছে আরো পাঁচ উইকেট। এমন ম্যাচ হারার কথা বা হারার সম্ভবনা তৈরি হওয়ার কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবে না। কিন্তু সেদিন মালিঙ্গা ম্যাজিকে নড়েচড়ে বসেছিল গায়ানার প্রোভিডেন্স স্টেডিয়ামের দর্শকরা।

৪৫ তম ওভারে দ্বিতীয় স্পেলে বল করতে আসলেন মালিঙ্গা। প্রথম চার বলেই একটা চারসহ মোট ছয় রান নিয়ে জয়টাকে একেবারেই হাতের মুঠোয় নিয়ে আসলেন শন পোলক। তখনও কেউ কল্পনাও করতে পারেন নি যে, এরপর কী জাদু দেখাতে যাচ্ছেন শ্রীলঙ্কান এই ফাস্ট বোলার। পঞ্চম বলটাতে উপড়ে গেল শন পোলকের লেগ স্ট্যাম্প। এবার উইকেটে আসলেন নতুন ব্যাটসম্যান অ্যান্ড্রু হল। মালিঙ্গার ইয়র্কারটা ঠিকমতো খেলতে পারলেন না তিনি। ধরা পরলেন কাভারে দাঁড়ানো উপল থারাঙ্গার হাতে। দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর তখন ৭ উইকেটে ২০৬ রান। জয়ের জন্য দরকার ৩০ বলে মাত্র ৪ রান। চামিন্ডা ভাসের পরের ওভারে মাত্র এক রানই নিতে পেরেছিলেন জ্যাক ক্যালিস।

৪৭ তম ওভারের প্রথম বলেই জ্যাক ক্যালিসকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করলেন মালিঙ্গা। বিশ্বকাপ ইতিহাসের পঞ্চম বোলার হিসেবে গড়লেন হ্যাট্রিক করার বিরল কীর্তি। কিন্তু এখানেই থেমে থাকল না মালিঙ্গার গ্রেনেডসদৃশ বলগুলো। পরের বলে তিনি চমত্কার এক ইয়র্কারে উড়িয়ে দিলেন মাখায়া এনটিনির স্ট্যাম্প। পর পর চার বলে চার উইকেট। জয়ের জন্য তখনও দুই রান দরকার প্রোটিয়াদের। মালিঙ্গার দুর্ধর্ষ বোলিংয়ে জয়সূচক সেই দুইটা রানই যেন তখন মনে হচ্ছিল অনেক দূরের ব্যাপার। মালিঙ্গার পরের চার বলে আর কোন রান নিতে পারলেন না দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ দুই ব্যাটসম্যান, পিটারসন ও ল্যানজেভেল্ট। ভাসের ৪৮তম ওভারটাও মেইডেন। জয়ের জন্য তখনও দরকার সেই দুই রান। আবার বল হাতে দৌড় শুরু করলেন মালিঙ্গা। প্রথম বলটাতে ব্যাটই ছোঁয়াতে পারলেন না পিটারসন। দ্বিতীয় বলে ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল চলে গেল থার্ড ম্যান দিয়ে সীমানার বাইরে। চার।

এক উইকেটের ঘাম ঝড়ানো জয় পেল দক্ষিণ আফ্রিকা। শ্রীলঙ্কা শেষপর্যন্ত ম্যাচটা জিততে না পারলেও মালিঙ্গা একটা নির্জীব ম্যাচে যেভাবে প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন তা এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে।

ফ্লাওয়ার-ওলোঙ্গার অভিনব প্রতিবাদ

ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতির আওতার বাইরে রাখার আকাঙ্ক্ষাটা বোধহয় সবাই কমবেশি লালন করেন। আর বিশ্বকাপের মতো আসরে তো এই চাওয়ার পরিমাণটা অনেক বেশিই থাকে। কিন্তু এই বিশ্বকাপের আসরেই ইতিবাচক রাজনৈতিক তত্পরতা চালিয়ে একটা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও হেনরি ওলোঙ্গা।

সময়টা ২০০৩ সাল। জিম্বাবুয়েতে তখন চলছে মুগাবের একদলীয় শাসন। মানবাধিকার হরণ, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি ইস্যুতে চলছিল নিরন্তর বিতর্ক। একঘরে হয়ে যেতে বসেছিল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট অঙ্গনও। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক একমাস আগে ইংল্যান্ড বাতিল করেছিল তাদের জিম্বাবুয়ে সফর। ইংল্যান্ড এই সফর বাতিলের পেছনে নিরাপত্তার অজুহাত দেখালেও নীতিগত বিষয়ে জিম্বাবুয়ের স্বৈরশাসনের সঙ্গে একমত হতে না পারাই ছিল এর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বকাপ শুরুর আগ দিয়েও জিম্বাবুয়ের শাসকগোষ্ঠী কিছুটা ভয়ে ছিল যে, বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের ম্যাচগুলোতে হয়তো গ্যালারি থেকে এই স্বৈরশাসনের প্রতিবাদ জানানো হতে পারে। এমন ভয়ের কিছুটা যৌক্তিক কারণও ছিল। কারণ এক বছর আগে বুলাওয়েতে একটা ম্যাচে এরকম প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন এক বিক্ষোভকারী। যাই হোক, শেষপর্যন্ত সবাই ক্রিকেটের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়ায় কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন জিম্বাবুয়ের শাসকরা।

কিন্তু জিম্বাবুয়ের শাসকগোষ্ঠীকে খুব বেশি সময় স্বস্তিতে থাকতে দেন নি অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও হেনরি ওলোঙ্গা। নামিবিয়ার বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের প্রথম ম্যাচের আগে তাঁরা সাংবাদিকদের কাছে একটা লিখিত বিবৃতিতে জানালেন যে, ‘জিম্বাবুয়েতে গণতন্ত্র-হরণের শোকে’ তাঁরা হাতে কালো বাহুবন্ধনী বেঁধে মাঠে নামবেন। ফ্লাওয়ার ও ওলোঙ্গা বেশ ভালোমতোই জানতেন যে, এই প্রতিবাদ করার সাহস দেখানোর জন্য তাঁদের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের অবসান ঘটতে পারে। এমনকি তাদেরকে দেশ থেকেও বের করে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু তারপরও তাঁরা তাদের এই অভিনব প্রতিবাদের মাধ্যমে জিম্বাবুয়ের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটা বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান নি। সেই সঙ্গে অন্য কেউ যেন বিপদে না পড়ে, সেজন্য তারা খুব ভালোমতোই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই কালো বাহুবন্ধনী ধারণের সিদ্ধান্তটা তাঁদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এমনকি তাঁরা যে এই কাজটা করতে যাচ্ছেন সেটা সতীর্থদেরও অনেকে জানতেন না।

খেলার শুরুতে সাংবাদিকদেরকে এই প্রতিবাদ সম্পর্কে জানানো হলেও খেলার ২২ তম ওভার পর্যন্ত আর কারোরই এ ব্যাপারে কোন ধারণাই ছিল না। ২৩তম ওভারে ব্যাট হাতে মাঠে নামলেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। দেখা গেল সত্যিই তিনি মাঠে নেমেছেন কালো একটা বাহুবন্ধনী বেঁধে। এরপর ক্যামেরার চোখ খুঁজে নিল ওলোঙ্গাকেও। হারারে স্টেডিয়ামের ব্যালকনিতে দাঁড়ানো ওলোঙ্গার হাতেও দেখা গেল একই ধরণের জিনিস। তাদের হাতের ঐ কালো ব্যান্ডগুলো সেদিন জ্বল জ্বল করে জানিয়ে দিয়েছিল জিম্বাবুয়েতে গণতন্ত্র হরণের করুণ কাহিনী।

পরবর্তী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বোধহয় কিছুটা আঁঁচ করতে পারছেন সবাই। যথারীতি জিম্বাবুয়ের শাসকগোষ্ঠী মরীয়া হয়ে ওঠে ভিন্নমত প্রকাশের এই অভিনব উপায়টা বন্ধ করার জন্য। তাঁরা আইসিসির কাছে দাবি জানায় ফ্লাওয়ার ও ওলোঙ্গার এই কর্মকাণ্ড অবৈধ ঘোষণা করার জন্য। আইসিসি তাদের এই ডাকে পুরোপুরি সাড়া দেয় নি। তারা শুধু প্রতিবাদী দুই ক্রিকেটারের কাছে অনুরোধ করেছিল যেন পরবর্তীতে তারা আর এ ধরণের কিছু না করে। বাকিটা তারা ছেড়ে দিয়েছিল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট বোর্ডের কাছে। কিন্তু আইসিসির অনুরোধে কান দেন নি ফ্লাওয়ার-ওলোঙ্গা। তারা পরবর্তীতেও কালো বাহুবন্ধনী বেঁধেই মাঠে নামার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। হেনরি ওলোঙ্গা খুব পরিস্কারভাবেই জানিয়েছিলেন, ‘তারা যদি আমাকে দল থেকে বের করে দিতে চায় তো দিতে পারে। আমার কিছু যায় আসে না।’ স্বৈরতন্ত্রের চরিত্র সম্পর্কে তাঁর অনুমানটা সঠিকই ছিল। পরবর্তী ম্যাচ থেকেই বহিস্কার করা হয় ওলোঙ্গাকে। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারকেও বহিস্কার করার কথা উঠতেই বেঁকে বসেন দলের বাকি খেলোয়াড়রা। সবার খেলা বর্জনের হুমকির মুখে শেষপর্যন্ত দলে রাখতেই হয় ফ্লাওয়ারকে।

যে উদ্দেশ্যে এতখানি ঝুঁকি নিয়ে ফ্লাওয়ার আর ওলোঙ্গা এই প্রতিবাদ করার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন, তা কিন্তু অনেকখানিই সফল হয়েছিল। তাঁরা তাদের এই একান্ত ব্যক্তিগত এই উদ্যোগটা ছড়িয়ে পড়েছিল দর্শকদের মাঝেও। জিম্বাবুয়ের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে এই কালো বাহুবন্ধনী পড়ে আসতে দেখা গিয়েছিল অনেক দর্শককেই।

টমসনের আগুনের গোলা

ওয়ানডে ক্রিকেটের শুরুর দিকে ক্রিকেট জগতের সবচেয়ে বিধ্বংসী বোলিং জুটি হিসেবে গণ্য করা হতো দুই অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলি ও জেফ টমসনকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তী ক্লাইভ লয়েড তাঁর দেখা সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলারের নাম বলতে গিয়ে বলেছেন টমসনের কথা। ১৫০ কিমি বেগে থমসন যে বলগুলো ছুঁড়তেন সেগুলোকে বুলেট গতিতে ছুটে যাওয়া এক একটা আগুনের গোলার সঙ্গেও তুলনা করা যায় অনায়াসে। আর সে আমলে তো এখনকার মতো সুরক্ষা ব্যাটসম্যানদের ছিল না। হেলমেট, হ্যান্ডপ্যাড ছাড়া এই বিধ্বংসী বোলারের মুখোমুখি হয়ে অনেকেই শুধু যে উইকেটটি খুইয়েছেন তাই নয়। বরং শারিরীকভাবেও আহত হয়েছেন-এমন উদাহরণ প্রচুর পাওয়া যাবে। এ ধরণেরই একটা ঘটনা ঘটেছিল প্রথম বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার তৃতীয় ম্যাচটাতে। টমসনের গোলার আঘাতে আহত হয়ে রীতিমতো হাসপাতালে যেতে হয়েছিল দুই শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান সুনীল ওয়েট্টিমুনি ও দিলীপ মেন্ডিসকে।

টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর বাইরে শুধু শ্রীলঙ্কা আর পূর্ব আফ্রিকাই অংশ নিয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আগে কখনো টেস্ট না খেলার কারণে ডেনিস লিলি বা জেফ টমসনের বিধ্বংসী বোলিং সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না লঙ্কানদের। বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে তারা হারে ৯ উইকেটে। দ্বিতীয় ম্যাচে অ্যান্ডি রবার্টস, বার্নার্ড জুলিয়েন, কেইথ বোয়েসদের সামনে তারা গুটিয়ে যায় মাত্র ৮৬ রানে। এই ম্যাচটাও তাদের হারের ব্যবধান ৯ উইকেট। তৃতীয় ম্যাচে এবার আর আগে ব্যাট করতে নামতে হয় নি শ্রীলঙ্কাকে। টসে জিতে প্রথমে বল করাটাকেই সুবিধাজনক মনে করেছিলেন শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক আনুরা টেন্নেকুন। অ্যালান টার্নারের সেঞ্চুরির সুবাদে শ্রীলঙ্কাকে ৩২৯ রানের (৬০ ওভারে) লক্ষ্য বেঁধে দেয় অস্ট্রেলিয়া।

প্রথম দুই ম্যাচের মতো এবার আর অতটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়লেন না লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা। বেশ ভালোই লড়তে লাগলেন লিলি-টমসনদের বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে। ৩২ ওভারে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে তারা সংগ্রহ করেছিলেন ১৫০ রান। কিন্তু তারপর যেন একেবারে রুদ্রমুর্তি ধারণ করলেন জেফ টমসন। দ্বিতীয় স্পেলে বল করতে এসে যেন আগুন ঝড়াতে লাগলেন ওভালের বাউন্সি উইকেটে। ৩২ রান করে ঐ গোলার আঘাতে একেবারে হাসপাতালে চলে যেতে হয় মেন্ডিসকে। অপরপ্রান্তে দাঁড়ানো ওয়েট্টিমুনির মানসিক অবস্থাটা তখন কেমন ছিল, তা অনুমান করাই যায়। কিন্তু ৫২ রান করে তখনও বেশ ভালোই লড়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বেশ কয়েকবার তাঁর গায়ে বল লাগলেও হার মানেন নি। কিছুক্ষণ সেবাশুশ্রুসার পর আবার ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছেন। এতেই যেন বলের গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন টমসন। কিছুক্ষণ পরে এবার আর শেষরক্ষা করতে পারলেন না ওয়েট্টিমুনি। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে মেন্ডিসের পিছু পিছু তাকেও যেতে হলো হাসপাতালে। তবে তার আগে তিনি পূর্ণ করতে পেরেছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক।

ওয়েট্টিমুনি পরে টমসনের সেই স্পেলটার কথা স্মরণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ঐ বলগুলো ছিল একেকটা আলোর ঝলকানির মতো। আমি সেগুলো একটাও দেখতে পাই নি।’ আর মেন্ডিস বলেছিলেন, ‘সে বল করছিল ১০০ মাইল গতিতে। আমি এরচেয়ে দ্রুতগতির বল কখনো মোকাবিলা করিনি।’ টমসন অবশ্য তার বাউন্সারগুলোকে সত্যিকারের বাউন্সার বলতে রাজি নন। তাঁর মতে তিনি স্বাভাবিকভাবেই বল করছিলেন! শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানদের গড় উচ্চতা অনেক কম বলে ওগুলো নাকি বাউন্সার বলে মনে হয়েছিল! সেই ম্যাচে ১২ ওভার বল করে মাত্র ২২ রান দিয়ে একটি উইকেট নিয়েছিলেন টমসন। তাঁর উইকেট একটা গণ্য হলেও কার্যত তিনি আরো দুইজনকে সাজঘরে (হাসপাতালেই বলা ভালো) পাঠিয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত সেই ম্যাচটা শ্রীলঙ্কা হেরেছিল ৫২ রানে।

ট্র্যাজেডির সেমিফাইনাল

১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রাজিক বিদায়টার কথা এখনো ভুলতে পারেন নি ক্রিকেটপ্রেমীরা। ম্যাচটা ড্র হয়ে গেলেও পয়েন্ট মারপ্যাঁচের ফাঁদে পড়ে বিদায় নিতে হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে। প্রোটিয়াসদের সেমিফাইনাল ট্রাজেডি কিন্তু সেটাই প্রথম না। এর আগে ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালেও জঘন্য কিছু আইন-কানুনের জালে আটকে গিয়েছিল তাদের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।

১৯৯২ সালেই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তার আগে বর্ণবাদ বিতর্কের ঘেরাটোপে আটকে বেশ কিছুদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনেরই বাইরে ছিল তারা। বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে শুরুটাও করেছিল দুর্দান্তভাবে। তারপর একে একে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ে, ভারতকে হারিয়ে উঠে এসেছিল সেমিফাইনালে। অধিনায়ক কেপলার ওয়েলস, অ্যালান ডোনাল্ড, হ্যানসি ক্রনিয়ে, জন্টি রোডসরা অসাধারণ পারফরমেন্স দেখিয়ে মুগ্ধ করে দিয়েছিলেন ক্রিকেট বিশ্বকে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিতে জন্টি রোডস যেভাবে ইনজামামকে রান আউট করেছিলেন তা এখনো জ্বলজ্বল করছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায়।

দক্ষিণ আফ্রিকার এই প্রথম বিশ্বকাপে অনেককিছুই দেখা গিয়েছিল প্রথমবারের মতো। যেমন, সেবারই প্রথম প্রচলন হয় রঙ্গিন পোশাকের। সেই সঙ্গে চালু করা হয় সাদা বল। সেবারই প্রথম খেলা শুরু হয়েছিল ফ্লাডলাইটের আলোয়। কিন্তু এসবকিছুকে ছাপিয়ে ১৯৯২ বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল বৃষ্টি সংক্রান্ত নতুন আইন। ৯২ বিশ্বকাপের বৃষ্টি আইনের নিয়মটা ছিল যে, প্রথমে ফিল্ডিং করা দলের সবচেয়ে কম রান দেওয়া ওভারগুলির রানসংখ্যা কমিয়ে নেওয়া হবে। ধরা যাক বৃষ্টির কারণে ২ ওভার কেটে নেওয়া হলো। তখন হিসাব করা হবে যে, প্রথমে বোলিং করা দল কোন দুই ওভারে সবচেয়ে কম রান দিয়েছে। যত রান কম দিয়েছে তত রান বাদ দিয়ে নতুন টার্গেট নির্ধারণ করা হবে। সেবার বৃষ্টিই গড়ে দিয়েছিল বিশ্বকাপের অনেকগুলো ম্যাচের ভাগ্য। আর সেই বৃষ্টির জলেই যে ধুয়ে যাবে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ স্বপ্ন- তা হয়তো কেউই ভাবতে পারে নি।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালটিতে বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল খেলা শুরুর আগেই। খেলার দৈর্ঘ্য কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল ৪৫ ওভারে। শুরু থেকেই ভাগ্যদেবী যেন একেবারে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন প্রোটিয়াসদের উপর থেকে। যে গ্রায়েম হিকের ৯০ বলে ৮৩ রানের ইনিংসটির সুবাদে ইংল্যান্ড স্কোরবোর্ডে ২৫২ রান যোগ হয়েছিল, সেই হিক দুই দুইবার ফিরে এসেছেন নিশ্চিত আউটের দ্বারপ্রান্ত থেকে। ম্যাচের প্রথম বলেই নিশ্চিত একটা এলবিডব্লিউর আবেদনে সাড়া দেন নি আম্পায়ার। দ্বিতীয়বার হিক ক্যাচ আউট হয়েছিলেন একটা নো বলে। তখনও রানের খাতাই খুলতে পারেন নি তিনি।

২৫৩ রানের টার্গেট নিয়ে ব্যাট করতে নেমে বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল প্রোটিয়াসরা। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান অ্যান্ড্রু হাডসনের ৪৬, আদ্রিয়ান কুইপারের ৩৬, হ্যানসি ক্রনিয়ের ২৪ রানের ছোট ছোট ইনিংসগুলির উপর ভর করে ধীরে ধীরে জয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তারা। শেষদিকে জন্টি রোডসের ৩৮ বলে ৪৩ রানের ইনিংসটি রান-বলের ব্যবধান কমিয়ে এনেছিল অনেকখানিই। শেষ পাঁচ ওভারে তাদের দরকার ছিল ৪৭ রান। সপ্তম উইকেটে ব্রায়ান ম্যাকমিলান ও ডেভ রিচার্ডসন মাত্র তিন ওভারে অবিচ্ছিন্ন ২৬ রানের জুটি গড়ে জয়টাকে অনেকটাই নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। আর তারা যেভাবে খেলে যাচ্ছিলেন তাতে সেটা খুব বেশি কঠিনও মনে হচ্ছিল না। কিন্তু ৪৩তম ওভারের শেষ বলের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম সেমিফাইনাল ট্রাজেডিটার জন্ম দিতেই আবার শুরু হলো বৃষ্টি। জয়ের জন্য তখন প্রয়োজন ছিল ১৩ বলে ২২ রান। সেদিনের সেই ১২ মিনিটের বৃষ্টি একটা ক্লাসিক ম্যাচকে পরিণত করেছিল বিশ্বকাপের অন্যতম বিতর্কিত একটা ম্যাচে। ম্যাকমিলান ও রিচার্ডসন চাচ্ছিলেন খেলা চালিয়ে যেতে। কিন্তু ইংলিশ অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ কোনক্রমেই রাজি হলেন না। আম্পায়াররা শেষপর্যন্ত খেলা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর তারা সেই অদ্ভুত নিয়মের খাতা খুলে হিসাব করতে বসলেন নতুন টার্গেট। প্রথমে আম্পায়াররা লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন ৭ বলে ২২ রান। মেলবোর্নের উপস্থিত দর্শক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল এই নির্বুদ্ধিতায়। কিন্তু পরিস্থিতি আরো নির্মম হয়ে উঠল যখন কর্মকর্তারা খেলা দুই ওভার কমিয়ে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন। ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডে ভেসে উঠল হাস্যকর, নির্মম একটা টার্গেট। ১ বলে ২১ রান। দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে কম রান দেওয়া দুই ওভারে ইংল্যান্ড নিয়েছিল ১ রান। সৌজন্যে রক্ষার খাতিরে অসম্ভব এই টার্গেট নিয়ে একমাত্র বলটির মুখোমুখি হতে আবার ব্যাট হাতে মাঠে নামলেন ম্যাকমিলান ও রিচার্ডসন। ক্রিস লুইসের শেষ বলে একটা রান নিয়ে ক্ষুব্ধভাবে প্যাভিলিয়নের দিকে তাকালেন দুই প্রোটিয়াস ব্যাটসম্যান। গ্যালারি থেকে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানানো হলো না বিজয়ী দলকে। দুয়োধ্বনিতে প্রকম্পিত হলো সিডনি স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার আনন্দে মাতলেন না ইংলিশ খেলোয়াড়রাও বরং এরকম বিতর্কিত একটা জয় পেয়ে বেশ বিব্রতই হয়ে পড়েছিলেন তারা।

এর পরের কাহিনী তো সবারই জানা। ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২২ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ শিরোপাটা উঠেছিল ইমরান খানের পাকিস্তানের হাতে। আর এই জঘন্য বৃষ্টি-আইনটি কোন রকম উচ্চবাচ্য ছাড়াই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল ক্রিকেট দুনিয়া থেকে। ১৯৯৯ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল অধিক গ্রহণযোগ্য ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতি।

 

বার্মিংহামের সেই ম্যাচটি

৭৬ বলে ৬১ রানের হার না মানা ম্যাচজয়ী ইনিংসটি খেলার পথে ডারেক মারে

সবাই জানেন, ১৯৭৫ সালে প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপটা জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেরই অজানা যে, বিশ্বকাপে তাদের দ্বিতীয় ম্যাচটাই হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে যেতে বসেছিলেন ক্লাইভ লয়েড, ভিভ রিচার্ডসরা।  পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচটাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভালোমতোই প্রমাণ করেছিল যে, ক্রিকেট ‘অনিশ্চয়তার খেলা’। এখানে অনেক কিছু অনুমান করা সম্ভব হলেও শেষ বলটার আগ পর্যন্ত জোর দিয়ে কিছুই বলা যায় না।

এখনো পর্যন্ত বিশ্বকাপের অনেক উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচই তাঁবু গেড়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে। স্থান করে নিয়েছে ক্রিকেট ইতিহাসে। প্রথম বিশ্বকাপে বার্মিংহামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-পাকিস্তানের এই ম্যাচটিকেও নিঃসন্দেহে জায়গা দেওয়া যায় সেই তালিকার প্রথম সারিতে।

বার্মিংহামের রৌদ্রজ্জ্বল সকালে নিজেদের অজান্তেই এক স্মরণীয় ম্যাচের টস করতে নেমেছিলেন উইন্ডিজ অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড ও পাকিস্তান অধিনায়ক মজিদ খান। টসে জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান। অ্যান্ডি রবার্টস, কেইথ বয়েস, বের্নাড জুলিয়েনদের দুর্ধর্ষ পেস আক্রমণ বেশ ভালোমতোই মোকাবিলা করছিলেন পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানরা। অধিনায়ক মজিদ খান খেলেছিলেন ৬০ রানের এক অনবদ্য ইনিংস। পরে মুশতাক মোহাম্মদের ৫৫, ওয়াসিম রাজার ৫৭ বলে ৫৮ রানের ইনিংস দুটির সুবাদে নির্ধারিত ৬০ ওভারে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৬৬ রান।

গর্ডন গ্রিনিজ, আলভিন কালিচরন, রোহান কানহাই, ভিভ রিচার্ডসের মতো বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যান আছেন যে দলে, তাদের জন্য ২৬৭ রানের টার্গেটটা নিতান্ত মামুলিই বলা যায়। কিন্তু সে দিন সারফরাজ নেওয়াজ, নাসের মালিকদের অসাধারণ বোলিং পাল্টে দিল সব হিসেব নিকেশ। খুব বেশিক্ষণ উইকেটে টিকতে পারলেন না গ্রিনিজ, ফ্রেডরিক, কালিচরণ, কানহাই, ভিভ রিচার্ডস। তিন অঙ্কের ঘরে না পৌঁছাতেই সাজঘরে ফিরে গেলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম সারির এই পাঁচ ব্যাটসম্যান। আশার আলো কিছুটা জাগিয়ে রেখেছিলেন ক্লাইভ লয়েড। কিন্তু ৫৮ বলে ৫৩ রানের লড়াকু ইনিংসটি খেলে তিনি জাভেদ মিঁয়াদাদের শিকারে পরিণত হলে হতাশায় ডুবে যায় উইন্ডিজ শিবির। স্কোরবোর্ডের চেহারা শোচনীয়। ৭ উইকেটে ১৫১ রান। টেনে হিঁচড়ে স্কোরটাকে ২০৩ পর্যন্ত নিয়ে যেতেই পতন হলো আরো দুইটি উইকেটের। জয়ের জন্য তখনো দরকার ৬৪ রান।

শেষ উইকেট জুটিতে এত রান সংগ্রহের কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবে না। একদিকে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ডারেক মারে থাকলেও আরেক দিকে আছেন নবাগত ফাস্ট বোলার অ্যান্ডি রবার্টস, একদিনের ক্রিকেটে এটি ছিল যার দ্বিতীয় ম্যাচ। পাকিস্তানের জয় উদযাপনও শুরু করে দিয়েছিলেন অনেকে। তাদের জয়টা মনে হচ্ছিল শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু তারপর ইতিহাস গড়ার জন্যই যেন উইকেটে খুঁটি গেড়ে বসলেন উইন্ডিজ উইকেটরক্ষক ডারেক মারে আর অ্যান্ডি রবার্টস। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে একে একে ঠিকই ৬৩ রান যোগ করে ফেললেন শেষ উইকেট জুটিতে। এরপরই এসে গেল সেই মহেন্দ্রক্ষণ। ওয়াসিম রাজার বল মিড উইকেটে ঠেলে দিয়েই অবিশ্বাস্য এক জয় ছিনিয়ে নিলেন রবার্টস। শেষ পর্যন্ত তিনি অপরাজিত ছিলেন ২৪ রানে। আর ডারেক মারের ৭৬ বলে ৬১ রানের হার না মানা ম্যাচজয়ী ইনিংসটি এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে।

৭০-এর দশকে ক্রিকেট জগতে উইন্ডিজের একক আধিপত্যের কালে প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে অনেক জয়ই পেয়েছিল ক্লাইভ লয়েডের নেতৃত্বাধীন ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু ওয়ানডে ক্রিকেটের ৪০ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচের কথা বলতে গিয়ে উইন্ডিজ কিংবদন্তী ক্লাইভ লয়েডের মনে সবার আগে ভেসে উঠেছিল এই ম্যাচটির কথাই।

ব্রায়ান লারার অটোগ্রাফ ও মরিস ওদুম্বে

১৯৯৬ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর পর ব্রায়ান লারার অটোগ্রাফ পেয়েছিলেন কেনিয়ার অধিনায়ক মরিস ওদুম্বে

মরিস ওদুম্বে অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তী ব্রায়ান লারার একটা অটোগ্রাফ নেওয়ার। কিন্তু খুব বেশি কাছাকাছি আসার সুযোগই পাননি কখনো। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের তিন বছর আগে একবার ইংল্যান্ডে অটোগ্রাফ চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন কেনিয়ান অধিনায়ক। ৯৬-এর বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কেনিয়া সুযোগ পাওয়ার পর ওদুম্বের প্রথম মনে হয়েছিল যে, একই টুর্নামেন্টে তিনি খেলতে পারবেন তাঁর স্বপ্নের নায়ক ব্রায়ান লারার সঙ্গে। আর এবার অটোগ্রাফ চাইতে গেলে লারা নিশ্চিত ফিরিয়ে দেবেন না। এতেই মহাখুশি ছিলেন তিনি।

ফিক্সচার ঘোষণার পর দেখা গেল একই গ্রুপে আছে কেনিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এর বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে ওদুম্বের? তিন বছর আগে যেখানে লারার অটোগ্রাফটাও নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেখানে তিনি বিশ্বকাপের আসরে খেলতে পারবেন নিজের আদর্শ ক্রিকেটারটার বিপক্ষেই— এটা তো স্বপ্নেরও অতীত। ২৯ ফেব্রুয়ারী পুনেতে উইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামার আগের দিন পর্যন্ত এই আনন্দেই ডগমগ করছিলেন ওদুম্বে। তখনও ঘুনাক্ষরেও টের পাননি ভাগ্যদেবী তার কপালে আরো কত সৌভাগ্য লিখে রেখেছেন।

পরদিন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দিয়ে লারার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৭৩ রানের জয় পেয়ে গেল ওদুম্বের কেনিয়া। আর এই জয়ের পেছনেও সবচেয়ে বড় ভূমিকাটা পালন করলেন তিনিই। ১০ ওভার বল করে মাত্র ১৫ রানের বিনিময়ে নিয়েছিলেন তিনটি উইকেট। ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারটাও উঠেছিল তাঁর হাতেই। ‘আদর্শ দল’, ‘আদর্শ ক্রিকেটারের’ বিপক্ষে এই জয়টার পর ওদুম্বে বলেছিলেন, ‘এটা যেন বিশ্বকাপ জয়ের মতোই অনুভূতি।’

এখানেই শেষ না। ওদুম্বের বিস্ময়ের পারদ আরো কয়েক ধাপ ওপরে তুলে দেওয়ার জন্য এই ম্যাচের পর কেনিয়ার ড্রেসিংরুমে গিয়ে হাজির হলেন প্রিন্স অব ত্রিনিদাদ ব্রায়ান লারা স্বয়ং। বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই অনেকক্ষণ লেগেছিল ওদুম্বের। কিন্তু তারপর ধাতস্থ হওয়ার পর কিছুটা রসিকতা করতেও ছাড়েন নি কেনিয়ার এই ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক। মুখে একগাল হাসি ছড়িয়ে লারাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এখন নিশ্চয়ই আপনি আমাদের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইবেন?’ লারাও শুধু শুকনো মুখে অভিনন্দন জানিয়েই ফিরে যান নি। বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়েছিলেন ওদুম্বের সঙ্গে। এক ফাঁকে অটোগ্রাফটা নিতে নিশ্চয়ই ভুল করেন নি ওদুম্বে!

‘অপরাজিত’ ক্লুজনার

নিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান এসেছিল রাহুল দ্রাবিড়ের ব্যাট থেকে। সেই বিশ্বকাপে শচীন টেন্ডুলকার, মার্ক ওয়াহ, হার্শেল গিবস, ব্রায়ান লারা ও সাঈদ আনোয়ারের মতো ব্যাটসম্যানরা ছিলেন স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল। কিন্তু ব্যাটিংয়ের এসব মহারথীকে ছাপিয়ে ’৯৯-এর বিশ্বকাপে বোলারদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ল্যান্স ক্লুজনার। কিছুতেই আউট করা যাচ্ছিল না তাঁকে। বিশ্বকাপের প্রথম ছয়টি ম্যাচের পাঁচটিতে ব্যাট হাতে মাঠে নেমে করেছিলেন ১৬৪ রান। তাঁর কোনো গড় হিসাব করা যাচ্ছিল না। কারণ, ক্লুজনার যে এই পাঁচটি ম্যাচে আউটই হননি!

কেবল তাই নয়, তিনি শেষবারের মতো আউট হয়েছিলেন বিশ্বকাপ শুরু হওয়ারও দুই-আড়াই মাস আগে। সব মিলিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে আউট না হওয়ার এক অনন্য রেকর্ডই করে বসেছিলেন তিনি। বিশ্বকাপের ছয়টি ম্যাচসহ টানা ১১টি ম্যাচে অপরাজিত থেকে ৩৯৩ রান করে তিনি ভেঙেছিলেন পাকিস্তানের ব্যাটিং কিংবদন্তি জাভেদ মিয়াঁদাদের রেকর্ড।

নিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপটা পুরোটাই ছিল ক্লুজনারের বীরত্ব গাঁথা। পুরো বিশ্বকাপেই দারুণ আলোচিত ছিল তাঁর মারকুটে ব্যাটিং। সুপার সিক্সে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিতে দলের পরাজয় মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পরও অবিচল ছিলেন ল্যান্স ক্লুজনার। শোয়েব আকতারের এক ওভারে ১৭ রান নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে যান বিজয়ের বন্দরে। সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্র্যাজিক বিদায়েও তিনি ছিলেন ট্র্যাজিক হিরো। দলকে ফাইনালে প্রায় নিয়েই গিয়েছিলেন। অ্যালান ডোনাল্ডের সঙ্গে সেই ভুল-বোঝাবুঝিটা না হলে হয়তো বিশ্বকাপের ইতিহাসই অন্যভাবে লিখতে হতো। অনেক ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার টপ অর্ডার ব্যর্থ হলেও অসাধারণ দৃঢ়তায় তিনি দলকে বিজয়ী করেছেন। ’৯৯-এর বিশ্বকাপে তাঁর নাম তাই হয়ে গিয়েছিল ‘ক্রাইসিস ম্যান’।

ক্রিকেটের ইতিহাসে সম্ভবত ল্যান্স ক্লুজনারের আউট হওয়া না-হওয়া নিয়েই ধরা হয়েছে একমাত্র বাজি। ’৯৯-এর বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১১ ম্যাচ পরে তিনি আউট হয়েছিলেন। সেই ম্যাচে তিনি আউট হবেন কি হবেন না, তা নিয়ে বাজির দর বেড়ে গিয়েছিল হু হু করে। শেষ পর্যন্ত ওয়ান ডাউনে ব্যাট করতে নেমে গ্যাভিন লারসেনের বলে তিনি আউট হন। অনেকে এই বলেও বিতর্ক ছড়িয়েছিলেন যে প্রোটিয়া অধিনায়ক হ্যানসি ক্রোনিয়ে যদি তাঁকে সেই ম্যাচে ওয়ান ডাউনে না নামাতেন, তাহলে এই ম্যাচেও নাকি তিনি অপরাজিত থাকতেন।

ল্যান্স ক্লুজনার ’৯৯-এর বিশ্বকাপে সবই পেয়েছেন, কেবল পারেননি দক্ষিণ আফ্রিকাকে ফাইনালে তুলতে। চরম নাটকীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর সেমিফাইনালে ১৬ বলে ৩১ রান করে অপরাজিত থাকলেও মুহূর্তের ভুলে তিনিই ছিলেন সেই ম্যাচের ট্র্যাজেডির নায়ক। শুধু ব্যাট হাতেই নয়, বল হাতেও ১৭ উইকেট শিকার করে বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে ক্লুজনারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল ’৯৯-এর ইংল্যান্ড বিশ্বকাপেই। প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটিও অবধারিতভাবে উঠেছিল এই ‘স্প্রিংবকে’র হাতেই।